Published : 21 Jun 2026, 09:36 PM
ভারতের ক্রমবর্ধমান সামুদ্রিক শক্তি এবং প্রতিরক্ষা খাতে আত্মনির্ভরতা অর্জনে নতুন এক মাইলফলক স্পর্শ করে পশ্চিমবঙ্গে কলকাতার শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি বন্দরে সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি তিনটি যুদ্ধজাহাজ নৌবাহীনিতে যুক্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী।
রোববার নতুন এই জাহাজগুলো উদ্বোধন করে আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতীয় নৌবাহিনীর বহরে যুক্ত করা হয়। অনুষ্ঠানে মূল অতিথি হিসাবে ছিলেন নরেন্দ্র মোদীসহ রাজ্যপাল আরএন রবি, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ও অন্যান্য বিশিষ্ট ব্যক্তিরা।
জাহাজ তিনটি হল- স্টিলথ ফ্রিগেট ‘আইএনএস দুনগিরি’, জরিপ জাহাজ (লার্জ) ‘আইএনএস সংশোধক’ এবং অগভীর পানিতে সাবমেরিন-ধ্বংসকারী ‘আইএনএস অগ্রয়’।
কলকাতার ‘গার্ডেনরিচ শিপবিল্ডার্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ার্স’ নির্মিত এই তিন যুদ্ধজাহাজ নৌবাহিনীর যুদ্ধক্ষমতা, জললেখচিত্রণ (হাইড্রোগ্রাফিক সার্ভে) এবং সাবমেরিন-বিধ্বংসী অভিযান পরিচালনার সক্ষমতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে।
বর্তমান সময়ে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সংবেদনশীল ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে অঞ্চলটিতে আধিপত্য বিস্তার এবং নিরাপত্তার ভারসাম্য বজায় রাখার ক্ষেত্রে ভারতের নৌবাহিনীতে যুদ্ধজাহাজগুলোর আধুনিকীকরণের ওপর জোর দেওয়া হয়েছিল।
এ পরিস্থিতিতে ভারতীয় প্রযুক্তিতে তৈরি তিনটি ভিন্ন ধরনের রণতরী নৌবাহিনীতে স্থান পাওয়া ইতিবাচক বার্তা বহন করছে। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে ভারতের নিজস্ব প্রযুক্তির কার্যকারিতা প্রমাণ হওয়ার পাশাপাশি বিদেশি অস্ত্র বিক্রেতাদের ওপর ভারতের নির্ভরতা কমবে।
#WATCH | Kolkata, West Bengal: Prime Minister Narendra Modi commissions three indigenously designed and built naval ships - INS Dunagiri, an advanced stealth frigate, INS Sanshodhak, a survey vessel (large) and INS Agray, an anti-submarine warfare shallow water craft pic.twitter.com/dq3FHJpYar
— NDTV (@ndtv) June 21, 2026
তিন যুদ্ধজাহাজের বিশেষত্ব
আইএনএস দুনগিরি: এটি মূলত ভারতীয় নৌবাহিনীর প্রজেক্ট ১৭এ প্রকল্পের অধীনে তৈরি হওয়া স্টিলথ ফ্রিগেট। জাহাজটি আধুনিক শত্রু শনাক্তকরণ রাডার সেন্সর ও শক্তিশালী আক্রমণকারী ক্ষেপণাস্ত্রে সজ্জিত।
ব্রহ্মস সুপারসনিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র, ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র এবং আধুনিক অস্ত্র ব্যবস্থায় সজ্জিত এই যুদ্ধজাহাজ সম্মুখসারির নৌ-অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
