Published : 02 Jun 2026, 07:25 PM
যুক্তরাজ্যের এমপি রুপার্ট লোর সাম্প্রতিক একটি বক্তব্যে দেশটিতে ‘পাক গ্রুমিং গ্যাংয়ের’ যৌন নির্যাতন নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
পার্লামেন্টে দেওয়া বক্তব্যে ওই ব্রিটিশ এমপি ভুক্তভোগীদের বয়ানে এই গ্যাংয়ের নির্যাতনের চিত্র তুলে ধরেন বলে এনডিটিভির খবরে বলা হয়েছে।
অনুসন্ধানের বরাতে যুক্তরাজ্য সরকার বলেছে, অপরাধীদের বেশির ভাগই পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত ট্যাক্সি চালক ও স্থানীয় বাজারের ব্যবসায়ী।
পার্লামেন্টে ভুক্তভোগীদের কিছু জবানবন্দি পড়ে শোনান লো, যেখানে ভয়াবহ যৌন নির্যাতন, অপ্রাপ্ত বয়সে গর্ভধারণ, ভয় দেখানো, পুলিশের অসদাচরণ এবং প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার বিষয় উঠে এসেছে।
লো বলেন, সরকারের অনুসন্ধানের সময় এসব জবানবন্দি নেওয়া হয়েছিল।
"আমি পার্লামেন্টকে অনুরোধ করছি, যেন তারা এসব সাহসী ভুক্তভোগীর জবানবন্দি শোনেন এবং ব্যবস্থা নেন।"
জবানবন্দিতে যা আছে
এই স্বতন্ত্র এমপির তথ্য অনুযায়ী, একজন ভুক্তভোগী বলেছেন যে, এক অপরাধী জোর করে একটি মদের বোতল তার যোনিপথে ঢুকিয়ে দিয়েছিল।
তিনি বলেন, "বোতলটি ভেতরে থাকা অবস্থাতেই ওই ব্যক্তি সেটি ভেঙে ফেলে। সেই সময় ওই নারীর বয়স ছিল বড়জোর ১২ কি ১৩ বছর।"
আরেক নারীর ভাষ্য, দেশের বিভিন্ন স্থানে একাধিক পুলিশ কর্মকর্তা তাকে ধর্ষণ করেছিলেন।
আরেক নারীর অভিযোগ, ১৩ বছর বয়স থেকে তার ওপর নির্যাতন শুরু হয়েছিল।
তিনি বলেন, "তিন বছরে আমি সম্ভবত ৬০০ থেকে ৭০০ পুরুষ দ্বারা ধর্ষিত হয়েছি।"
ভুক্তভোগীদের জবানবন্দি অনুযায়ী, চক্রের সদস্যরা নারীদের সঙ্গে কেমন আচরণ করবে এবং কীভাবে তাদের নিয়ন্ত্রণ করবে, তা বৈধতা দিতে জাতিগত তুলনার আশ্রয় নিত।
এক নারী বলেন, "আমার যোনিপথ ও মলদ্বার দিয়ে রক্ত ঝরছিল। জায়গাটা এতই ফুলে গিয়েছিল যে, আমি বসতে পারছিলাম না।
“আমি হাসপাতালের কর্মীদের বলেছিলাম যে, আমার পানীয়তে মাদকদ্রব্য মেশানো হয়েছিল। আমার সঙ্গে কী ঘটেছিল, তা আমি জানি না। আমি মিথ্যা বলেছিলাম। কারণ সত্যি কথা বলতে আমি প্রচণ্ড ভয় পাচ্ছিলাম।
তিনি বলেন, “তারা কোনো প্রশ্ন করেনি। তারা আমাকে কিছু বড়ি দিয়ে ছেড়ে দেয়। তখন আমার বয়স ছিল মাত্র ১৫ বছর।"
কিছু ভুক্তভোগীর ভাষ্য, তাদেরকে পশু হিসেবেও গণ্য করা হতো।
এক নারী বলেন, "আমার মনে আছে, এক ব্যক্তি একটি ভ্যানের পেছনের দরজা খোলে এবং আমি দেখতে পাই ১৫ থেকে ২০ জন মেয়েকে কুকুরের খাঁচায় বন্দি করে রাখা হয়েছে।"
আরেকজন স্মৃতিচারণ করেন, তাদের সঙ্গে কুকুর রাখা হতো এবং ‘নড়াচড়া’ করার কোনো জায়গা ছিল না।
তিনি বলেন, "আমার আমার চারপাশে একাধিক পুরুষ ছিল। তারা হাসছিল, ভিডিও করছিল এবং বাজি ধরছিল যে কুকুরটি সত্যিই আমাকে ধর্ষণ করতে পারবে কিনা। আমি নিজেকে রক্ষা করতে পারিনি।
“একজন আমার মুখ চেপে ধরে আমার চোখের দিকে তাকিয়ে ছিল। সে দেখছিল, আমি কখন ভেঙে পড়ি এবং সে আমাকে ভেঙে চুরমার করে দিয়েছিল।"
আরেকজন ভুক্তভোগী বলেন, "কয়েকজন পুরুষ আমাকে চেপে ধরে রেখেছিল এবং তারা প্রত্যেকে পালাক্রমে পায়ু ও যোনিপথে ধর্ষণ করছিল।
“নির্যাতন শেষ হওয়ার পর তারা আমাকে বারবার মারধর করে এবং কাউকে কিছু বললে মেরে ফেলার হুমকি দেয়।"
আরেক ভুক্তভোগীর ভাষ্য, “অপরাধীরা অনবরত এমন মন্তব্য করত, যা দিয়ে বোঝানো হতো যে, শ্বেতাঙ্গ ও খ্রিস্টান মেয়েদের নৈতিকতা বা মূল্য কম। মুসলিম মেয়েদের মর্যাদা এবং উচ্চ নৈতিক অবস্থান রয়েছে বলে কিছু পুরুষ বর্ণনা করত।"
