Published : 30 Jun 2026, 08:14 PM
কয়েক সপ্তাহ ধরে একটি ময়লা প্লাস্টিকের ব্যাগে জমিয়ে রাখা নথিপত্রের স্তূপ ওলটপালট করছেন অন্তু শেখ। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার পর থেকে ৪০ বছর বয়সী এই রেল নির্মাণ শ্রমিকের ভয়, তিনি হয়ত শুধু ভোটাধিকারই নয়, তার চেয়েও বড় কিছু হারাতে চলেছেন।
চলতি বছরের এপ্রিল ও মে মাসে অনুষ্ঠিত রাজ্য নির্বাচনের ঠিক আগমুহূর্তে পশ্চিমবঙ্গের প্রায় ৯০ লাখ বাসিন্দার নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়।
ওই নির্বাচনে ১০ কোটির বেশি মানুষের এই রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যে প্রথমবারের মতো ক্ষমতায় আসে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)।
আল জাজিরা জানিয়েছে, ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২৭ শতাংশ মুসলিম।
ভারতের নির্বাচন কমিশনের দেশজুড়ে পরিচালিত বিতর্কিত ভোটার তালিকা বিশেষ নিবিড় সংশোধন (স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন বা এসআইআর) কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য ছিল মৃত, নকল বা সন্দেহভাজন ভোটারদের চিহ্নিত করা।
মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী এই রাজ্যে মোদী সরকার এসআইআর-কে ‘অনুপ্রবেশকারী’ বা ‘অবৈধ’ বাংলাদেশি অভিবাসীদের তাড়ানোর হাতিয়ার হিসেবে সমর্থন করেছিল।
তবে বিশেষজ্ঞদের একটি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এই ভোটার ছাঁটাই প্রক্রিয়ায় মুসলিমরা আনুপাতিক হারের চেয়ে অনেক বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, বিশেষ করে মুর্শিদাবাদের মতো মুসলিমপ্রধান জেলাগুলোতে, যেখানে তাদের ভোট নির্বাচনের ফল নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখে।
অনিশ্চিত জীবন ও রেশনের ওপর আঘাত
ক্ষমতায় আসার পরপরই পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি সরকার ঘোষণা করে, যাদের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ গেছে তারা আর সরকারি ভর্তুকির রেশন এবং অন্যান্য রাষ্ট্রীয় কল্যাণমূলক প্রকল্পের সুবিধা পাবেন না।
আল জাজিরার হাতে আসা পশ্চিমবঙ্গের খাদ্য ও সরবরাহ দপ্তরের গত ৪ জুনের একটি আদেশে বলা হয়েছে, এসআইআর-এর অধীনে বাদ পড়া ব্যক্তিদের রেশন কার্ড নিষ্ক্রিয় করা হবে।
এর অংশ হিসেবে রাজ্যের প্রায় ৯ কোটি মানুষকে সেবা দেওয়া ‘পাবলিক ডিস্ট্রিবিউশন সিস্টেম’ (পিডিএস) বা সরকারি খাদ্য নিরাপত্তা কর্মসূচির সুবিধাভোগীদের যাচাইকরণ অভিযান শুরু করেছে কর্তৃপক্ষ।
অবশ্য সরকার পরবর্তীতে স্পষ্ট করেছে যে, বিশেষ ট্রাইব্যুনালে ভোটার তালিকা থেকে নাম কাটার বিরুদ্ধে আপিল করা প্রায় ২৩ লাখ মানুষ তাদের আপিলের শুনানি না হওয়া পর্যন্ত এই সরকারি সুবিধাগুলো পেতে থাকবেন।
দিনমজুর অন্তু শেখও তাদেরই একজন। তার মামলাটি ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন থাকা অবস্থায় রেশন সুবিধা চালু রাখতে তাকে আরও নথিপত্র জমা দিতে বলেছে কর্তৃপক্ষ। কিন্তু ঠিকাদারের অধীনে কাজের প্রয়োজনে তাকে প্রায়ই অন্য রাজ্যে যেতে হয়। তার পরবর্তী কাজ পড়েছে প্রতিবেশী আসাম রাজ্যে, যেখানে তাকে দ্রুতই চলে যেতে হবে।
