Published : 08 Apr 2026, 01:04 AM
ইরানের ওপর পাঁচ সপ্তাহ ধরে মার্কিন-ইসরায়েলি যৌথ হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প বার বার সময় বেঁধে দিয়েছেন, যুদ্ধে জয়ী হওয়ার দাবি তুলেছেন এবং একের পর এক হুমকি দিয়েছেন। তবে সেসব হুমকি এবারের মত এতটা স্পষ্ট আগে ছিল না।
এবার তিনি বলেছেন, ইরানে নতুন হামলা হবে ভয়াবহ। মঙ্গলবার ওয়াশিংটন ডিসি সময় রাত ৮টায় (ইরান সময় বুধবার ভোর সাড়ে ৩টা) হামলা শুরু হবে। চার ঘণ্টার মধ্যেই ইরানের প্রতিটি সেতু ও বিদ্যুৎকেন্দ্র গুঁড়িয়ে দেওয়া হবে।
ট্রাম্পের ভাষায়, এই পরিণতি এড়াতে হলে ইরানকে এমন একটি চুক্তিতে রাজি হতে হবে যা তার কাছে গ্রহণযোগ্য হবে। ওই চুক্তির অংশ হিসেবে হরমুজ প্রণালি দিয়ে অবাধে তেলের জাহাজ চলতে দিতে হবে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট দাবি করেছেন, ইরানকে খতম করা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এক রাতের মামলা।
তবে একজন সামরিক বিশ্লেষকের বরাত দিয়ে সিএনএন লিখেছে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ওই হুমকি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক সক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
গ্রিফিথ এশিয়া ইনস্টিটিউটের ফেলো এবং সাবেক রয়্যাল অস্ট্রেলিয়ান এয়ার ফোর্সের কর্মকর্তা পেটার লেইটনের কাছে সিএনএন জানতে চেয়েছিল, মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল কি ইরানের শত শত বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং লক্ষাধিক সেতু ধ্বংস করতে পারবে?
বিষয়টি বোঝার জন্য একটি কাল্পনিক অভিযানের হিসাব কষেছেন লেইটন।

তার বিশ্লেষণে দেখা যায়, ছয়টি বি টু স্পিরিট স্টেলথ বোমারু বিমানের একটি বহর এক মিশনে ২,০০০ পাউন্ডের মোট ৯৬টি জয়েন্ট ডিরেক্ট অ্যাটাক মিউনিশন (জেডিএএম) বহন করতে পারে।
বিমানগুলো যদি দিনে দুটি করে ফ্লাইট সম্পন্ন করতে পারে এবং সব বোমা লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষমত হয়, তাহলেও মোট ১৯২টি বোমা ব্যবহার করা সম্ভব।
ধরা যাক, এর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ৪০টি এফ ফিফটিন ঈগল যুদ্ধবিমান অভিযানে যোগ দিল। সেগুলোর প্রত্যেকটি ছয়টি করে ২,০০০ পাউন্ডের জেডিএএম বহন করতে পারে। তাতে আরও ২৪০টি বোমা যোগ হতে পারে।
সব মিলিয়ে, বিপুল সংখ্যক লক্ষ্যবস্তুর বিপরীতে মোট বোমার সংখ্যা দাঁড়ায় ৩৩২টি।
লেইটনের মতে, সব বোমা যদি নির্ভুলভাবে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষমও হয়, তারপরও তা ট্রাম্পের লক্ষ্য পূরণের জন্য যথেষ্ট নাও হতে পারে।
তিনি বলেন, “এভাবে হামলা করে প্রতিটি লক্ষ্যবস্তুর কিছু ক্ষতি করা সম্ভব হবে, কিন্তু মাঝারি থেকে বড় সেতুগুলো ধ্বংস করা কঠিন, এটা অনেক কিছুর ওপর নির্ভর করে।
“বিদ্যুৎকেন্দ্র বড় আকারের স্থাপনা, তাই এক আঘাতে উল্লেখযোগ্য ক্ষতি করতে চাই খুব সূক্ষ্ম পরিকল্পনা। এ ধরনের স্থাপনা সাধারণত শক্তিশালী কংক্রিট কাঠামো দিয়ে নির্মাণ করা হয়।”
অবশ্য সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি পুরোপুরি উড়িয়ে দিচ্ছেন না লেইটন। তিনি বলছেন, বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভেতরে ঢোকা গেলে জেনারেটরগুলোর ক্ষতি করা সম্ভব। আর বিদ্যুৎকেন্দ্রে সাধারণত অতিরিক্ত জেনারেটর মজুদ থাকে না।
যুক্তরাষ্ট্র চাইলে এই অভিযানে বি ওয়ান ল্যান্সার (প্রতিটি ২৪টি জেডিএএম বহনে সক্ষম) বা বি ফিফটি টু স্ট্র্যাটোফোর্ট্রেস (প্রায় ২০টি জেডিএএম বহন করতে পারে) বোমারু বিমানও যুক্ত করতে পারে।
তবুও এক রাতের মধ্যে পুরো ইরানকে ‘নিষ্ক্রিয়’ করা কতটা সম্ভব, সেই সন্দেহ থেকে যায়।

