Published : 23 Jan 2026, 10:30 PM
আফগানিস্তানে পশ্চিমা সামরিক জোট নেটোর সেনারা যুদ্ধের সম্মুখসারি এড়িয়ে নিরাপদ দূরত্বে থেকেছে বলে মন্তব্য করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প।
তার এই মন্তব্যে যুক্তরাজ্যের রাজনীতিবিদ ও যুদ্ধফেরত সেনাদের মধ্যে তীব্র বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। উঠেছে নিন্দার ঝড়।
বৃহস্পতিবার ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প নেটোর ভূমিকা নিয়ে ওই মন্তব্য করেন। তিনি এও বলেন, ‘প্রয়োজন হলে’ নেটো যে যুক্তরাষ্ট্রকে সমর্থন দেবে সে বিষয়ে তিনি ‘নিশ্চিত নন’।
ট্রাম্পের কথায়, “তারা (নেটো) বলবে তারা আফগানিস্তানে কিছু সেনা পাঠিয়েছিল। পাঠিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু তারা একটু পেছনে ছিল, সামনের সারি (ফ্রন্টলাইন) থেকে দূরে।”
তার এই কথার প্রতিক্রিয়ায় ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের মুখপাত্র বলেছেন, “যুক্তরাষ্ট্রে ৯/১১ সন্ত্রাসী হামলার পর আফগানিস্তানে যুদ্ধে ব্রিটিশ বাহিনীসহ নেটো সেনাদের ভূমিকাকে খাটো করে দেখিয়ে ট্রাম্প ভুল করছেন।
যুক্তরাজ্যের কনজারভেটিভ নেতা কেমি বাদেনোচ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মন্তব্যকে ‘মর্যাদাহানিকর’ আখ্যা দেন। তিনি বলেন, “এ ধরনের অযাচিত মন্তব্য আমাদের করা উচিত না, যা আদতে নেটো মিত্রদের মধ্যে শক্তিশালী সম্পর্কের বাঁধন আলগা করে দেয়।”
লিবারেল ডেমোক্র্যাট নেতা এড ডেভি বলেন, ট্রাম্পের মন্তব্য আমাদের সাহসী যোদ্ধাদের জন্য এক বিশাল অপমান। প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের উচিত ট্রাম্পের কাছে ক্ষমা দাবি করা।
রিফর্ম ইউকে পার্টির নেতা নাইজেল ফারাজে বলেন, “ট্রাম্প ভুল বলছেন।” যুক্তরাজ্যে ১০ নং ডাউনিং স্টিট থেকে বলা হয়েছে, আফগানিস্তান যুদ্ধে ব্রিটিশ সেনাদের ভূমিকা কখনও বিস্মৃত হবে না।
আফগান যুদ্ধের খতিয়ান তুলে ধরে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন ডাউনিং স্ট্রিট মনে করিয়ে দিয়েছে যে, ওই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি লড়াই করতে গিয়ে ৪৫৭ ব্রিটিশ সেনা প্রাণ হারিয়েছেন। আহত হয়েছে আর শত শত সেনা।
এইসব ব্রিটিশ সেনা এবং অন্যান্য নেটো দেশের সেনারা এই আত্মত্যাগ করেছিল জোটের মিত্রদেশে হামলার জবাবে সমন্বিতভাবে নিরাপত্তা রক্ষার জন্য লড়তে গিয়ে। যুক্তরাজ্য তাদের সশস্ত্র বাহিনীর ভূমিকার জন্য গর্বিত এবং তাদের আত্মত্যাগ কখনও বিস্মৃত হবে না বলে জানান ডাউনিং স্ট্রিটের মুখপাত্র।
আফগান যুদ্ধে আহত এক ব্রিটিশ সেনার মাও ট্রাম্পের মন্তব্যের সমালোচনা করে বলেছেন, এমন মন্তব্য মর্যাদাহানিকর। এই ব্রিটিশ সেনা আফগান যুদ্ধে লড়তে গিয়ে মারাত্মকভাবে আহত হন। এতে তার জীবন সম্পূর্ণই বদলে গেছে বলে বিবিসি-কে জানিয়েছেন তার মা।
তবে তিনি বলেন, তার ছেলে যুদ্ধ করেছে এজন্য তিনি গর্বিত। আহত সেনার এই মা বলেন, তিনি চান প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার ব্রিটিশ সেনাদের জন্য শক্ত অবস্থান নিন। তিনি সরাসরি ট্রাম্পকে ফোন করে বলুন যে, ‘তার মন্তব্যটি ঠিক নয়’।
আফগান যুদ্ধফেরত এক প্রবীন ব্রিটিশ সেনা অ্যান্ডি রেইড বলেন, ওই যুদ্ধে নেটো সেনারা সম্মুখসারিতে ছিল না একথা বলাটা খুবই অপমানজনক। যুদ্ধে অ্যন্ডি বোমা বিস্ফোরণে তার পা হারিয়েছেন। তিনি বলেন, “আহত সেনারা প্রতিটি দিন এই আত্মত্যাগের শারিরীক ও মানসিক যন্ত্রণা বয়ে বেড়াচ্ছেন।”
নেটোর অন্যান্য দেশগুলোর প্রবীন সেনারাও ট্রাম্পের মন্তব্যের সমালোচনায় সরব হয়েছেন। আফগানিস্তান ও ইরাকে যুদ্ধ করা বিশেষ বাহিনীর কমান্ডার ও অবসরপ্রাপ্ত পোলিশ জেনারেল রোমান পোলকো বলেন, আমরা আশা করি ট্রাম্প তার বক্তব্যের জন্য ক্ষমা চাইবেন।
তিনি বলেন, “ট্রাম্প সীমা ছাড়িয়ে গেছেন। আমরা তার জোটের জন্য রক্ত দিয়েছি। আমরা সত্যিই আত্মত্যাগ করেছি।”
কী ঘটেছিল আফগানিস্তানে?
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের টুইন টাওয়ারে সন্ত্রাসী হামলার পর জঙ্গি গোষ্ঠী আল-কায়েদা ও আফগান তালেবান দমনের লক্ষ্য নিয়ে মার্কিন নেতৃত্বাধীন নেটো বাহিনী আফগানিস্তানে সামরিক আগ্রাসন শুরু করে।
২০ বছরব্যাপী সেই যুদ্ধে নেটো জোটের ১ লাখ ৩০ হাজারের বেশি সেনা মোতায়েন ছিল। এর মধ্যে ছিল ব্রিটিশ সেনারাও। যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা রক্ষায় নেটোর আর্টিকেল-৫ এর বিধান মেনে তারা সমন্বিতভাবে যুদ্ধে অংশ নিয়েছিল
যুদ্ধে যোগ দেওয়া নেটো বাহিনীতে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাই সবচেয়ে বেশি ছিল। এ সংখ্যা ছিল প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার। তবে বাহিনীর অন্যান্য দেশগুলোর বহু সেনাও মারাত্মকভাবে হতাহত হয়েছে। এই দেশগুলোরও হাজার হাজার সেনা আফগানিস্তানের যুদ্ধে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে লড়েছে।