Published : 06 May 2026, 10:14 PM
প্রাণঘাতী হান্টাভাইরাসের প্রাদুর্ভে কেপ ভার্দে উপকূলে আটকা পড়া বিলাসবহুল প্রমোদতরী ‘এমভি হোন্ডিয়াস’ থেকে গুরুতর অসুস্থ দুইজনসহ তিন যাত্রীকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
বুধবার বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)-এর প্রধান তেদরোস আধানম গেব্রিয়াসুস জানিয়েছেন, ওই তিনজনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য নেদারল্যান্ডসে পাঠানো হচ্ছে।
তিনজনের মধ্যে একজন ডাচ, একজন জার্মান এবং একজন ব্রিটিশ নাগরিক রয়েছেন। তাদের ইউরোপের বিশেষায়িত হাসপাতালগুলোতে ভর্তি করা হবে।
৩ জনকে সরানোর পর প্রমোদতরীটিতে এখন ২৩ টি দেশের আরও ১৪৬ জন আরোহী রয়েছে। তাদেরকে নিয়ে তরীটি শিগগিরই স্পেনের ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জের দিকে রওনা দেবে।
প্রমোদতরীটির অপারেটর ‘ওশানওয়াইড এক্সপিডিশনস’ জানিয়েছে, হান্টাভােইরাস প্রাদুর্ভে এ পর্যন্ত তিনজনের মৃত্যু হয়েছে।
তবে জাহাজে থাকা এক যাত্রী বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানান, আরোহীদের মধ্যে কোনও আতঙ্ক নেই। তারা নিয়মিত হ্যান্ড স্যানিটাইজার ও মাস্ক ব্যবহার করছেন এবং সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখছেন।
তিনি বলেন, “জাহাজে সবার মনোবল চাঙ্গা রয়েছে। আমরা বই পড়ে বা সিনেমা দেখে সময় কাটাচ্ছি।”
প্রমোদতরীটি তিনদিনের মধ্যে ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জে পৌঁছানোর কথা রয়েছে বলে জানিয়েছেন স্পেনের স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোনিকা গার্সিয়া। তিনি জানান, প্রমোদতরীতে থাকা অন্যান্যদের মধ্যে রোগের কোনও লক্ষণ নেই।
ক্যানারি দ্বীপের টেনেরিফে পৌঁছানোর পর যদি তারা সুস্থ থাকে তাহলে তাদেরকে নিজ নিজ দেশে ফেরানো হবে বলে এক সংবাদ সম্মেলনে জানান গার্সিয়া।
তিনি এও বলেন, ১৪ জন স্প্যানিশ যাত্রীকে মাদ্রিদে একটি সামরিক হাসপাতালে কোয়ারেন্টিনে রাখা হবে।
প্রমোদতরীটি মার্চের শেষ দিকে আর্জেন্টিনার উশুয়াইয়া বন্দর থেকে যাত্রা শুরু করেছিল। আর্জেন্টিনা থেকে অ্যান্টার্কটিকা ও দক্ষিণ জর্জিয়া হয়ে তরীটি কেপ ভার্দের দিকে যাচ্ছিল।
যাত্রা চলাকালেই জাহাজটিতে হান্টাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয় এবং মে মাসে তিনজন যাত্রীর মৃত্যুর খবর আসে।
তরীটির কেপ ভার্দেতে ভেড়ার কথা থাকলেও হান্টাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে পশ্চিম আফ্রিকার দ্বীপদেশগুলো এটিকে তীরে ভিড়তে দেয়নি। ফলে প্রমোদতরী হোন্ডিয়াস সমুদ্রে আটকা পড়ে।
এখন তরীটির স্পেনে যাওয়ার অপেক্ষায়। তবে সেখানেও ভেড়ার অনুমতি নিয়ে দ্বিমত দেখা দিয়েছে।
ক্যানারি দ্বীপের প্রেসিডেন্ট সেখানে তরীটিকে ভেড়ানোর স্পেন সরকারের পরিকল্পনার বিরোধিতা করেছেন। তবে স্পেনের মন্ত্রীরা বলছেন, ক্যানারিতে তরীটি অবস্থান করাটাই নিরাপদ হবে।
মঙ্গলবার রাতে স্পেনের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানায়, আন্তর্জাতিক আইন ও মানবিক নীতি অনুসরণ করে ডব্লিউএইচও এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের অনুরোধে তারা প্রমোদতরিটিকে স্পেনে ভেড়ার অনুমতি দিয়েছে।
স্পেনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম টিভিই জানায়, তরীটি ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জের টেনেরিফে বন্দরে ভিড়তে পারে।