ফুরিয়ে আসছে সময়
চূড়ান্ত সময়সীমা ঘনিয়ে এলেও, ট্রাম্পের আল্টিমেটাম মেনে নেওয়ার কোনো লক্ষণ ইরান এখানো দেখায়নি। অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব তারা প্রত্যাখ্যান করেছে এবং নিজেদের পাল্টা কিছু দাবি তুলে ধরেছে।
বিবিসি লিখেছে, সব মিলিয়ে এক জটিল অবস্থায় পড়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। কোনো সমঝোতা না হলে, গত তিন সপ্তাহে চতুর্থবারের মত তিনি সময়সীমা বাড়াতে পারেন।
তবে অশালীন শব্দ আর কঠিন কঠিন সতর্কবার্তা দেওয়ার পর এবারও পিছিয়ে যেতে হলে নিজেকেই খেলো করতে হবে।
তাতে ইরান ও বিশ্ব সম্প্রদায়ের কাছে মনে হতে পারে, আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান নিজেদের কাছেই স্পষ্ট নয়।
সোমবার বিকেলের সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প জোর দিয়ে বলেন, “আমরা জিতেছি। তারা সামরিকভাবে পরাজিত। তাদের হাতে একমাত্র যা আছে, তা হল পানিতে মাইন ফেলার মনস্তত্ত্ব।”
বিবিসি লিখেছে, যুক্তরাষ্ট্র স্বীকার করতে না চাইলেও ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র ও মাইন ব্যবহার করে হরমুজ অচল করে রাখার মনস্তত্ত্ব ইরানের একটি শক্তির জায়গা।
আবার মার্কিন সামরিক শক্তিরও যে সীমাবদ্ধতা আছে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজেও হয়ত তা বুঝতে পারছেন।
হয়ত সে কারণেই তিনি বলেছেন, “আমরা তাদের ওপর ভয়াবহ বোমা হামলা চালাতে পারি। তাদের দিশেহারা করে দিতে পারি। কিন্তু প্রণালি বন্ধ করতে একজন সন্ত্রাসীই যথেষ্ট।”

এখন ইরানকে সমঝোতায় রাজি করাতে না পারলে এবং ট্রাম্প এবার পিছিয়ে যেতে না চাইলে, তার সামনে খোলা থাকবে কেবল হুমকি বাস্তবায়ন করার বিকল্প।
ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরানের জনগণ চলমান মার্কিন সামরিক অভিযানের কষ্ট সহ্য করতে প্রস্তুত এবং তারা তাদের শহরে পড়া বোমাকে ‘স্বাগত’ জানাচ্ছে।
তবে ট্রাম্প এটাও স্বীকার করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র এখন যা ধ্বংস করবে, তা শেষ পর্যন্ত পুনর্গঠন করতে হবে এবং সেই কাজে যুক্তরাষ্ট্রকেই হয়তো সহায়তা করতে হবে।
এর আগে ট্রাম্প ইরানকে ‘প্রস্তর যুগে’ ফিরিয়ে নেওয়ার কথা বলেছিলেন। সবশেষ মঙ্গলবার তিনি বলেছেন, “আজ রাতে একটি সম্পূর্ণ সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যাবে। এই সভ্যতা আর কখনও পুনরুদ্ধার করা যাবে না। আমি চাই না এটি ঘটুক, কিন্তু এটি সম্ভবত ঘটবে।”
আবার সেই সঙ্গে তিনি এও বলেছেন, “যেহেতু সম্পূর্ণ শাসন ব্যবস্থা পরিবর্তনের সুযোগ এসেছে, যেখানে বুদ্ধিমান ও কম উগ্র মানসিকতা জয়ী হয়েছে, সেহেতু বিপ্লবী চমৎকার কিছু ঘটতেও পারে, কে জানে?”
সময় যে ফুরিয়ে আসছে, সে কথা মনে করিয়ে দিয়ে সব পক্ষকেই সতর্ক করেছেন কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাজেদ আল আনসারি।
তিনি বলেছেন, “আমরা এমন এক পর্যায়ের কাছাকাছি পৌঁছে গেছি, যেখানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। এই যুদ্ধ চলতে থাকলে কেউই বিজয়ী হবে না।”

