Published : 21 Feb 2026, 04:20 PM
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছেন, তার দেশ শান্তি ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কূটনীতিতে জড়াতে প্রস্তুত।
ওয়াশিংটনের লাগাতার হুমকি সত্ত্বেও দুই দেশ যে সম্ভাব্য একটি চুক্তির কাছাকাছি আছে, আরাগচির মন্তব্যে সেই ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে বলে জানিয়েছে আল জাজিরা।
শুক্রবার মার্কিন টেলিভিশন নেটওয়ার্ক এমএস নাও-র সঙ্গে কথোপকথনে আরাগচি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির কোনো সামরিক সমাধান নেই বলেও জোরাল কণ্ঠে জানান।
“কূটনৈতিক সমাধান আমাদের নাগালের মধ্যে রয়েছে। আমরা চাইলে তা অর্জন করতে পারি,” বলেছেন তিনি।
দুটি বিমানবাহী রণতরী, কয়েক ডজন যুদ্ধবিমান, যুদ্ধজাহাজ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে যেভাবে তার সমরশক্তি বাড়িয়ে যাচ্ছে তা নিয়ে ক্ষোভও প্রকাশ করেছেন এ ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
“আমি গত ২০ বছর ধরে এ ধরনের কাজ করছি, ভিন্ন ভিন্ন পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করেছি। আমি জানি যে একটি চুক্তি করা সম্ভব, কিন্তু সেটি হওয়া উচিত ন্যায্য এবং সব পক্ষ জিতবে এমন ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে।
“সামরিক বিকল্প এই পরিস্থিতিকে কেবল জটিলই করবে, নিয়ে আসবে ভয়াবহ পরিণতি, কেবল আমাদের জন্যই নয়, হয়তো সমগ্র অঞ্চল এমনকি সমগ্র আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্যও,” বলেছেন ইরানের এ শীর্ষ কূটনীতিক।
তার সাক্ষাৎকার প্রচারিত হওয়ার কয়েক ঘণ্টা পর ডনাল্ড ট্রাম্পের কাছে পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে আলোচনায় ওয়াশিংটনের অবস্থান মজবুত ইরানে সীমিত আকারে হামলার সম্ভাবনা কতখানি তা জানতে চাওয়া হয়।
এর জবাবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, “আমি এটা বিবেচনা করছি এমনটা বলতে পারি আমি।”
এদিকে আগেই আরাগচি যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করে বলেছেন, ইরানিরা ‘আত্মমর্যাদাসম্পন্ন মানুষ’, তারা কেবল ‘সম্মানের ভাষাতেই’ সাড়া দেয়।
“আগের মার্কিন প্রশাসনগুলো, এমনকি এখনকার প্রশাসনও আমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা, নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহালসহ প্রায় সবকিছুই করেছে, কিন্তু কোনোটিই কাজে দেয়নি,” বলেছেন তিনি।
গত এক মাসে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে দুই দফা বৈঠক হয়েছে, তাতে ‘ইতিবাচক অগ্রগতি’ হচ্ছে বলে উভয় পক্ষ থেকেই ধারণা মিলছিল। তার মধ্যেও ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের আশপাশে সামরিক উপস্থিতি ক্রমশ বাড়িয়েছে।
জাহাজ চলাচলে নজর রাখা একাধিক ওয়েবসাইট শুক্রবার জানিয়েছে, উপসাগরীয় অঞ্চলের পথে থাকা বিশ্বের সর্ববৃহৎ বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস গেরাল্ড আর ফোর্ড এরই মধ্যে জিব্রাল্টার প্রণালী দিয়ে ভূমধ্যসাগরে প্রবেশ করেছে।
বৃহস্পতিবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ওয়াশিংটনের সঙ্গে চুক্তিতে পৌঁছাতে ইরানকে ১০ দিনের সময় বেঁধে দিয়েছিলেন। পরে ওই সময়সীমা বাড়িয়ে ১৫ দিন করেন। অথচ কয়েকদিন আগেই তিনি এক মাসের ভেতর একটি চুক্তি হতে পারে বলে আভাস দিয়েছিলেন।
এর পাশাপাশি ইরানের বিরুদ্ধে নিয়মিত হুমকিও দিয়ে যাচ্ছেন ট্রাম্প। বলেছেন, চুক্তি না করলে শিয়া সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশটির ‘খুবই খারাপ কিছু হবে’, ‘মারাত্মক পরিণতি’ দেখবে।
গত বছর জুনে ইরানে ইসরায়েলের হামলার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তিনটি প্রধান পারমাণবিক স্থাপনায় বোমা মেরেছিল।
পরে ট্রাম্প ও ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দুজনই বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের হামলা ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে ‘নিশ্চিহ্ন’ করে দিয়েছে।
গত বছরের শেষদিকে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে উত্তেজনার পারদ ফের চড়তে শুরু করে। ইরান তার পারমাণবিক কর্মসূচি বা ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার আগের জায়গায় নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে যুক্তরাষ্ট্র ফের হামলা চালাবে বলে সেসময় ট্রাম্প হুমকিও দিয়েছিলেন।
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এখন কী পর্যায়ে আছে সে বিষয়ে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা কিছু জানাননি। তাদের উচ্চমাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম কোথায় আছে তাও অজানা।
তেহরান বলছে, আন্তর্জাতিক পরমাণু চুক্তি এনপিটির আওতায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার অধিকার রয়েছে তাদের। এবং সেই চুক্তিতে থাকা কোনো শর্ত লঙ্ঘন করেনি তারা।
ট্রাম্প ও তার শীর্ষ সহযোগীরা বারবারই বলে আসছেন, তারা চান ইরান যেন তার পুরো পারমাণবিক কর্মসূচিই বাতিল করে দেয়।
তেহরান বলছে, তারা পারমাণবিক বোমা বানাতে আগ্রহী নয় এবং তাদের ইউরেনিয়াম কর্মসূচিতে আন্তর্জাতিক নজরদারি বাড়াতেও তারা প্রস্তুত, কিন্তু তারা পুরো কর্মসূচি বাতিল করতে পারবে না।
শুক্রবার আরাগচি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র তাদেরকে ‘ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ শূন্যে নিয়ে আসতে’ বলেইনি।
ইরানি এ পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, আলোচনার পরবর্তী পদক্ষেপ হিসেবে ইরানকে চুক্তির একটি লিখিত প্রস্তাব ট্রাম্পের দূত স্টিভ উইটকফ নেতৃত্বাধীন মার্কিন আলোচকদের দিতে হবে। যার ওপর দাঁড়িয়ে দুই পক্ষ চুক্তির ভাষা চূড়ান্ত করতে পারবে।
“আমাদের আলোচনার জন্য নির্দেশিকা নীতিমালা ও একটি চুক্তি দেখতে কেমন হয় তা ঠিক করতে একমত হয়েছি আমরা। আমাদেরকে একটি সম্ভাব্য চুক্তির খসড়া প্রস্তুত করতে বলা হয়েছে। পরবর্তীতে যখন আমরা একত্রিত হবো, আমরা সেই খসড়া নিয়ে যাবো এবং এরপর তার ভাষা নিয়ে আলোচনা শুরু হবে। আশা করছি, আমরা উপসংহারে পৌঁছাতে পারবো,” বলেছেন তিনি।