Published : 27 Jun 2024, 06:13 PM
মধ্য আমেরিকার দেশ হন্ডুরাসের সাবেক প্রেসিডেন্ট হুয়ান অরলান্দো এর্নান্দেজকে মাদক ও অস্ত্র মামলায় দোষী সাব্যস্ত হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে ৪৫ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রে কোকেইন আনার ষড়যন্ত্র এবং মেশিনগানসহ 'ধ্বংসাত্মক ডিভাইস' রাখার দায়ে মার্চে আদালত কর্তৃক দোষী সাব্যস্ত হয়েছিলেন এর্নান্দেজ (৫৫) ।
নিউ ইয়র্কের তদন্তকারী কৌঁসুলিরা বলেছেন, তিনি মধ্য আমেরিকার দেশটিকে 'মাদক রাষ্ট্রের' মতো করে পরিচালনা করেছেন আর মাদক পাচারকারীদের আইন থেকে আড়াল করার জন্য তাদের কাছ থেকে লাখ লাখ ডলার ঘুষ নিয়েছেন।
দণ্ডাজ্ঞার আগে কৌঁসুলিরা তাদের সমাপনী যুক্তিতে বলেছেন, “তিনি যুক্তরাষ্ট্র পর্যন্ত একটি কোকেইনের মহাসড়ক বানিয়ে দিয়েছিলেন যেটি মেশিনগান দিয়ে সুরক্ষিত ছিল।”
বিবিসির তথ্য অনুযায়ী, এর্নান্দেজের সাজার অংশ হিসেবে তাকে ৮০ লাখ ডলার জরিমানাও করা হয়েছে।
সাজা ঘোষণার শুনানিতে এর্নান্দেজ বলেন, 'আমি নির্দোষ। আমাকে অন্যায়ভাবে অভিযুক্ত করা হয়েছে।”
শুনানির সময় বিচারক তাকে 'ক্ষমতার জন্য ক্ষুধার্ত দ্বিমুখো রাজনীতিবিদ' বলে অভিহিত করেন।
গত মার্চে এই মামলায় তাকে দোষী সাব্যস্ত করেছিল নিউ ইউর্কের ম্যানহাটন ফেডারেল আদালত। বুধবার তার দণ্ডাজ্ঞা ঘোষণা করেন বিচারক কেভিন ক্যাস্টেল।
২০১৪ সালে হন্ডুরাসের প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন হুয়ান অরলান্দো এর্নান্দেজ। তারপর টানা দুই মেয়াদে ক্ষমতায় ছিলেন ২০২২ সাল পর্যন্ত। তার কারাদণ্ডের খবরে দেশে–বিদেশে হন্ডুরাসের বহু মানুষকে উল্লাস করতে দেখা গেছে। তাদের মতে, এটা তাদের দেশের শাসকশ্রেণির একজন সদস্যের দুর্নীতি ও প্রতারণার জন্য জবাবদিহিতার একটি বিরল উদাহরণ।
ক্ষমতায় এসে এর্নান্দেজ প্রথমে আইনশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় তৎপরতা দেখিয়েছিলেন, কারণ তিনি হন্ডুরাসের মাদক সংক্রান্ত অপরাধ নির্মূলের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।
কিন্তু এর বিপরীতে তিনি ‘যুক্তরাষ্ট্রে অবৈধভাবে বিপুল কোকেইন পাচারের উপর ভিত্তি করে একটি দুর্নীতিগ্রস্ত ও নির্মমভাবে সহিংস সাম্রাজ্য গড়ে তুলতে বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী মাদক পাচারকারীদের সাথে অংশীদারিত্ব করেছিলেন’ বলে অভিযোগ কৌঁসুলিদের।
প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব ছাড়ার তিন মাস পর তাকে নিউইয়র্কে প্রত্যপর্ণ করা হয় এবং ২০২২ সালের এপ্রিলে যুক্তরাষ্ট্রে ফেডারেল অভিযোগের মুখোমুখি হওয়ার জন্য তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। তারপর থেকে নিউ ইয়র্কের ব্রুকলিনের কারাগারে ছিলেন তিনি।
এর আগে তাকে যুক্তরাষ্ট্রের একজন জাদরেল মিত্র হিসেবে দেখা হতো। হন্ডুরাসকে মাদক নির্মূলে সহায়তার জন পাঁচ কোটি ডলারেরও বেশি অর্থ পাঠিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। পাশাপাশি নিরাপত্তা ও সামরিক সহায়তা হিসেবে অতিরিক্ত আরও লাখ লাখ ডলার পাঠিয়েছিল।
২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও এর্নান্দেজ পরস্পরকে ধন্যবাদ জানিয়েছিলেন মাদক চোরাচালানের বিরুদ্ধে জোরদার লড়াইয়ে পাশে থাকার জন্য।
মার্কিন কৌঁসুলিরা পরবর্তীতে উন্মোচন করেন, হার্নান্দেজ প্রেসিডেন্ট হওয়ার অনেক আগে থেকেই মাদক পাচারকারীদের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং তিনি যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৫০০ টন কোকেইন পাচারে সহায়তা করেছিলেন।
কৌঁসুলিরা জানান, কলম্বিয়া ও ভেনিজুয়েলা থেকে হন্ডুরাস হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে কোকেন পাচারের জন্য মাদক পাচারকারীরা তাকে লাখ লাখ ডলার ঘুষ দিয়েছিল।
তার বিচার চলাকালীন, বেশ কয়েকজন দোষী সাব্যস্ত মাদক পাচারকারী সাক্ষ্য দিয়েছে যে তারা হার্নান্দেজকে ঘুষ দিয়েছিল।

কৌঁসুলিদের অভিযোগ, ২০১৩ ও ২০১৭ সালে হন্ডুরাসের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে নিজের পক্ষে নিয়ে আসার জন্য কর্মকর্তাদের ঘুষ দিতে মাদক কারবারীদের দেওয়া অর্থ ব্যবহার করেছিলেন তিনি।
অভিযোগ অস্বীকার করে হার্নান্দেজ দাবি করেন তিনি ‘সংগঠিত অপরাধ এবং রাজনৈতিক শত্রুদের দ্বারা প্রতিহিংসা এবং ষড়যন্ত্রের শিকার’ হয়েছেন। তিনি তার সাজার বিরুদ্ধে আপিল করবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তার ভাই, হন্ডুরাসের সাবেক কংগ্রেসম্যান, ২০২১ সালে পৃথক মাদক মামলায় ম্যানহাটনের একই আদালতের মাধ্যমে দণ্ডিত হয়েছিলেন। হুয়ান আন্তোনিও ‘টনি’ এর্নান্দেজ বর্তমানে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ভোগ করছেন।
উল্লেখ্য, এর্নান্দেজই লাতিন আমেরিকার প্রথম সাবেক রাষ্ট্রপ্রধান নন, যাকে যুক্তরাষ্ট্রে মাদক সংক্রান্ত অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করা হলো।
এর আগে পানামার মানুয়েল নরিয়েগাকে ১৯৯২ সালে মিয়ামির একটি আদালতে মাদক পাচারের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছিল আর গুয়াতেমালার আলফোনসো পোর্তিওকে ২০১৪ সালে নিউইয়র্কের একটি আদালতে অর্থ পাচারের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছিল।অস্ত্র মামলা, ঘুষ, ধ্বংসাত্মক ডিভাইস, দ্বিমুখো রাজনীতিবিদ