কেন সময় নিচ্ছে ইরান?
ইরানের নেতাদের সাম্প্রতিক আচরণে এমন কোনো ইঙ্গিত মেলেনি, যা দেখে বলা যেতে পারে যে, দেশটি মার্কিন প্রেসিডেন্টের চাপে ভেঙে পড়তে যাচ্ছে।
সিএনএন এর ইন্টারন্যাশনাল ডিপ্লোম্যাটিক এডিটর নিক রবার্টসন লিখেছেন, পেসিডেন্ট ট্রাম্পের বেঁধে দেওয়া সময়সীমা ঘনিয়ে আসছে। কিন্তু তেহরানের শাসন ক্ষমতায় এখন যারাই থাকুক না কেন, তারা দীর্ঘমেয়াদি লাভের জন্য কষ্ট সহ্য করার মানসিকতায় অভ্যস্ত।
২৮ ফেব্রুয়ারি এই যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেই ইরান হিসাব কষেছিল, তারা স্বল্পমেয়াদি একটি যুদ্ধ সহ্য করতে পারবে, যদি তারা হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখে ট্রাম্পকে আলোচনার টেবিলে আনতে পারে এবং যুদ্ধ শেষ করার শর্তগুলো নিজেদের পক্ষে রাখতে পারে।
এখন দেখা যাচ্ছে, তেলের দামে চাপ সৃষ্টি করে ট্রাম্পকে একটি সংকটপূর্ণ অবস্থানে ঠেলে দেওয়ার লক্ষ্য ছাড়িয়ে গেছে ইরান। এমনকি গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ ব্যবহার করে চাপ সৃষ্টির মাধ্যমে তারা অর্থনৈতিক সুবিধাও আদায় করতে পারছে, যা তাদের কৌশলকে আরও সময় এনে দিচ্ছে।
নিক রবার্টসনের মতে, তেহরান সম্ভবত সাম্প্রতিক যুদ্ধের ইতিহাসও বিবেচনায় নিচ্ছে।
১৯৯৯ সালে নেটোর কসোভো অভিযানে মাসের পর মাস কৌশলগত হামলা চালিয়েও সার্বিয়ার সেনা চলাচল থামানো যায়নি। ১৯৯১ ও ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধেও একই ধরনের পরিস্থিতি দেখা গেছে।
২০০৬ সালে লেবাননে ইসরায়েলের বিমান হামলায় সিরিয়ার সঙ্গে প্রধান সেতুটি ধ্বংস করা হয়েছিল। এবারও লেবাননে হামলা করে সেতু ধ্বংস করেছে ইসরায়েল। কিন্তু এসব আঘাত বড়জোর বিঘ্ন সৃষ্টি করতে পেরেছে, এক রাতের মধ্যে পরিস্থিতি বদলে দিতে পারেনি।
নিক রবার্টসন লিখেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট এর আগেও একাধিকবার ইরানকে ধ্বংস করার সময়সীমা বেঁধে দিয়ে পরে তা পিছিয়েছেন। আবারও তিনি সরে আসবেন কি না, তা একটি প্রশ্ন। তবে ইরান আপাতত নিজেদের সহ্য ক্ষমতা পরীক্ষা করতে প্রস্তুত বলেই মনে হচ্ছে।

যুদ্ধাপরাধ?
ইরানের বেসামরিক অবকাঠামোর ওপর যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলা যুদ্ধাপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন ইউনিভার্সিটি অব আমস্টার্ডামের ফৌজদারি আইনের সহকারী অধ্যাপক মারিয়েকে হুন।
আল জাজিরাকে তিনি বলেন, সেতু বা বিদ্যুৎকেন্দ্রের মত বেসামরিক স্থাপনাগুলো যদি কার্যকরভাবে সামরিক সুবিধা দেয়, তাহলে কিছু ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম হতে পারে। তা না হলে এসব স্থাপনায় হামলা অপরাধ হিসেবেই গণ্য হয়।
ইউক্রেইনে বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলার ঘটনায় আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালত যখন রাশিয়ার নেতাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছিল, তখন এটা স্পষ্ট করেছিল যে, সম্ভাব্য বেসামরিক ক্ষতি যে কোনো সামরিক সুবিধার চেয়ে বেশি গুরুত্ব পায়।
অধ্যাপক হুন বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যে ভাষা ব্যবহার করছে, তা আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
“প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইতোমধ্যে বলেছেন, ইরান চুক্তিতে রাজি না হলে দেশটিকে ‘প্রস্তর যুগে’ ফিরিয়ে দেওয়া হবে। এ ধরনের হুমকি বেসামরিক জনগোষ্ঠীকেও লক্ষ্যবস্তু করার ইঙ্গিত দেয়, যা মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে।