Published : 04 Apr 2026, 12:42 AM
চলমান ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলসহ সব পক্ষের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আইনের ‘গুরুতর লঙ্ঘনের’ অভিযোগ তুলে উদ্বেগ জানিয়েছে একদল বিশেষজ্ঞ।
আন্তর্জাতিক আইনের শতাধিক বিশেষজ্ঞ এ বিষয়ে একটি খোলা চিঠিতে স্বাক্ষর করেছেন।
চিঠিটি নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটি স্কুল অব ল-এর অনলাইন সাময়িকী 'জাস্ট সিকিউরিটি'-তে প্রকাশিত হয়েছে। শুক্রবার বিবিসিতে প্রকাশিত এক খবরে এ তথ্য জানানো হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইরানের ওপর হামলা চালানোর মার্কিন-ইসরায়েলি সিদ্ধান্ত ছিল জাতিসংঘ সনদের স্পষ্ট লঙ্ঘন। কারণ জাতিসংঘ সনদ আত্মরক্ষা বা নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদন ছাড়া শক্তি প্রয়োগ সমর্থন করে না।
চিঠিতে বিশেষজ্ঞরা যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের কর্মকর্তাদের ব্যবহৃত ‘উসকানিমূলক বাগাড়ম্বর’ বা বক্তব্যের দিকেও ইঙ্গিত করেছেন। তারা ইরানের বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো ‘ধ্বংস’ করার বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হুমকির কথাও বলেছেন।
বিশেষজ্ঞরা ‘শত্রুদের জন্য কোনো করুণা’ দেখানো হবে না বলে মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথের দেওয়া বিবৃতিরও বিরোধিতা করেছেন।
যুদ্ধে 'ডিনায়াল অব কোয়ার্টার' নামে একটি শব্দের ব্যবহার আছে, যার অর্থ হলো, আত্মসমর্পণকারী বা যারা আহত, তাদেরসহ কাউকেই জীবন ভিক্ষা দিতে অস্বীকার করা।
চিঠিতে সই করা ব্যক্তিরা বলেছেন, আন্তর্জাতিক আইনে এটি ঘোষণা করা ‘বিশেষভাবে নিষিদ্ধ’। এমনকি মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের নিজস্ব যুদ্ধ আইনের ম্যান্যুয়ালেও এ নিষেধাজ্ঞার কথা বলা হয়েছে।
খোলা চিঠিতে স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে রয়েছেন, মার্কিন সেনাবাহিনীর সাবেক বিচারক জোনাথন ট্রেসি, মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের সাবেক আইনি উপদেষ্টা হ্যারল্ড হংজু কোহ এবং ইয়েল ল স্কুলের আন্তর্জাতিক আইনের অধ্যাপক এবং আমেরিকান সোসাইটি অব ইন্টারন্যাশনাল ল এর প্রেসিডেন্ট উনা এ. হ্যাথাওয়ে।
তারা বলেন, “আমরা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন যে উল্লিখিত আচরণ এবং হুমকিগুলো বেসামরিক নাগরিকদের মারাত্মক ক্ষতি করছে। একইসঙ্গে এগুলো আইনের শাসন ও মৌলিক নীতিগুলোকে ধ্বংসের ঝুঁকি তৈরি করছে, যা প্রতিটি দেশের বেসামরিক নাগরিকদের রক্ষা করে।”
এদিকে বিশেষজ্ঞদের এই চিঠির কড়া সমালোচনা করেছে হোয়াইট হাউজ। চিঠিতে স্বাক্ষরকারীদের তারা ‘তথাকথিত বিশেষজ্ঞ’ বলেও উড়িয়ে দিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন।

চিঠির জবাবে এক বিবৃতিতে হোয়াইট হাউজ বলছে, গত ৪৭ বছর ধরে ইরান আমেরিকানদের ‘হত্যা ও আহত’ করা, ‘সন্ত্রাসের এক নম্বর রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষক’ হিসেবে কাজ করছে। দেশটির দমনমূলক শাসনের বিরুদ্ধে কথা বলার জন্য নিজেদের মানুষকে নৃশংসভাবে হত্যা করারও অভিযোগ এনেছে তেহরানের বিরুদ্ধে।
