Published : 03 Jun 2026, 08:33 PM
বিশ্বব্যাপী এবং আঞ্চলিক সংঘাতের কারণে চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় ভারত এবছর দেশীয় সংস্থাগুলো থেকে ২০০ কোটি (২ বিলিয়ন) ডলারেরও বেশি মূল্যের সামরিক ড্রোন কেনার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
এটিই হবে ভারতের ইতিহাসে এ যাবৎকালের সবচেয়ে বড় ড্রোন ক্রয় চুক্তি। সরকারের সঙ্গে কাজ করা একটি শিল্প প্রতিষ্ঠান বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে এই তথ্য নিশ্চিত করেছে।
ড্রোন ফেডারেশন অব ইন্ডিয়া (ডিএফআই)-এর সভাপতি স্মিত শাহ জানিয়েছেন, এই ক্রয় পরিকল্পনাটি বর্তমানে অগ্রবর্তী পর্যায়ে রয়েছে এবং আগামী ১৮ থেকে ২৪ মাসের মধ্যে এসব ড্রোন সরবরাহ করা হবে।
এই ড্রোন ক্রয় সম্প্রতি সরকারের প্রায় ৩,০০০ কোটি রূপির কৌশলগত ড্রোন অর্ডারের চেয়ে কয়েকগুণ বড় হবে। ধারণা করা হচ্ছে, সরকার সেনাবাহিনীর তাৎক্ষণিক চাহিদা মেটাতে দ্রুত ক্রয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারে।
৫৫০টিরও বেশি কোম্পানির প্রতিনিধিত্বকারী এবং সরকারের সঙ্গে যুক্ত ডিএফআই-এর সভাপতি শাহ বলেন, “পরবর্তী ধাপে ভারতে কৌশলগত ড্রোন সংগ্রহের পরিমাণ ২০ হাজার কোটি রুপি বা ২০০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে।”
তিনি আরও জানান, জরুরি আভিযানিক চাহিদা মেটাতে এই নতুন ক্রয়াদেশগুলোর আওতায় ‘ফাস্ট-ট্র্যাক’ বা দ্রুততর সংগ্রহ প্রক্রিয়া নেওয়া হবে, যা ২৪ মাসের মধ্যেই সরবরাহ করার প্রয়োজন পড়বে।
রয়টার্সই প্রথম ভারতের এই সম্ভাব্য ক্রয় আদেশের খবর প্রকাশ করেছে। তবে এ বিষয়ে মন্তব্য চেয়ে ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা তাৎক্ষণিকভাবে কোনো সাড়া দেয়নি।
গত বছরের মে মাসে চিরশত্রু পাকিস্তানের সঙ্গে সংঘর্ষের পর ভারত এই ড্রোন ক্রয়ের ওপর জোর দিল।
সে সময় দুই দেশই প্রথমবারের মতো বড় পরিসরে চালকবিহীন আকাশযান (ইউএভি) মোতায়েন করেছিল, যা কম খরচের ড্রোনের আক্রমণাত্মক ক্ষমতাকে বিশেষভাবে সামনে নিয়ে আসে।
এছাড়া ইউক্রেইন এবং ইরানের সংঘাত বিশ্বব্যাপী ড্রোন ব্যবহারের পরিধি আরও বাড়িয়ে দিয়েছে, যা ড্রোনের উৎপাদন খরচ কমানোর পাশাপাশি যুদ্ধক্ষেত্রের কৌশলকেও নতুন রূপ দিচ্ছে।
এর আগে মার্চ মাসে ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় পরিবহন বিমান, ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা এবং ‘রিমোটলি পাইলটেড স্ট্রাইক এয়ারক্রাফট’ বা সশস্ত্র ড্রোন ক্রয়ের জন্য প্রায় ২ লাখ ৩৮ হাজার কোটি রুপির (২৪ শাতাধিক কোটি ডলার) একটি প্রস্তাব অনুমোদন করেছিল, যদিও সেখানে ব্যয়ের কোনো সুনির্দিষ্ট বিভাজন দেওয়া হয়নি।
উন্নত চালকবিহীন আকাশযান ও স্বল্পপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা নির্মাতা প্রতিষ্ঠান আইজি ডিফেন্সের নির্বাহী এবং সেনাবাহিনীর সাবেক উর্ধ্বতন কর্মকর্তা রমেশ চন্দ্র পাধি বলেন, “আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে ড্রোন হল শক্তির গুণক (ফোর্স মাল্টিপ্লায়ার)। ভারতীয় সেনাবাহিনী খুব বড় পরিসরে ড্রোন অন্তর্ভুক্ত করার প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করতে জরুরি বা ফাস্ট-ট্র্যাক সংগ্রহ নীতি অনুসরণ করছে।”
