Published : 21 Mar 2026, 07:27 PM
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবহৃত সামরিক ঘাঁটিগুলোতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় যুদ্ধের প্রথম দুই সপ্তাহেই প্রায় ৮০ কোটি ডলারের (৬০০ মিলিয়ন পাউন্ড) ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ‘সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ’ (সিএসআইএস)এবং বিবিসি-র এক যৌথ বিশ্লেষণে এ তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার পর প্রথম সপ্তাহেই তেহরানের ব্যাপক প্রতিশোধমূলক হামলায় বেশিরভাগ ক্ষয়ক্ষতি হয়।
যদিও মার্কিন সম্পদের ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ চিত্র এখনও অস্পষ্ট, তবে অবকাঠামোগত এই ৮০ কোটি ডলারের হিসাবটি আগের ক্ষয়ক্ষতির খতিয়ানের চেয়ে অনেক বেশি। এতে করে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের চড়া মূল্য দেওয়ার চিত্রই সামনে আসে।
সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ (সিএসআইএস)-এর ঊর্ধ্বতন উপদেষ্টা মার্ক কানসিয়ান বলেন, “অঞ্চলটিতে মার্কিন ঘাঁটিগুলোর ক্ষয়ক্ষতির খবর কমিয়ে প্রকাশ করা হয়েছে। যদিও ক্ষয়ক্ষতি ব্যাপক বলে মনে হচ্ছে, তবে আরও তথ্য না পাওয়া পর্যন্ত প্রকৃত ক্ষতির হিসাব জানা সম্ভব হবে না।”
এ বিষয়ে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর বা সেন্ট্রাল কমান্ড কোনও মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।
লক্ষ্যবস্তু যখন আকাশ প্রতিরক্ষা ও স্যাটেলাইট যোগাযোগব্যবস্থা:
ইরানের প্রতিশোধমূলক হামলাগুলোর মূল লক্ষ্য ছিল জর্ডান, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশে থাকা মার্কিন আকাশ প্রতিরক্ষা এবং স্যাটেলাইট যোগাযোগ ব্যবস্থা।
বিশ্লেষণ অনুযায়ী, জর্ডানের একটি বিমান ঘাঁটিতে থাকা ‘থাড’ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার রেডারে হামলার কারণে উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
প্রতিরক্ষা দপ্তরের নথি অনুযায়ী, একটি এএন/টিপিওয়াই-২ রেডার সিস্টেমের মূল্য প্রায় ৪৮ কোটি ৫০ লাখ ডলার। এছাড়া, আবাসন ও অন্যান্য অবকাঠামো মিলিয়ে আরও ৩১ কোটি ডলারের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
বিবিসি ভেরিফাই-এর স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণে দেখা গেছে, কুয়েতের আলি আল-সালিম, কাতারের আল-উদেইদ এবং সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতানে যুক্তরাষ্ট্রের বিমান ঘাঁটিতে ইরান একাধিকবার হামলা চালিয়েছে। বারবার একই জায়গায় হামলা চালানোর মাধ্যমে ইরান সুনির্দিষ্ট মার্কিন সম্পদ ধ্বংসের চেষ্টা করছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। জানা গেছে, এ বিষয়ে রাশিয়া তেহরানকে গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে সহায়তা করছে।
শুরু থেকেই ইরানের হামলার লক্ষ্য ছিল রেডার এবং স্যাটেলাইট, যখন তারা বাহরাইনের মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা চালায়। এই স্যাটেলাইট ব্যবস্থা আধুনিক সামরিক অভিযানের চোক ও কানের মতোই কাজ করে।
স্যাটেলাইটের ছবিতে দুটি র্যাডোম ধ্বংস হতে দেখা গেছে। খোদ স্যাটেলাইট ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এমন সম্ভাবনাও প্রবল, যদিও সেই ক্ষতি কতটা সেটি হিসাব করা সম্ভব নয়।
কুয়েতের আল ক্যাম্প আরিফিনে যুক্তরাষ্ট্রের রেডার স্থল, সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতানে যুক্তরাষ্ট্রের বিমান ঘাঁটিতে হামলা হয়েছে।
ছবিতে থাড আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার রেডারের জায়গা থেকে ধোঁয়া উড়তে দেখা গেছে। থাড ব্যবস্থায় সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতির চিত্র স্পষ্ট হয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং জর্ডানে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিতে।
এই থাড ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ফলে যুক্তরাষ্ট্রকে দক্ষিণ কোরিয়া থেকে মধ্যপ্রাচ্যে থাড প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নতুন করে মোতায়ে ন করতে হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে।
যুদ্ধের আকাশচুম্বী ব্যয় ও প্রাণহানি:
যুদ্ধে এ পর্যন্ত ১৩ জন মার্কিন সেনাসদস্য নিহত হয়েছেন। অন্যদিকে, হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্ট নিউজ এজেন্সি হারানার হিসাবমতে, যুদ্ধে নিহতের মোট সংখ্যা প্রায় ৩,২০০ জনে দাঁড়িয়েছে, যার মধ্যে ১,৪০০ জনই বেসামরিক নাগরিক।
প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প শুক্রবার এক অনুষ্ঠানে দাবি করেছেন, “আমরা ইরানে অত্যন্ত ভাল করছি।” তিনি মনে করেন, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস এবং শাসনব্যবস্থাকে দুর্বল করার লক্ষ্য অর্জনের পথেই রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
তবে যুদ্ধের ব্যয় নিয়ে কপালে ভাঁজ পড়ছে বিশ্লেষকদের। সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ (সিএসআইএস)-এর তথ্যমতে, যুদ্ধের প্রথম ৬ দিনেই খরচ হয়েছে ১,১৩০ কোটি ডলার, যা ১২ দিনে দাঁড়িয়েছে ১,৬৫০ কোটি ডলারে।
পেন্টাগন এখন যুদ্ধের জন্য আরও ২০ হাজার কোটি ডলার বরাদ্দ চেয়েছে। মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ বৃহস্পতিবার বলেন, এই অংক আরও বাড়তে পারে। তার ভাষায়, “খারাপ লোকেদের খতম করতে অর্থের প্রয়োজন হয়।”
হরমুজ প্রণালি প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং যুদ্ধ কতদিন স্থায়ী হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে বিশ্ব অর্থনীতি এখন চরম অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।