Published : 27 Mar 2026, 10:05 PM
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধের প্রতিক্রিয়ায় ইরান বর্তমানে হরমুজ প্রণালিতে কার্যত যে অবরোধ আরোপ করেছে, তা গত কয়েক দশকের মধ্যে ভয়াবহতম জ্বালানি সংকট তৈরি করেছে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়ে বলছেন, এর ফলে বিশ্ব অর্থনীতি এক আসন্ন মন্দার দিকে ধাবিত হচ্ছে। বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাস সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ যে সমুদ্রপথ দিয়ে পার হয়, সেই পথটি এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।
কারণ, চলমান যুদ্ধে এই সমুদ্রপথকে ভূ-রাজনৈতিক দরকষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে ইরান। বর্তমানে এই সরু জলপথের আশেপাশে প্রায় ২,০০০ জাহাজ আটকা পড়ে আছে, যা ইরানের উত্তর পাশে এবং ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের দক্ষিণ পাশের মাঝে অবস্থিত।
বৃহস্পতিবার ইরানের সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে যে, বিশ্বের এই একক গুরুত্বপূর্ণ তেলপথ দিয়ে যাতায়াতকারী জাহাজগুলোর কাছ থেকে টোল বা শুল্ক আদায়ের জন্য দেশটির পার্লামেন্ট একটি আইন পাসের চেষ্টা করছে।
ইরানের তসনিম এবং ফার্স নিউজ এজেন্সির প্রতিবেদন অনুযায়ী, পার্লামেন্টের সিভিল অ্যাফেয়ার্স কমিটির চেয়ারম্যানকে উদ্ধৃত করে জানানো হয়েছে যে একটি খসড়া আইন তৈরি করা হয়েছে এবং শিগগিরই তা ইসলামিক কনসালটেটিভ অ্যাসেম্বলির লিগ্যাল টিমের মাধ্যমে চূড়ান্ত করা হবে।
একজন কর্মকর্তাকে উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, “এই পরিকল্পনা অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালি দিয়ে পার হওয়া জাহাজগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য ইরানকে অবশ্যই ফি বা শুল্ক আদায় করতে হবে।”
তিনি আরও বলেন, “এটি খুবই স্বাভাবিক। অন্যান্য করিডোর বা স্থলপথের মতোই যখন পণ্য একটি দেশের মধ্য দিয়ে যায়, তখন শুল্ক দিতে হয়। হরমুজ প্রণালিও একটি করিডোর। আমরা এর নিরাপত্তা নিশ্চিত করছি, এবং জাহাজ ও ট্যাঙ্কারগুলো আমাদের শুল্ক প্রদান করবে এটাই স্বাভাবিক।”
তবে এই অভ্যন্তরীন আইনি কাঠামো চূড়ান্ত হওয়ার আগেই ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) ইতিমধ্যেই সেখানে জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণের জন্য একটি ‘টোল বুথ’ ব্যবস্থা চালু করেছে বলে বুধবার নামী শিপিং জার্নাল ‘লয়েডস লিস্ট’ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।
কেন ইরান টোল আদায়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছে?
ইরান, যার আঞ্চলিক জলসীমা এই প্রণালি পর্যন্ত বিস্তৃত, তারা গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার পর থেকেই উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে বিশ্বের বাকি অংশে তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) বহনকারী জাহাজের পথ বন্ধ করে দিয়েছে।
এই পদক্ষেপ বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলারের উপরে নিয়ে গেছে, যা যুদ্ধের আগের তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ বেশি। এর ফলে বিশেষ করে এশিয়ার দেশগুলো জ্বালানি রেশনিং করতে এবং শিল্প উৎপাদন কমাতে বাধ্য হচ্ছে।
ভুক্তভোগী দেশগুলো জাহাজ পারাপারের অনুমতি পেতে ইরানের কাছে তদবির চালিয়ে যাচ্ছে। কারণ, অধিকাংশ উপসাগরীয় তেল উৎপাদনকারী দেশের জন্য এটিই একমাত্র রপ্তানি পথ।
ইরান যুদ্ধ বন্ধের জন্য যে পাঁচটি শর্ত দিয়েছে, তার মধ্যে অন্যতম একটি হল, হরমুজ প্রণালির ওপর তাদের কর্তৃত্বের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি।
গত রোববার ইরানি আইনপ্রণেতা আলাউদ্দিন বোরোজের্দি যুক্তরাজ্য-ভিত্তিক ফার্সি ভাষার স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেল ‘ইরান ইন্টারন্যাশনাল’-কে বলেন, দেশটি ইতিমধ্যে কিছু জাহাজের কাছ থেকে ২০ লাখ ডলার (২ মিলিয়ন ডলার) পর্যন্ত ফি আদায় করছে।
তিনি বলেন, “এখন যেহেতু যুদ্ধের ব্যয় আছে, স্বাভাবিকভাবেই আমাদের এটি করতে হবে এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাতায়াতকারী জাহাজগুলো থেকে ট্রানজিট ফি নিতে হবে।”
কতগুলো জাহাজ পার হওয়ার অপেক্ষায় আছে?