“নথিপত্র আর শুনানির জন্য আমি এখানে অনির্দিষ্টকালের জন্য বসে থাকতে পারি না,” বলেন শেখ। “আমি যদি কাজে না যাই, তবে আমাদের ঘরে কোনো আয় আসবে না। আমরা এখনও চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে বাস করছি।”
একই ধরনের সংকটে পড়েছেন দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার রামচন্দ্রপুর শহরের বাসিন্দা ৪০ বছর বয়সী সাকিনা বানু।
তিনি আল জাজিরাকে জানান, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার বিরুদ্ধে তিনি ট্রাইব্যুনালে আপিল করেছিলেন, কিন্তু ট্রাইব্যুনাল তার আবেদন প্রত্যাখ্যান করেছে।
সাকিনা বলেন, “সব প্রয়োজনীয় নথিপত্র জমা দেওয়ার পরও কোনো শুনানি ছাড়াই আমার নাম কেটে দেওয়া হলো। এখন তারা আমাদের খাবার এবং সরকারি সাহায্য বন্ধ করে দিচ্ছে।”
প্রকল্প পরিবর্তন ও চিকিৎসার সংকট:
শুধুমাত্র খাদ্য নিরাপত্তাই নয়, নারীদের জন্য চালু থাকা একটি সরাসরি নগদ অর্থ স্থানান্তর প্রকল্পও এখন এই ভোটার তালিকা থেকে নাম কাটার প্রক্রিয়ার সাথে যুক্ত করা হয়েছে।
২০২১ সালে পূর্ববর্তী অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস (এআইটিসি) সরকার ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’ নামে একটি প্রকল্প চালু করেছিল, যার অধীনে প্রায় ২ কোটি ৪০ লাখ নারীকে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী করতে প্রতি মাসে ১,৪০০ রুপি (প্রায় ১৫ ডলার) দেওয়া হতো।
বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর এই প্রকল্পের নাম বদলে রাখে ‘অন্নপূর্ণা যোজনা’ এবং ভাতার পরিমাণ বাড়িয়ে ৩,০০০ রুপি (প্রায় ৩২ ডলার) করে।
তবে একই সাথে সুবিধাভোগীদের নতুন করে যাচাইকরণের নির্দেশ দিয়ে বলা হয়, এসআইআর তালিকায় যাদের নাম কাটা গেছে তারা এই নগদ অর্থ পাওয়ার যোগ্য হবেন না।
তিন সন্তানের মা সাকিনা বানুর স্বামী একটি স্থানীয় মসজিদের ইমাম। হৃদযন্ত্রের সমস্যার কারণে কয়েক বছর আগে সরকারি সহায়তায় প্রায় ৭ থেকে ৮ লাখ রুপি ব্যয়ে তার বুকে একটি কার্ডিয়াক ডিফিব্রিলেটর (হার্টবিট নিয়ন্ত্রক যন্ত্র) বসানো হয়েছিল। অসুস্থতার কারণে তার স্বামী এখন আর তেমন কাজ করতে পারেন না।
সাকিনা বলেন, “আমরা পুরোপুরি সরকারি রেশন ও সহায়তার ওপর নির্ভরশীল ছিলাম। এখন কী করব জানি না। আমি উদ্বিগ্ন ও ক্লান্ত।”
হুগলি জেলার বাসিন্দা ইমতিয়াজ আহমেদ জানান, তিনি এবং তার ভাই মুন্সি সিদ্দিক আহমেদ, উভয়েই সরকারি স্কুলের শিক্ষক। কয়েক দশক ধরে স্থানীয় নির্বাচন পরিচালনার কাজে যুক্ত থাকা সত্ত্বেও তাদের দুই ভাইয়ের নামই ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।
ট্রাইব্যুনাল কোনো ব্যাখ্যা বা শুনানি ছাড়াই তাদের আপিল খারিজ করে দিয়েছে এবং রাজ্য কর্তৃপক্ষ তাদের রেশন সংক্রান্ত নথিপত্র সমর্পণ করে আগামী মঙ্গলবারের মধ্যে পরিবারসহ ব্যক্তিগত তথ্যের একটি ১৩ পৃষ্ঠার ফর্ম জমা দিতে বলেছে।
ইমতিয়াজ বলেন, “ভোটার তালিকা থেকে নাম কাটার পর আমাদের মূল দুশ্চিন্তা হলো রেশন বন্ধ হয়ে যাওয়া নিয়ে। এই উদ্বেগের কারণে আমরা ঠিকমতো খেতেও পারছি না। প্রথমে আমাদের ভোট কেড়ে নিল, এখন রেশন কার্ড কাড়ছে। ধীরে ধীরে তারা আমাদের সবকিছু কেড়ে নেবে। আমরা রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের শিকার হচ্ছি।”
আইনি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারি জনকল্যাণমূলক প্রকল্পগুলোকে ভোটার তালিকার স্ট্যাটাসের সাথে যুক্ত করা গুরুতর সাংবিধানিক প্রশ্ন তোলে।
