Published : 05 Apr 2026, 01:53 AM
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প গত বুধবার হুমকি দিয়েছেন, ইরানে এমন হামলা চালানো হবে, যেন দেশটি ‘প্রস্তর যুগে’ ফিরে যায়।
‘প্রস্তর যুগে ফেরত’ পাঠানোর কথাটি টুইট করেছেন মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথও।
বিশ্লেষকরা বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের এই হুমকি তাদের কৌশলগত পরিকল্পনায় একটা পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। কারণ, চলমান যুদ্ধে ইরান যে জবাব দিয়েছে, তা ট্রাম্প প্রশাসনের ধারণার চেয়ে অনেক তীব্র ছিল।
ফলে ইরান শেষমেশ নমনীয় না হলে ট্রাম্প হয়ত এমন হামলা বেছে নিতে চাইবেন, যেন প্রতিরোধের জন্য তেহরানের হাতে পাথর আর লাঠি ছাড়া অন্য কিছু না থাকে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, চলমান যুদ্ধে ওয়াশিংটন ও তেহরান নিজেদের মতো করে জয়-পরাজয়ের সংজ্ঞা দাঁড় করাচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্র তাদের সাফল্য মাপছে ইরানের সামরিক সক্ষমতা ধ্বংসের মাধ্যমে। অন্যদিকে ইরান সাফল্যের মাপকাঠি বানিয়েছে টিকে থাকার সক্ষমতাকে।
দুই পক্ষের বিপরীতধর্মী এই দৃষ্টিভঙ্গির কারণে ট্রাম্পও যে কিছুটা হতাশ, সেটা তার বক্তব্যেও কখনো কখনো বেরিয়ে আসছে।
সেই হতাশা থেকে ট্রাম্প ইরানে কতটা ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে নিজেকে জয়ী ঘোষণা করবেন, সেটা একটা শঙ্কা তৈরি করছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।
বুধবার ট্রাম্প দাবি করেন, ইরানের নৌ ও বিমানবাহিনী ‘শেষ’ হয়ে গেছে। তাদের রাডার ধ্বংস করার পাশাপাশি ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি ও নিক্ষেপ করার সক্ষমতা ‘ভেঙে দেওয়া হয়েছে’। তাদের সামরিক শিল্পও ধ্বংসের পথে। ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো ধ্বংস করার হুমকিও দেন তিনি।
কিন্তু বিশ্লেষক কিংবা বিশ্ব সংবাদমাধ্যম ট্রাম্পের এসব সামরিক অর্জনকে কৌশলগত সাফল্য হিসেবে দেখছে না।

গত সপ্তাহে দ্য ইকোনমিস্ট তাদের প্রচ্ছদের শিরোনাম করে, ‘অ্যাডভান্টেজ ইরান’।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যমটি লিখেছে, চলমান যুদ্ধের দুটি অস্বস্তিকর পরিণতি হলো, ইরানের ‘কট্টরপন্থিরা’ তাদের ক্ষমতা আরো সংহত করেছে এবং হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ করে দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম দ্য আটলান্টিক লিখেছে, ডনাল্ড ট্রাম্প যেটা বিজয় মনে করেন, ইরানের চোখে তা বিজয় নয়। ইরানের কাছে বিজয় মানে হলো, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা।
যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা যুদ্ধে জয়ী হওয়ার চেয়ে কম নয়— এমন মনোভাবের বীজ ইরানিদের মধ্যে তৈরি হয় হাজার দেড়েক বছর আগেই।
৬৮০ সালে কারবালার যুদ্ধে ইমাম হুসাইন নিহত হলেও সেটা শিয়াদের কাছে গৌরবময় এক ঘটনা। ইমাম হুসাইনের মৃত্যু কোনো কোনো প্রেক্ষাপটে তাদের কাছে বিজয়ী হওয়ার চেয়েও উজ্জ্বল।
ফলে এই মানদণ্ডে ইরান এরই মধ্যে প্রমাণ করেছে যে, মার্কিন হামলায় তাদের হাজারো মানুষের প্রাণ গেলেও কিংবা ব্যাপক সামরিক ক্ষয়ক্ষতি হলেও তাদের যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা ফুরিয়ে যায়নি।
গত বুধবার রাতে ট্রাম্প বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রের জন্য হুমকি তৈরি করবে, ইরানের সেই সক্ষমতা আমরা ধ্বংস করে দিচ্ছি।”
এরপর তিনি বলেন, “ইরানের শাসন ব্যবস্থার পরিবর্তন আমাদের লক্ষ্য ছিল না।”
কিন্তু ইরানে হামলা শুরুর পরেই জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে ইরানের শাসক গোষ্ঠীকে উৎখাতের লক্ষ্যের কথাও শুনিয়েছিলেন তিনি।

বিশ্লেষকরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল এই আশা নিয়েই যুদ্ধ শুরু করেছিল যে, তাদের হামলার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ইরানের শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়বে। কিন্তু তাদের সেই আশায় ফাটল ধরেছে।
কারণ মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনী গেল কয়েক দিনে ইরানের সামরিক-বেসামরিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা বাড়িয়ে দিয়েছে। তারা হয়ত চাইছে, ইরানের শাসক গোষ্ঠীকে উৎখাত করা না গেলেও দেশটিকে যেন সব দিক থেকে পঙ্গু করে দেওয়া যায়।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, যুদ্ধের এই গতিপ্রকৃতি ইরানের জন্য মর্মান্তিক পরিণতি ডেকে আনতে পারে। কারণ, ইরানের শাসনব্যবস্থার সহনশীলতা ধ্বংস করতে গেলে দেশটিকেই ধ্বংসস্তূপে পরিণত করার প্রয়োজন হতে পারে।
ইরানের অর্থনীতির প্রতিটি খাতেও ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) আধিপত্য রয়েছে।
বিশ্লেষকদের পর্যবেক্ষণ হলো, আইআরজিসির ঘাঁটিতে বোমা হামলা হলে তারা হয়ত সামরিক দিক থেকে নিস্তেজ হয়ে পড়বে। কিন্তু তাদের পুনর্জন্ম ঠেকাতে গেলে ইরানের অর্থনীতির বড় অংশ ধ্বংস করতে হতে পারে। আর সেটা করলে সাধারণ ইরানিরা বহু বছরের জন্য দুর্ভোগে পড়ে যাবে।
ট্রাম্প অবশ্য সেই ইঙ্গিতই দিয়েছেন যে, তিনি যুদ্ধের করুণ পরিণতি পর্যন্ত এগোতে প্রস্তুত আছেন।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ইনডিপেনডেন্ট লিখেছে, ইরানকে লক্ষ্য করে ট্রাম্পের এ ধরনের হুমকি-ধমকি অবশ্য এটাই প্রথম নয়।
এর আগে ২০১৮ সালের জুলাইয়ে তৎকালীন ইরানি প্রেসিডেন্টকে উদ্দেশ করে ট্রাম্প টুইট করেছিলেন, “হাসান রুহানি যদি আবারও যুক্তরাষ্ট্রকে হুমকি দেন, তবে ইরানকে এমন পরিণতি ভোগ করতে হবে, যা ইতিহাসে খুব কম জাতিই ভোগ করেছে।”
পরের বছরের মে মাসে তিনি হুমকি দিয়ে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যেকোনো লড়াই হবে ইরানের ‘আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি’।
এর এক মাস পর তিনি বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রের কোনো স্থাপনায় হামলা হলে যে জবাব দেওয়া হবে, তার মানে হবে কিছু এলাকার সম্পূর্ণ বিলুপ্তি।”
অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, ইরানকে ‘প্রস্তর যুগে’ পাঠিয়ে দেওয়ার হুমকি আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন।
ট্রাম্পের যুদ্ধকে ‘জাতিসংঘ সনদের স্পষ্ট লঙ্ঘন’ হিসেবে অভিহিত বৃহস্পতিবার একটি বিবৃতি দিয়েছেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ১০০ জনের বেশি আইন বিশেষজ্ঞ।

ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ইউএস প্রোগ্রামের উপদেষ্টা ব্রায়ান ফিনুকেন বলেন, ট্রাম্পের ‘প্রস্তর যুগে পাঠিয়ে দেওয়ার’ হুমকি বড় ধরনের ধ্বংসযজ্ঞের সংকেত হিসেবে দেখা যেতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বিকল্প ধারার সংবাদমাধ্যম ‘ন্যাশন ফর চেইঞ্জ’ লিখেছে, ট্রাম্পের এই ভাষা মূলত কার্টিস লে-মে’র বিখ্যাত উক্তির প্রতিধ্বনি।
লে-মে ছিলেন একজন মার্কিন সামরিক কমান্ডার, যিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এবং ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় ব্যাপক বিমান হামলার নির্দেশ দেওয়ার জন্য পরিচিত ছিলেন।
লে-মে ভিয়েতনামি বাহিনীকে সতর্ক করে বলেছিলেন, “তোমাদের আগ্রাসন বন্ধ করো, নাহলে আমরা তোমাদের বোমা মেরে প্রস্তর যুগে পাঠিয়ে দেব।”
তার এই কথা ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া ও লাওসজুড়ে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের প্রতীকে পরিণত হয়েছিল।
ইতিহাস বলছে, ভিয়েতনাম ও আশপাশের দেশগুলোতে মার্কিন বোমা হামলায় প্রায় ৪০ লাখ মানুষের প্রাণ গিয়েছিল।
মার্কিন কংগ্রেসের একমাত্র ইরানি বংশোদ্ভূত সদস্য ইয়াসামিন আনসারি মনে করেন, “ইরানে একটার পর একটা যুদ্ধাপরাধ ঘটছে। এই সংঘাতের পরিণতি হবে সুদূরপ্রসারী ও বিপর্যয়কর।”
মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনীর এ ধরনের সামরিক অভিযানের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক জাতীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তা বেন রোডস।
তিনি বলেছেন, “এর সঙ্গে পারমাণবিক কর্মসূচি বা ইরানিদের সহায়তার কোনো সম্পর্ক নেই। এটি কেবল অর্থহীন ও চিরস্থায়ী যুদ্ধ। এটি পতনের দিকে ধাবিত এবং ক্ষুব্ধ একটি পরাশক্তির আস্ফালন।”
আরো পড়ুন
ইরানে ‘ভয়াবহ ও বিপজ্জনক’ পরিস্থিতির মধ্যে মার্কিন ক্রুর সন্ধানে উদ্ধারকারী দল
ইরানে একদিনে দুই মার্কিন যুদ্ধবিমান ভূপাতিত, পাইলটের খোঁজে চলছে অভিযান
ইরান যুদ্ধের চাপে মন্ত্রিসভায় 'বড় রদবদলের কথা ভাবছেন' ট্রাম্প
ইরান যুদ্ধে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ বিশেষজ্ঞদের, খোলা চিঠিতে উদ্বেগ