Published : 26 Jun 2026, 02:49 PM
স্বশস্ত্র মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে অস্ত্রহীন অভিযানে যাওয়া মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের 'ঢাল-তলোয়ারহীন নিধিরাম সর্দার' হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
তাই এবার মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সদস্যদেরকে আধুনিক অস্ত্র দিতে 'মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন' সংশোধনের উদ্যোগের কথা জানিয়েছেন তিনি। একইসঙ্গে মাদকের মামলার বিচারে 'প্রয়োজনে' ট্রাইব্যুনালের বিধান রাখার পাশাপাশি মাদক শনাক্তে অধিদপ্তরে 'ডগ স্কোয়াড' যুক্ত করার কথাও বলেছেন।
শুক্রবার ঢাকার ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে 'মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার ও অবৈধ পাচারবিরোধী আন্তর্জাতিক দিবস' উপলক্ষ্যে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে কথা বলছিরেন স্বরাস্ট্রমন্ত্রী।
সেখানে তিনি বলেছেন, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনটি সংশোধন করা হচ্ছে। দুয়েক দিনের মধ্যেই সেটি সংসদে উত্থাপিত হবে।
আইনে বিভিন্ন অসঙ্গতির কথা তুলে ধরে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, "মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের পোশাকে দেখতে লাগে পুলিশের মত। স্টারও আছে কিন্তু তাদের হাতে অস্ত্র নেই। যেন ঢাল নেই, তলোয়ার নেই, নিধিরাম সর্দার।
"অধিদপ্তরের সদস্যরা ফাইট করেন সশস্ত্র মাদক কারবারি বা পাচারকারীদের সঙ্গে। তারা গুলিবিদ্ধ হচ্ছে, সেজন্য আমরা আইন করছি, আগামী দুয়েকদিনের মধ্যে সেই আইনটা সংসদে উত্থাপিত হবে। তাদেরকে আধুনিক অস্ত্র ৯ এমএম পিস্তল দেওয়া হবে। যাতে ফাইট করতে পারে একটা স্বতন্ত্র অর্গান হিসেবে।"
মাদকের বিপুল পরিমাণ মামলা আদালতে বিচারাধীন রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, “শুধু ঢাকাতে ৮০ হাজার মাদকের মামলা পেন্ডিং রয়েছে। বিচারক সর্বোচ্চ ১০ হাজার মামলা যদি ডিল করেন, তাকে কমপক্ষে চার থেকে ছয় মাস পর পর মামলার তারিখ দিতে হবে। ৮০ হাজার মামলা কীভাবে ডিল হবে?
"প্রথম আইনের মধ্যে লেখা ছিল, সেখানে ট্রাইবুন্যাল করার একটা বিধান থাকবে। পরে সেটা সংশোধন হয়েছে, বলেছে এখতিয়ার সম্পন্ন আদালতে মামলা দায়ের হবে। এখতিয়ার সম্পন্ন আদালত পরিমাণের উপরে, ক্রাইমের সাজার ওপর ভিত্তি করে যার যেটুক পেনাল্টি আছে সেই হিসেবে আদালত নির্ধারিত হয়ে সেই আদালতে মামলা দায়ের হয়।"
নতুন সংশোধনের কথা জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, "এখন আমরা যেই সংশোধনী প্রস্তাব করেছি, তাতে এখতিয়ার সম্পন্ন আদালত থাকবে। পাশাপাশি মামলার সংখ্যা বিবেচনায় আমরা যেখানে প্রয়োজন মনে করব, সরকার মনে করবে, সেখানে ট্রাইবুন্যাল স্থাপন করা হবে। স্পেশালি মাদকের মামলাগুলোর জন্য।"
মাদক শনাক্তকরণের জন্য মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ল্যাব না থাকার বিষয়টি মনে করিয়ে তিনি বলেন, "পুলিশের একটা ডগ স্কোয়াড আছে, সেটা বিভিন্ন কাজে ব্যবহৃত হয়, এক্সপ্লোসিভসহ অন্যান্য কিছু ডিটেকশনের জন্য। র্যাবেরও আছে, সীমিত। কিন্তু মাদক শনাক্তকরণের একটা বিশ্বস্ত উপায় হচ্ছে ডগ স্কোয়াড। ডগ স্কোয়াড আমরা সংযোজন করেছি মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের আইনে।"