গত সপ্তাহে পশ্চিমবঙ্গের কৃষি শ্রমিকদের সংগঠন ‘পশ্চিমবঙ্গ ক্ষেত মজুর সমিতি’ রাজ্য সরকারের এই আদেশের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়।
তাদের যুক্তি ছিল, এই পদক্ষেপের কারণে ৩৫ থেকে ৬০ লাখ মানুষের রেশন কার্ড নিষ্ক্রিয় হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। তবে সুপ্রিম কোর্ট বিষয়টি জরুরি ভিত্তিতে শুনতে অস্বীকৃতি জানিয়ে সংগঠনটিকে কলকাতা হাইকোর্টে যাওয়ার পরামর্শ দেয়।
প্রবীণ আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মী সঞ্জয় হেগড়ে আল জাজিরাকে বলেন, ভোটার তালিকার সাথে রাষ্ট্রীয় কল্যাণমূলক সুবিধার সংযোগের কোনো আইনি ভিত্তি নেই।
সঞ্জয় হেগড়ে বলেন, “ভারতীয় সংবিধানের ১৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্র আইনের চোখে সমতা অস্বীকার করতে পারে না। জনকল্যাণমূলক সুবিধার সাথে ভোটার তালিকার কোনো সম্পর্ক নেই। ভারতে এমন অনেক বৈধ বাসিন্দা আছেন যারা ভোটার নন, যেমন ১৮ বছরের কম বয়সী শিশুরা। তাহলে কি তাদের কল্যাণমূলক সুবিধা দেওয়া হবে না? আপনি কীভাবে বলতে পারেন যে ভোটার হিসেবে আপনার অস্তিত্ব নেই মানে রাষ্ট্রের কাছেই আপনার কোনো অস্তিত্ব নেই?”
তিনি সতর্ক করে বলেন, এই পদক্ষেপ একটি বিপজ্জনক নজির তৈরি করতে পারে, যার অর্থ দাঁড়াবে সরকার কেবল ভোটারদের জন্যই দায়বদ্ধ, সাধারণ নাগরিকদের জন্য নয়।
কলকাতা হাইকোর্টের আইনজীবী আসিফ রেজা, যিনি ট্রাইব্যুনালে ভোটারদের নাম পুনর্বহালের মামলা লড়ছেন, তিনি জানান যে মানুষ আপিল প্রক্রিয়ার ওপর আস্থা হারাচ্ছে।
তিনি বলেন, “প্রতিদিন মাত্র ৫-৬টি মামলার শুনানি হচ্ছে। একটি জেলায় যখন ২ থেকে ৩ লাখ ভোটারের নাম কাটা যায়, তখন সব মামলার শুনানি শেষ হতে কয়েক শতাব্দী লেগে যাবে। ততদিনে আবেদনকারীরা মারা যাবেন এবং তাদের নাতি-পুতিদের ভোটাধিকারের জন্য লড়াই করতে হবে।”
প্রখ্যাত কল্যাণ অর্থনীতিবিদ জঁ দ্রেজ এই এসআইআর প্রক্রিয়াকে একটি "ত্রুটিপূর্ণ, অবিশ্বাস্য এবং স্বৈরাচারী অনুশীলন" বলে বর্ণনা করেছেন।
তিনি বলেন, “আমরা নিশ্চিতভাবে জানি যে এটি ভোটার তালিকা থেকে লাখ লাখ মানুষকে অন্যায়ভাবে বাদ দিয়েছে। এখন এই বাদ পড়ার ভুলটিকে রেশন ব্যবস্থার (পিডিএস) ওপর চাপিয়ে দেওয়া মানে মানুষের ক্ষতে নুনের ছেটা দেওয়া।”
তৃণমূল কংগ্রেসের (এআইটিসি) সংসদ সদস্য সাগরিকা ঘোষ আল জাজিরাকে বলেন, ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া নাগরিকদের সরকারি সুবিধা থেকে বঞ্চিত করা “অত্যন্ত অমানবিক এবং হতবাক করার মতো”।
তিনি বলেন, একটি ত্রুটিপূর্ণ ও তাড়াহুড়ো করে করা প্রক্রিয়ার ওপর ভিত্তি করে মানুষের খাদ্য ও কল্যাণের অধিকার কেড়ে নেওয়া যায় না।
মুর্শিদাবাদের ৩৩ বছর বয়সী আব্দুল বারী ট্রাইব্যুনালে তার নাম কাটার বিরুদ্ধে লড়াই করছেন। নথিপত্র থাকার পরও নাম বাদ পড়ায় তিনি চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
আব্দুল বারী প্রশ্ন তোলেন, “নথিপত্র থাকার পরও আমাদের নাম কেটে দেওয়া হলো। এখন আমরা মামলা জিতলেও নাম যে আবার তালিকায় উঠবে, তার গ্যারান্টি কী?”
তিনি আরও বলেন, “আমার নাম একবার কাটা গেছে বলেই তো আমি এই দেশের নাগরিকত্ব হারাইনি। আমরা ভোট দিতে পারছি না বলে আমাদের কি না খেয়ে থাকতে হবে?”