তবে ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জের প্রেসিডেন্ট ফার্নান্দো ক্লাভিজো এই পদক্ষেপের প্রতিবাদ জানিয়ে স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজের সঙ্গে জরুরি বৈঠকের দাবি তুলেছেন।
ফার্নান্দোর আপত্তির মুখে স্পেনের কেন্দ্রীয় সরকার পাল্টা বিবৃতিতে জানিয়েছে, টেনেরিফে বন্দরে জাহাজটি ভেড়ানোর পরিকল্পনাটি জনস্বাস্থ্যের জন্য সম্পূর্ণ নিরাপদ এবং সব ধরনের সুরক্ষা নিশ্চিত করেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
উল্লেখ্য, এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার কেন্দ্রীয় সরকারের হাতেই থাকছে।
মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমণের শঙ্কা
দক্ষিণ আফ্রিকা নিশ্চিত করেছে যে, আক্রান্তদের মধ্যে ভাইরাসের ‘আন্দিয়ান স্ট্রেইন’ শনাক্ত হয়েছে। এই বিশেষ ধরনটি বিরল ক্ষেত্রে মানুষ থেকে মানুষে ছড়াতে পারে।
মার্চ মাসে আর্জেন্টিনা থেকে শুরু হওয়া এই প্রমোদভ্রমণে এখন পর্যন্ত আটজন আক্রান্ত হয়েছেন, যাদের মধ্যে তিনজনের তথ্য ল্যাব পরীক্ষায় নিশ্চিত হওয়া গেছে।
সুইজারল্যান্ড সরকার জানিয়েছে, হোন্ডিয়াস থেকে ফিরে আসা এক ব্যক্তি হান্টাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে জুরিখে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তবে সাধারণ মানুষের জন্য বড় কোনও ঝুঁকি নেই বলে আশ্বস্ত করেছে তারা।
হান্টাভাইরাস কী?
সাধারণত সংক্রমিত ইঁদুর বা এই জাতীয় প্রাণীর মলমূত্র ও লালার সংস্পর্শে এলে মানুষ এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়। মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমণ অত্যন্ত বিরল হলেও ‘আন্দিয়ান স্ট্রেইন’-এর ক্ষেত্রে অতীতে ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শের মাধ্যমে সীমিত সংক্রমণের নজির রয়েছে।
দক্ষিণ আফ্রিকার ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর কমিউনিকেবল ডিজিজেস (এনআইসিডি) মৃত ডাচ নারী এবং চিকিৎসাধীন ব্রিটিশ নাগরিকের শরীরে এই স্ট্রেইন পাওয়ার কথা নিশ্চিত করেছে।
কতটা বিপজ্জনক হান্টাভাইরাস?
করোনাভাইরাসের মতোই হান্টা আরএনএ ভাইরাস। দ্রুত এক শরীর থেকে অন্য শরীরে ছড়িয়ে পড়তে পারে। আবার খুব তাড়াতাড়ি তাদের জিনের রাসায়নিক বদল বা মিউটেশনও ঘটাতে পারে। ডব্লিউএইচও জানাচ্ছে, এই ভাইরাস মানুষের শরীরে ঢুকে পড়লে সবচেয়ে আগে ফুসফুস ও কিডনির ক্ষতি করে।
বাতাসে ভাসমান ধূলিকণাকে আশ্রয় করেও ছড়াতে পারে হান্টাভাইরাস। ইঁদুর জাতীয় প্রাণীয় মলমূত্র, দেহাবশেষ থেকেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। হান্টার সংক্রমণ ঘটলে প্রাথমিক লক্ষণে জ্বর, পেশির ব্যথা ও পেশির খিঁচুনি শুরু হয় রোগীর। ধীরে ধীরে ভাইরাস ঢুকে পড়ে শ্বাসনালিতে।
সেখানে বিভাজিত হয়ে সংখ্যায় বাড়তে থাকে। শেষে ফুসফুসে বাসা বাঁধে। এর সংক্রমণে ‘হান্টাভাইরাস পালমোনারি সিনড্রোম’ দেখা দেয় যাতে ফুসফুস বিকল হতে শুরু করে। মারাত্মক শ্বাসকষ্ট শুরু হয় রোগীর। ফুসফুসে পানি জমতে থাকে।
ইউরোপ ও এশিয়ার বহু দেশে হান্টাভাইরাসের আক্রান্তদের হেমারেজিক ফিভার ও রেনাল সিনড্রোমও দেখা দিয়েছে আগে। এতে কিডনি কার্যক্ষমতা হরাতে থাকে এবং শরীরের ভিতরে রক্তক্ষরণ শুরু হয়ে যায়। তখন রোগীর প্রাণসংশয় ঘটে।