আরেক নারী মনে করেন, নির্যাতন চালানোর ক্ষেত্রে জাতিগত বিষয়টির প্রভাব ছিল। এর ভিত্তিতে অনেক সময় ভুক্তভোগী বেছে নেওয়া হত।
“আমার ওপর চলা পুরো নির্যাতনের সময় আমি অন্য যেসব মেয়ের মুখোমুখি হয়েছি বা যারা আমার মতো নির্যাতনের শিকার হয়েছে, তারা প্রায় সবাই শ্বেতাঙ্গ ছিল।"
তদন্ত প্রক্রিয়া
এমপি লো গেল বছর একটি তদন্তের নেতৃত্ব দেন, যা যুক্তরাজ্যের অন্তত ৮৫টি এলাকায় ‘শিশু যৌন নিপীড়ক চক্রকে’ চিহ্নিত করে।
গত বছরের অগাস্টে তদন্তের বরাতে লো এক বিবৃতিতে বলেন, মূলত পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত পুরুষদের নিয়ে গঠিত এই ‘ধর্ষণ চক্রগুলো’ কয়েক দশক ধরে সক্রিয় রয়েছে এবং এটি ‘ধারণার চেয়েও বেশি বিস্তৃত।’
বিবৃতিতে বলা হয়, "প্রধানত পাকিস্তানি পুরুষদের এই অপরাধের ধরন এবং এর সঙ্গে সরকারি সংস্থাগুলোর চরম গাফিলতি স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করা গেছে।"
এতে কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে নিপীড়নের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হওয়ার অভিযোগও আনা হয়।
যুক্তরাজ্যে গ্রুমিং গ্যাং-এর ইতিহাস
আমেরিকান প্রকাশনা 'দ্য ফ্রি প্রেসের' মতে, এক দশকের বেশি সময় আগে ইয়র্কশায়ারের অনুন্নত শহর রদারহ্যামের একটি কেলেঙ্কারি প্রথম জনসাধারণের নজরে আসে।
সেখানে ২০০১ সালের দিকে তরুণ শ্বেতাঙ্গ মেয়েদের সুপরিকল্পিত ‘গ্রুমিং’ বা ফাঁদে ফেলা হত।
পরবর্তী সময়ে রচডেল, অক্সফোর্ড, টেলফোর্ড এবং ব্রিস্টলসহ যুক্তরাজ্যের প্রায় ৫০টি শহরে একই ধরণের অপরাধের পুনরাবৃত্তি দেখা যায়।
এ ধরনের ঘটনায় যেসব মামলা হয়, সেগুলোতে সাজা হতে প্রায় এক দশক লেগে যায়।
২০১০ সালে পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত পাঁচ পুরুষকে শিশু নির্যাতনের দায়ে কারাগারে পাঠানো হয়।
অধ্যাপক অ্যালেক্সিস জয়ের করা ২০১৪ সালের প্রতিবেদন অনুসারে, ১৯৯৭ থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে ১৬ বছরে শুধু রদারহ্যামেই ১ হাজার ৪০০ জনের বেশি শিশু যৌন নিপীড়নের শিকার হয়।
এই অধ্যাপকের সবশেষ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০২৩ সালে যুক্তরাজ্যে ১ লাখ ১৫ হাজারের বেশি শিশু যৌন নির্যাতনের অভিযোগ নথিভুক্ত হয়েছে।
এরমধ্যে ৪ হাজার ২২৮টি বা ৩ দশমিক ৭ শতাংশ অভিযোগ ছিল দল বা চক্রের বিরুদ্ধে।
অধ্যাপক অ্যালেক্সিস জয় এই প্রতিবেদন তৈরি করেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ঋষি সুনাকের গঠন করা টাস্কফোর্সের অংশ হিসেবে। গ্রুমিং গ্যাংগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে এই টাস্কফোর্স গঠন করেছিলেন তিনি।
এটি টাস্কফোর্স গঠনের প্রথম বছরেই ৫৫০ জনেরও বেশি সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
প্রতিবেদনে দেখা গেছে যে, এসব অপরাধের ২৬ শতাংশ ঘটেছে পরিবারের ভেতরে। ১৭ শতাংশ ক্ষেত্রে ‘গ্রুমিং গ্যাং’ বা বিভিন্ন চক্র জড়িত ছিল।
দলগত অপরাধগুলোর মধ্যে ৯ শতাংশ স্কুল, ধর্মীয় উপাসনালয়, কমিউনিটি সেন্টার এবং এই জাতীয় অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে ঘটেছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
এছাড়া ২০২৪ সালে বৃহত্তর ম্যানচেস্টারের মেয়র অ্যান্ডি বার্নহ্যামের নির্দেশে একটি স্বাধীন পর্যালোচনা কমিশন গঠন করা হয়।
তারাও ২০০৪ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত রচডেলে শিশুদের ওপর ব্যাপক যৌন নিপীড়ন চালানোর প্রমাণ পায়।