হোয়াইট হাউজ জোর দিয়ে বলেছে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্র এবং তাদের মিত্রদের প্রতি ইরানের স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদী হুমকি নির্মূল করার মাধ্যমে সমগ্র অঞ্চলকে আরও নিরাপদ ও স্থিতিশীল করছেন।
তবে বিশেষজ্ঞদের এই মতকে সমর্থন করেছেন জাতিসংঘের মানবিক প্রধান টম ফ্লেচার। শুক্রবার বিবিসি রেডিও ৪-এর টুডে প্রোগ্রামে তিনি বলেন, ‘পথের কোথাও না কোথাও’ আন্তর্জাতিক আইনকে ছুঁড়ে ফেলা হয়েছে। আন্তর্জাতিক আইনের নিয়মগুলো খুব স্পষ্ট এবং অত্যন্ত শক্তিশালী, কিন্তু মূল সমস্যা হলো ‘প্রয়োগ’। তিনি ইরান যুদ্ধকে ‘বেপরোয়া’ বলেও অভিহিত করেন।
বিশেষজ্ঞদের চিঠিতে যুদ্ধের প্রথম দিনে ইরানের মিনাব শহরের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে হামলার বিষয়টিও তুলে ধরা হয়েছে, যেখানে ১১০ শিশুসহ অন্তত ১৬৮ জন নিহত হয়।
মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর জানিয়েছে, তারা এই হামলার তদন্ত করছে। তবে ক্রমবর্ধমান তথ্য-প্রমাণ ইঙ্গিত দিচ্ছে এটি সম্ভবত মার্কিন হামলা ছিল। তদন্তের অংশ হিসেবে ধারণা করা হচ্ছে, স্কুলটি ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা আইআরজিসির ঘাঁটির পাশে ছিল। ফলে পুরোনো গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে সেখানে আঘাত হানা হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের চিঠিতে বলা হয়েছে, “স্কুলে হামলার ঘটনায় যদি প্রমাণ পাওয়া যায় যে দায়ীরা বেপরোয়া ছিল, তবে এটি যুদ্ধাপরাধ হিসেবেও গণ্য হতে পারে।"
ইরান যুদ্ধে আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের মধ্যেই এই সংঘাতে হতাহতের সংখ্যা নিয়ে নতুন তথ্য প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্ট নিউজ এজেন্সি। তারা বলছে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ইরানে হামলায় অন্তত ২৪৪ শিশুসহ মোট ১৬০৬ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছে।
অন্যদিকে ইসরায়েলি জরুরি পরিষেবাগুলোর মতে, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইরান এবং লেবানন থেকে ইসরায়েলে চালানো ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় এখন পর্যন্ত ১৯ জন বেসামরিক নাগরিকের প্রাণ গেছে।
২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের ওপর বিমান হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের হামলায় হতাহতের তালিকায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির নামও আছে।
পাল্টা হামলায় ইসরায়েলসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে থাকা মার্কিন সামরিক স্থাপনাকে নিশানা বানিয়েছে ইরান।
জর্ডান, ইরাক, সৌদি আরব, বাহরাইন, কুয়েত ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ প্রায় এক ডজন দেশে হামলা চালিয়েছে তারা।
প্রায় চার সপ্তাহ ধরে চলা এ যুদ্ধে প্রাণহানি ও অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি স্থবির হয়ে পড়েছে মধ্যপ্রাচ্যের বিমান পরিবহন ব্যবস্থা; অস্থিরতা তৈরি হয়েছে জ্বালানি পণ্যের বৈশ্বিক বাজারে।