Published : 18 Jan 2026, 12:31 AM
গ্রিনল্যান্ড সংকট ঘিরে এমন একটা পরিস্থিতি আসতে পারে, যেখানে ডনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ইউরোপকে দৃঢ় অবস্থান নিতে হবে।
কারণ ইউরোপের কর্মকর্তারা সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি গ্রিনল্যান্ড দখলের চেষ্টা করে, তবে তা ন্যাটোর ট্রান্সঅ্যাটলান্টিক জোটে ভাঙন ধরাতে পারে।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ানের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, প্রায় এক বছর ধরে ইউরোপের নেতারা ট্রাম্পের দাবিগুলো ঠান্ডা মাথায় শুনে আসছেন, যিনি ন্যাটোর সদস্য রাষ্ট্রগুলোতে প্রতিরক্ষা ব্যয় জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করার জন্য চাপ দিয়ে আসছেন।
শান্তিচুক্তি মেনে না নিলে ইউক্রেইনকে মাকিন সহযোগিতা বন্ধ করে দেওয়ার হুমকিও দিচ্ছেন তিনি। যদিও চুক্তিটি রাশিয়ার স্বার্থই বেশি রক্ষা করবে বলে অভিযোগ রয়েছে।
ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক ও যুক্তরাষ্ট্রে ‘তুলে নিয়ে যাওয়ার’ বিষয়েও ইউরোপের নেতারা চুপচাপ ছিলেন।
গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ইউরোপের অতিরিক্ত তোষামোদ অনেকটাই প্রকাশ্য। ইউরোপের অনেক নেতা নিজেদের ট্রাম্পের অনুসারী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে রীতিমতো প্রতিযোগিতায় নেমেছেন। আর ন্যাটো মহাসচিব মার্ক রুটে তো গত জুনের এক সম্মেলনে ট্রাম্পকে ‘ড্যাডি’ সম্বোধন করে বসেন।
কিন্তু ডেনমার্ককে চাপ দিয়ে আধা-স্বায়ত্তশাসিত গ্রিনল্যান্ড হস্তান্তর বা বিক্রি করার বিষয়ে ট্রাম্পের আগ্রাসী দাবি ট্রান্সঅ্যাটলান্টিক অংশীদারত্বের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সংকট তৈরি করেছে।

গ্রিনল্যান্ড নিয়ে এমন পরিস্থিতি তৈরির ঝুঁকি রয়েছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন করে সম্পর্কের সীমা টানতে হতে পারে ইউরোপকে।
সম্প্রতি ডেনমার্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লার্স ল্যোক্কে রাসমুসেন ফক্স নিউজকে বলেন, “ট্রাম্পের উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। তবে এ ক্ষেত্রে অবশ্যই আমাদের একটা ‘রেড লাইন’ রয়েছে।
“এটা ২০২৬ সাল। মানুষের সঙ্গে বাণিজ্য করা যেতে পারে, কিন্তু মানুষ নিয়ে বাণিজ্য করা যায় না।”
জার্মান মার্শাল ফান্ডের মার্কিন প্রতিরক্ষা ও ট্রান্সঅ্যাটলান্টিক নিরাপত্তা বিষয়ক সিনিয়র ফেলো ক্রিস্টিনে বেরজিনা বলেন, “গ্রিনল্যান্ড প্রশ্নে ইউরোপ এমন একটি ‘রেড লাইন’ খুঁজে পেয়েছে, যেটির পক্ষে তারা সত্যিই দাঁড়াতে চায়।
“অন্য অনেক বিষয়ে আলোচনা হতে পারে, কিন্তু গ্রিনল্যান্ড আলাদা। কারণ এটি সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন। আবার ইউরোপ নিজের ভূখণ্ড ও অধিকার রক্ষায় কতটা সক্ষম, এটা সেই প্রশ্নও বটে।”
তবে নিরাপত্তার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীলতার কারণে ইউরোপ কূটনৈতিকভাবে অনেকটা ‘বেকায়দায়’ রয়েছে বলে মনে করেন লাটভিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী ক্রিশিয়ানিস কারিন্স।
তার ভাষ্য, “ইউরোপ দৃঢ়ভাবে বিরোধিতা জানানোর মতো অবস্থায় নেই। ধরুন, ইউরোপ যদি এই বিরোধকে বাণিজ্য খাতে টেনে আনে, তবে যুক্তরাষ্ট্রও পাল্টা প্রতিক্রিয়া দেখাবে। শেষ পর্যন্ত ইউরোপের যুক্তরাষ্ট্রকে প্রয়োজন পড়বে।”
ডার্টমাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্কটিক স্টাডিজ ইনস্টিটিউটের সিনিয়র ফেলো মারিসল ম্যাডক্স বলেন, “ডেনমার্ক যুক্তরাষ্ট্রের ভালো মিত্র ছিল। তাই ঘটনাটি এতটা অস্বাভাবিক—এটা যেন কাছের বন্ধুকে গিয়ে হঠাৎ চড় মারার মতো।”

গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণে ট্রাম্পের আগ্রহ তীব্র হয় ২০১৯ সালে। ওই বছর তার দীর্ঘদিনের বন্ধু এস্তে লডার প্রসাধনী কোম্পানির উত্তরাধিকারী রোনাল্ড লডার প্রথম তাকে গ্রিনল্যান্ড নিয়ে নেওয়ার প্রস্তাব দেন।
ট্রাম্পের আগ্রহের কারণ হিসেবে হোয়াইট হাউস বলছে, জাতীয় নিরাপত্তা তাদের প্রধান উদ্বেগ। তবে ট্রাম্প নিজেই স্বীকার করেছেন, এর পেছনে তার ‘অহংবোধও’ কাজ করেছে।
গেল সপ্তাহে নিউ ইয়র্ক টাইমসকে তিনি বলেন, গ্রিনল্যান্ডের মালিক হওয়াটা ‘মনস্তাত্ত্বিক সাফল্যের জন্যও প্রয়োজন’।
সবশেষ শুক্রবার ট্রাম্প হুমকি দেন, যেসব দেশ তার গ্রিনল্যান্ড দখলের উচ্চাকাঙ্ক্ষায় ‘সহযোগিতা’ করবে না, তাদের ওপর শুল্ক আরোপ করা হবে।
ট্রাম্প প্রশাসনের কেউ কেউ, বিশেষ করে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স মনে করছেন, গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ইউরোপের সঙ্গে লড়াইয়ে জড়ানো তাদের জন্য আরেকটি সুযোগ।
তবে গ্রিনল্যান্ডের আলোচনায় ভ্যান্সের যোগ দেওয়াকে নেতিবাচক লক্ষণ হিসেবে দেখছেন ইউরোপের নেতারা।
নাম প্রকাশ না করে এক নেতা বলেন, “ভ্যান্স এটা উপভোগ করছেন। তিনি কেন এতে জড়িয়েছেন, তা স্পষ্ট— এতে আলোচনা আরও আবেগপ্রবণ হবে।”
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম পলিটিকোর খবরে বলা হয়েছে, ভ্যান্সের ভূমিকা নিয়ে ১০ জন মন্ত্রী ও কর্মকর্তার মতামত নেওয়া হয়েছে। তাদের কেউই গ্রিনল্যান্ড বা অন্যান্য ট্রান্সঅ্যাটলান্টিক বিষয়ে তাকে মিত্র মনে করেন না।
ট্রাম্প প্রশাসন যুক্তি দেখাচ্ছে, চীন ও রাশিয়ার সম্ভাব্য হামলা থেকে গ্রিনল্যান্ড যথেষ্ট সুরক্ষিত নয়। ইউরোপ অবশ্য তাদের এই যুক্তি খণ্ডানোর উদ্যোগ নিয়েছে।
বৃহস্পতিবার ফ্রান্সের একটি ছোট সামরিক দল গ্রিনল্যান্ডে পৌঁছেছে। এতে জার্মানি, সুইডেন, নরওয়ে, ফিনল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস ও যুক্তরাজ্যের সেনারাও রয়েছেন।
ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন বলেন, “গ্রিনল্যান্ডের সুরক্ষা পুরো ন্যাটো জোটের জন্যই উদ্বেগ।”

লাটভিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী কারিন্স বলেন, সেনা ও সামরিক রসদ মোতায়েনের মাধ্যমে ইউরোপ ট্রাম্প প্রশাসনের ‘নিরাপত্তার’ যুক্তিকে বাতিল করে দিতে পারে।
“ইউরোপ যদি গ্রিনল্যান্ডের সামরিক নিরাপত্তা জোরদার করে, তাহলে দখলের পক্ষে ট্রাম্প প্রশাসনের যুক্তিটি দুর্বল হয়ে পড়বে।”
পর্যবেক্ষকরা বলছেন, সামরিক শক্তি মোতায়েন ছাড়াও গ্রিনল্যান্ডের ওপর ডেনমার্কের সার্বভৌমত্ব ও ইউরোপীয় স্বার্থ রক্ষায় নানা বিকল্প রয়েছে।
এর মধ্যে ‘নমনীয়’ একটা প্রস্তাব হলো, নুক শহরে আর্কটিক নিরাপত্তা নিয়ে একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন আয়োজন করা, যা ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের সঙ্গে ইইউ, যুক্তরাজ্য, কানাডা, নরওয়ে ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশগুলো যৌথভাবে আয়োজন করবে।
কঠোর প্রস্তাবও আলোচনায় আছে। যেমন—গত বছর স্কটল্যান্ডের টার্নবেরি গলফ রিসোর্টে ট্রাম্পের সঙ্গে স্বাক্ষরিত ইইউ-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য চুক্তির অনুমোদনে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের ভোট স্থগিত রাখা।
অনেকেই বলছেন, ফেব্রুয়ারিতে নির্ধারিত সময়ে এই ভোটাভুটি হলে তা ট্রাম্পের কর্মকাণ্ডকে ‘পুরস্কৃত করার মতোই’ দেখাবে।
ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেয়েন বৃহস্পতিবার গ্রিনল্যান্ড পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে ‘মিত্র ও অংশীদার’ হিসেবে অভিহিত করেন।
তিনি গ্রিনল্যান্ডের প্রতি ইইউয়ের সহায়তা বাড়ানোর কথাও বলেন।
নুকে একটি অফিস খোলা এবং আর্থিক সহায়তা দ্বিগুণ করার প্রস্তাব তুলে ধরে তিনি বলেন, “রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও আর্থিকভাবে গ্রিনল্যান্ড আমাদের ওপর ভরসা করতে পারে।”
ইইউয়ের সভাপতিত্বে থাকা সাইপ্রাসের পররাষ্ট্রমন্ত্রী কনস্টান্টিনোস কম্বোস বলেন, গ্রিনল্যান্ড বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংলাপ আরও জোরদার করা দরকার।
তিনি বলেন, “হয়ত বর্তমান প্রশাসন (যুক্তরাষ্ট্রের) খানিকটা ভিন্ন। কিন্তু তাই বলে আত্মবিচ্ছিন্নতার পথে যাওয়ার সুযোগ আমাদের সামনে নেই।”