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ এবং সামরিক অভিযানের প্রকৃতি দ্রুত বদলেছে। রাশিয়া-ইউক্রেইন যুদ্ধ এবং পশ্চিম এশিয়ায় চলমান সব সংঘাত প্রমাণ করেছে যে, এমনকি স্বল্পমূল্যের ড্রোনও যুদ্ধক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারে।
গত বছর ভারত-পাকিস্তান উত্তেজনার সময়ও দুই দেশই ব্যাপকভাবে ড্রোন ব্যবহার করেছিল। ফলে ভারতীয় সেনাবাহিনী নজরদারি, লক্ষ্যবস্তু শনাক্তকরণ এবং নির্ভুল হামলার জন্য ড্রোনের প্রয়োজনীয়তা আরও বেশি করে উপলব্ধি করছে।
প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, আধুনিক যুদ্ধে ড্রোন এখন সামরিক শক্তির এক অপরিহার্য হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে।
ভারতে বর্তমানে ৬০০-এর বেশি প্রতিষ্ঠান ড্রোন ও এর যন্ত্রাংশ তৈরি করছে, যার মধ্যে ১০০টিরও বেশি সংস্থা সরাসরি প্রতিরক্ষা খাতে কাজ করছে।
এই কোম্পানিগুলোর মধ্যে আদানি গ্রুপ, লার্সেন অ্যান্ড টুব্রো ও টাটা অ্যাডভান্সড সিস্টেমসের মতো বড় সংস্থাগুলোর পাশাপাশি আইডিয়াফোর্জ, নিউজপেস রিসার্চ এবং অ্যাস্টেরিয়া অ্যারোস্পেসের মতো স্টার্টআপও রয়েছে।
এই প্রতিষ্ঠানগুলো মূলত নজরদারি, রসদ সরবরাহ, লয়টারিং মিউনিশন (আত্মঘাতী ড্রোন), নিখুঁত হামলা ও গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ তৈরির কাজ করছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, পাকিস্তানের সঙ্গে সংঘর্ষে নজরদারি ও হামলার সক্ষমতার ঘাটতি প্রকাশ পাওয়ার পর ভারত ড্রোন দ্রুত ক্রয়ের সুবিধার্থে তাদের ধীরগতির প্রতিরক্ষা সংগ্রহ প্রক্রিয়া সংস্কার করেছে।
নয়াদিল্লি এখন জরুরি ক্ষমতা ও ‘ডিফেন্স অ্যাকুইজিশন প্রসিডিউর’-এর অধীনে দ্রুততর প্রচেষ্টার ওপর নির্ভর করছে, যা বছরের পর বছর ধরে চলা প্রক্রিয়াকে মাত্র কয়েক মাসে নামিয়ে এনেছে।
একই সঙ্গে দেশীয় উৎপাদন বৃদ্ধিতে ভারত নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি ব্যবস্থাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
সরকার প্রাথমিক নমুনার অর্থায়নে ‘ইনোভেশনস ফর ডিফেন্স এক্সেলেন্স’-এর মতো প্রকল্প সম্প্রসারিত করেছে, যাতে ছোট সংস্থাগুলো প্রাথমিক ক্রয়াদেশ পেয়ে দ্রুত উৎপাদন বাড়াতে পারে।
প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এখন স্টার্টআপ ও বেসরকারি খাতের জন্য ক্রয়ের ক্ষেত্র উন্মুক্ত করেছে, পরীক্ষার নিয়ম শিথিল করেছে এবং সশস্ত্র বাহিনীকে অন্তর্বর্তীকালীন আদেশের মাধ্যমে ড্রোন যুক্ত করার তাগিদ দিচ্ছে।
ডিএফআই-এর শাহ বলেন, কার্যাদেশের নিশ্চয়তা ও নীতিগত সমর্থনের কারণে তহবিল ও অংশীদারিত্বের পথ উন্মুক্ত হওয়ায় এই পরিবর্তনগুলো ভারতের ড্রোন শিল্পকে নতুন রূপ দিচ্ছে।
ক্রমবর্ধমান সামরিক চাহিদা মেটাতে কোম্পানিগুলো উৎপাদন ও গবেষণা জোরদার করায় উদ্যোগ তহবিল বা ভেঞ্চার ইনভেস্টমেন্ট এবং বড় প্রতিরক্ষা সংস্থাগুলোর সঙ্গে যৌথ চুক্তি বৃদ্ধি পেয়েছে।