Published : 21 May 2026, 10:22 PM
২০০৯ সালে আটলান্টিক মহাসাগরে বিধ্বস্ত হয়েছিল এয়ার ফ্রান্সের ‘এএফ-৪৪৭’ ফ্লাইট। এতে এয়ারবাস এ৩৩০ উড়োজাহাজে থাকা ২১৬ জন যাত্রী ও ১২ জন ক্রুর কেউই আর বেঁচে ফেরেননি। সেই দুর্ঘটনার দীর্ঘ ১৭ বছর পর ঐতিহাসিক রায় দিয়েছে ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসের এক আপিল আদালত।
অবহেলাজনিত দুর্ঘটনার অভিযোগে বিমান পরিচালনাকারী সংস্থা এয়ার ফ্রান্স ও উড়োজহাজ নির্মাতা কোম্পানি এয়ারবাসকে দোষী সাব্যস্ত করেছে আদালত। বৃহস্পতিবার আদালত এই রায় ঘোষণা করেছে।
রায়ে আদালত বলেছে, ২০০৯ সালে ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরো-প্যারিস রুটের সেই দুর্ঘটনায় ‘করপোরেট নরহত্যার’ অভিযোগে দুই কোম্পানিই দোষী।
৮ সপ্তাহের বিচার চলার পর কৌসুলিদের আবেদনের প্রেক্ষিতে এয়ারবাস ও এয়ার ফ্রান্সকে সর্বোচ্চ অঙ্কের দুই লাখ ২৫ হাজার ইউরো (দুই লাখ ৬০ হাজার ৯৭১ মার্কিন ডলার) করে জরিমানা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে আদালত। তবে এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এর আগে ২০২৩ সালের এপ্রিলে ফ্রান্সের একটি নিম্ন আদালত পর্যাপ্ত প্রমাণের অভাবে কোম্পানি দুটিকে খালাস দিয়েছিল। তবে দুর্ঘটনায় নিহতদের পরিবারগুলোর আপিলের পরিপ্রেক্ষিতে দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর অবশেষে দুই কোম্পানিই দোষী সাব্যস্ত হল।
দুর্ঘটনায় নিহত যাত্রীদের স্বজনরা বৃহস্পতিবার রায় শুনতে আদালতে জড়ো হয়েছিলেন। তাদের বেশিরভাগই ফরাসি, ব্রাজিলিয়ান ও জার্মান নাগরিক।
ভুক্তভোগী এই পরিবারগুলোর অনেকেই এয়ার ফ্রান্স ও এয়ারবাসকে আদালতের বেঁধে দেওয়া জরিমানার পরিমাণকে ‘নগণ্য ও প্রতীকী’ বলে সমালোচনা করেছেন। তাদের মতে, শত শত মানুষের প্রাণের মূল্যের কাছে এই জরিমানা কিছুই নয়।
তবে আদালতের এই রায়ের ফলে বিশ্ব বাজারে কোম্পানি দুটির বাণিজ্যিক সুনাম ক্ষুন্ন হবে।
কী ঘটেছিল সেই দুর্ঘটনার রাতে:
২০০৯ সালের ১ জুন রাতে ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরো থেকে ফ্রান্সের প্যারিসের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিল এয়ারবাস এ-৩৩০ মডেলের একটি যাত্রীবাহী উড়োজাহাজ। মাঝ-আকাশে উড়োজাহাজটি আটলান্টিকে ঝড়ের কবলে পড়ে রেডার স্ক্রিন থেকে হারিয়ে যায়।
ফ্লাইটটিতে ৩৩ টি দেশের নাগরিকরা ছিলেন। বেশিরভাগই ছিলেন ফরাসি, ব্রাজিলীয় এবং জার্মান নাগরিক। ফরাসি বিমান চলাচলের ইতিহাসে এটি এখন পর্যন্ত সবচেয়ে ভয়াবহ দুর্ঘটনা হিসেবে বিবেচিত।
দুর্ঘটনার পর দক্ষিণ আমেরিকার উপকূল থেকে প্রায় ৭০০ মাইল দূরে আটলান্টিক মহাসাগরের প্রত্যন্ত অঞ্চলে উদ্ধার অভিযান শুরু হয়। প্রথম ২৬ দিনে সমুদ্র থেকে ৫১টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরে সমুদ্রের তলদেশের অনেক গভীরে দীর্ঘ অনুসন্ধানের দুই বছর পর ২০১১ সালে উড়োজাহাজটির ধ্বংসাবশেষ এবং ককপিটের ব্ল্যাকবক্স উদ্ধার করা সম্ভব হয়।
তদন্তে যা পাওয়া গেছে:
দুর্ঘটনার তদন্তে ২০১২ সালে বৈরি আবহাওয়ার পাশাপাশি পাইলটদের গুরুতর কিছু অবহেলা ও ভুল পদক্ষেপের প্রমাণ পান তদন্তকারীরা।
তদন্তে দেখা গেছে, উড়োজাহাজের পইলটরা ভুল করে বিমান স্টল করেছিলেন। বিমানের গতি পরিমাপক যন্ত্র 'পিটোট টিউব' বরফে আটকে যাওয়ায় স্বয়ংক্রিয় পাইলট ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। সে সময় পাইলটদের ভুলেই উড়োজাহাজটি বায়ুরোধী ‘স্টল’ অবস্থায় চলে গিয়েছিল। পাইলটরা ‘স্টল’ সতর্কবার্তা পাওয়ার পরও তা বুঝতে পারেননি।
তাছাড়া, দুর্ঘটনায় উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এয়ারবাস ও এয়ারলাইনস এয়ার ফ্রান্স- উভয়েরই দোষ ছিল। উড়োজাহাজের পিটট টিউব বা গতি পরিমাপক সেন্সরগুলো বরফে জমে যাওয়ার কারণে ভুল তথ্য দিয়েছে। এয়ারবাসের আগেই জানা ছিল যে, এই সেন্সরগুলো চরম আবহাওয়ায় বরফ জমার কারণে অচল হতে পারে।
এই ধরনের সেন্সর বিকল হলে পাইলটদের কী করা উচিত বা উড়োজাহাজ স্টল হলে সেখান থেকে কীভাবে বেরিয়ে আসতে হবে সে বিষয়ে এয়ারবাস বা এয়ার ফ্রান্স পাইলটদের পর্যাপ্ত তথ্য বা প্রশিক্ষণ দেয়নি বলে অভিযোগ আছে।
তবে শুরু থেকেই এয়ারবাস ও এয়ার ফ্রান্স তাদের বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করে এসেছে। ফরাসি আইনজ্ঞরা বলছেন, প্যারিসের আপিল আদালতের বৃহস্পতিবার দেওয়া রায়ের বিরুদ্ধে কোম্পানি দুটি খুব শিগগিরই সুপ্রিম কোর্টে আপিল করতে পারে।
রায়ের বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানতে বিবিসি-র পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলেও কোম্পানি দুটি তাৎক্ষণিক কোনও মন্তব্য করেনি।