এর ফলে মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরেও ডগ স্কোয়াড যুক্ত হওয়ার আভাস দিলেন তিনি।
তিনি আরো বলেন, "মাদকের এত বেশি মামলা যে এটা কি আটা, ময়দা, হেরোইন না পাউডার- কিছুই টেস্ট করার কায়দা নেই। এন্ড অফ দি ডে কীভাবে ম্যানেজ হয়ে হেরোইন পাউডার হয়ে যায়, আটা-ময়দা। সেজন্য প্রত্যেকটা জেলায় একটা উন্নত ল্যাবরেটরি স্থাপনের প্রস্তাব আমরা করা হয়েছে।"
মন্ত্রী বলেন, "রাষ্ট্র চলে আইন-কানুন দিয়ে, আইনের ভিত্তি দিয়ে। আইন নাই, আমরা অপরাধীকে কীভাবে সাজা দেব? আদালত কীভাবে বিচার করবে? আমাদের অফিসাররা কীভাবে গ্রেপ্তার করবে? বর্তমান যুগের আধুনিক ও ডিজিটাল অপরাধের মোকাবিলা করার জন্য আমাদের এখনও বহু পুরনো আইনের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
"জুয়া, অনলাইন বেটিং এবং সাইবার স্পেসের মাধ্যমে যে সমস্ত অপরাধ সংগঠিত হচ্ছে, তা প্রতিরোধ করার জন্য এখনও ১৮৬৭ সালের জুয়া প্রতিরোধ আইন ব্যবহৃত হচ্ছে যা বর্তমান ডিজিটাল বাস্তবতার সঙ্গে একেবারেই অসঙ্গতিপূর্ণ।"
সাইবার স্পেসে অপরাধীর বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ভাষ্য, "এখানে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এবং প্রস্তাবিত সংস্কারের কথা উঠে এসেছে তা হলো সাইবার স্পেসে নাম পরিচয় গোপন করে একটিমাত্র সিম ব্যবহার করে বিভিন্ন অ্যাপ চালুর মাধ্যমে ওটিপি ব্যবহার করে অবৈধ আর্থিক লেনদেন করা হচ্ছে, যা পরবর্তীতে সহজে ট্র্যাক করা সম্ভব হয় না।
"মাদক ব্যবসার মাধ্যমে উপার্জিত অর্থ দিয়ে যে মানি লন্ডারিং হচ্ছে, তা দিয়ে তৈরি করা সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার জন্য আরও কঠোর আইনের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। যুগের সাথে তাল মিলিয়ে এই বাজেট অধিবেশনে বা পরবর্তী সময়ে সাইবার অ্যাক্ট ও অন্যান্য বাহিনী সংক্রান্ত আইনে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হচ্ছে।"
অপরাধ দমনে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালনের জন্য এলিট ফোর্সকেও আইনি কাঠামোর আওতায় সংস্কার করার পরিকল্পনা রয়েছে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. হাসান মারুফের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী।
এর আগে মন্ত্রী ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তন মাঠে স্থাপিত মাদকবিরোধী বিশেষ স্টল পরিদর্শন করেন।
অনুষ্ঠানে মাদকবিরোধী জনসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিশেষ প্রামাণ্যচিত্র ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের থিম সং প্রদর্শন করা হয় সেভানে। মাদকাসক্তি থেকে মুক্ত একজন ব্যক্তি অনুষ্ঠানে তার অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন।
এছাড়া বার্ষিক মাদক প্রতিবেদন ও বিশেষ স্যুভেনিরের মোড়ক উন্মোচন করেন এবং মাদকবিরোধী সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে আয়োজিত বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় বিজয়ী শিক্ষার্থীদের হাতে পুরস্কার ও সনদপত্র তুলে দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।