নতুন প্রজন্মের এই সংস্করণে উন্নত প্রযুক্তির স্টিলথ মেকানিজম বা রাডার ফাঁকি দেওয়ার প্রযুক্তি যুক্ত রয়েছে, যা আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে একে অনেক বেশি সুরক্ষিত ও অপ্রতিরোধ্য করে তুলবে।
যে কোনও পরিস্থিতিতে দীর্ঘ সময় ধরে সমুদ্রে নজরদারি এবং গভীর সামুদ্রিক লড়াইয়ে এটি খুবই কার্যকর প্রমাণিত হবে।
আইএনএস সংশোধক: গভীর ও উপকূলীয় সমুদ্রে হাইড্রোগ্রাফিক জরিপ চালানোর জন্য এটি ডিজাইন করা চতুর্থ বৃহত্তম জরিপ জাহাজ, যা ভারত মহাসাগরের তলদেশের খোঁজখবর রাখতে বিশেষভাবে সক্ষম।
জাহাজটি মূল সমুদ্রের গভীরতা, পরিবেশ এবং সামুদ্রিক গঠনের বিশদ চিত্র ফুটিয়ে তুলতে সাহায্য করবে। ৩,৩০০ টন ওজনের এই জাহাজে রয়েছে স্বয়ংক্রিয় ডুবোযান, দূরনিয়ন্ত্রিত যান এবং উন্নত হাইড্রোগ্রাফিক জরিপ সরঞ্জাম।
সমুদ্রতলের মানচিত্র তৈরি, নৌপথ নির্ধারণ এবং সামুদ্রিক নেভিগেশন সংক্রান্ত কাজে এ যুদ্ধজাহাজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
আইএনএস অগ্রয়: আরনালা-ক্লাসের এই চতুর্থ ক্রাফটটি অগভীর সমুদ্রে সাবমেরিন বা ডুবোজাহাজ ধ্বংসের জন্য তৈরি।
উপকূলবর্তী এলাকায় সাবমেরিন শনাক্ত ও মোকাবেলার জন্য বিশেষভাবে তৈরি এই জাহাজে আছে হালকা টর্পেডো, ভারতীয় প্রযুক্তির অ্যান্টি-সাবমেরিন রকেট লঞ্চার এবং উন্নত নজরদারি ব্যবস্থা।
উপকূলীয় নিরাপত্তা জোরদারে এর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
প্রতিরক্ষায় আত্মনির্ভরতা অর্জনের সংকল্প
জাহাজ তিনটি উদ্বোধন করার সময় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ভারতের আত্মনির্ভরতার সংকল্প তুলে ধরে জানান, ভারত আর কেবল বিশ্বের কাছে প্রতিরক্ষার বড় ক্রেতা বা বাজার হয়ে থাকবে না।
অনুষ্ঠানে নরেন্দ্র মোদী বলেন, "এই তিন জাহাজ ভারতের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ সংকল্পের প্রতীক। এগুলো ভারতেই নকশা করা এবং তৈরি করা হয়েছে। ভারতীয় শিল্পের মেধা, প্রকৌশলীদের দক্ষতা এবং শ্রমিকদের কঠোর পরিশ্রমের ফসল এই জাহাজগুলো। আজ ভারত প্রতিরক্ষা খাতে আর কেবল সাধারণ ক্রেতা হয়ে থাকতে চায় না। আমাদের সামরিক শক্তি বিশ্বের জন্য কোনও বাজার হতে পারে না। বিশ্বের বাজার হওয়া আমাদের শক্তির সংজ্ঞা নয়, বরং আমাদের শক্তির আসল সংজ্ঞা হল আত্মনির্ভরতা।"
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, “যে দেশের সামুদ্রিক শক্তি যত শক্তিশালী, অর্থনৈতিক ও কৌশলগত ক্ষেত্রে তাদের প্রভাবও ততটাই সুদৃঢ় হয়। কয়েক বছর আগে যখন আমরা 'আইএনএস বিক্রান্ত'-কে জাতির উদ্দেশে উৎসর্গ করেছিলাম, তখন সামুদ্রিক শক্তিতে ভারত এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছিল। আইএনএস বিক্রান্ত থেকে আজকের এই পথচলা কেবল নতুন যুদ্ধজাহাজের যাত্রা নয়, এটি ভারতের ক্রমবর্ধমান আত্মনির্ভরতারও গল্প। আজ আইএনএস অগ্রয়, আইএনএস দুনগিরি এবং আইএনএস সংশোধক সেই যাত্রায় নতুন গতি সঞ্চার করছে।”