আন্তর্জাতিক মেরিটাইম অর্গানাইজেশনের (আইএমও) মহাসচিব আর্সেনিও ডোমিঙ্গুয়েজ সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরাকে জানিয়েছেন যে, প্রণালির দুই পাশে প্রায় ২,০০০ জাহাজ পার হওয়ার অপেক্ষায় সাগরে ভাসছে।
মেরিটাইম ইন্টেলিজেন্স সার্ভিস ‘উইন্ডওয়ার্ড’ জানিয়েছে, এই দীর্ঘ সারি ইঙ্গিত দেয় যে “অনেক অপারেটর তাৎক্ষণিকভাবে দীর্ঘ বিকল্প পথ বেছে না নিয়ে বরং হরমুজের বাইরে অবস্থান করাটাই বেছে নিয়েছে।”
গত ১৫ মার্চ থেকে রোববার পর্যন্ত মাত্র ১৬টি জাহাজকে তাদের অটোমেটিক আইডেন্টিফিকেশন সিস্টেম (এআইএস) সচল রেখে হরমুজ প্রণালি পার হতে দেখা গেছে।
উইন্ডওয়ার্ড আলাদাভাবে নিশ্চিত করেছে যে, ১৩ মার্চ রাত থেকে পরদিন ভোর পর্যন্ত চারটি মালবাহী জাহাজ প্রণালি পার হয়েছে বা হচ্ছে, যার মধ্যে একটি পাকিস্তানি জাহাজও ছিল।
উইন্ডওয়ার্ড আরও লক্ষ্য করেছে যে, অন্তত আটটি বিশাল ‘ডার্ক শিপ’ বা ছায়া জাহাজ (যাদের দৈর্ঘ্য ২৯০ মিটারেরও বেশি) তাদের এআইএস বন্ধ রেখে প্রণালিতে চলাচল করছে।
এই ছায়া জাহাজগুলোর মধ্যে একটি মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রাপ্ত জাহাজও ছিল, যা ১৬ মার্চ সংযুক্ত আরব আমিরাতের খোর ফাক্কান বন্দরের কাছে দেখা যায় এবং পরে সেটি তার এআইএস বন্ধ করে দেয়। খোর ফাক্কান তেল ট্যাঙ্কারগুলোর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।
টোল আদায়ের প্রক্রিয়াটি কী?
যদিও ইরানি পার্লামেন্ট এখনও টোল সংক্রান্ত আইন পাস করেনি, ‘লয়েডস লিস্ট’ বুধবার জানিয়েছে যে, গত দুই সপ্তাহে “প্রণালি দিয়ে যাতায়াতকারী ২৬টি জাহাজ আইআরজিসি-র ‘টোল বুথ’ ব্যবস্থার অধীনে একটি পূর্ব-অনুমোদিত রুট অনুসরণ করেছে, যার জন্য জাহাজ অপারেটরদের একটি যাচাইকরণ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে।”
এই জাহাজগুলো চলাচলের সময় তাদের এআইএস সচল রাখেনি। নতুন এই ব্যবস্থার সঙ্গে পরিচিত সূত্রগুলো লয়েডস লিস্টকে জানিয়েছে, প্রণালি পার হওয়ার জন্য জাহাজ অপারেটরদেরকে প্রথমে ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)-এর সঙ্গে যুক্ত মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হয় এবং জাহাজের সব বিস্তারিত তথ্য জমা দিতে হয়।
এর মধ্যে রয়েছে নথিপত্র, আইএমও নম্বর, কী পণ্য বহন করা হচ্ছে, ক্রুদের নাম এবং জাহাজের গন্তব্যস্থল। এই মধ্যস্থতাকারীরা তখন তথ্যগুলো আইআরজিসি-র নৌ কমান্ডের কাছে জমা দেয়, যারা তথ্যগুলো যাচাই করে।
যদি জাহাজটি এই স্ক্রিনিংয়ে উত্তীর্ণ হয়, তবে আইআরজিসি একটি ক্লিয়ারেন্স কোড এবং কোন রুট দিয়ে জাহাজটি যাবে তার নির্দেশনা দেয়। একবার জাহাজটি প্রণালিতে প্রবেশ করলে আইআরজিসি কমান্ডাররা ভিএইচএফ রেডিওর মাধ্যমে উচ্চস্বরে জাহাজের ক্লিয়ারেন্স কোড জানতে চান।
জাহাজটি উত্তর দেয় এবং অনুমতি পেলে ইরানের একটি বোট এসে জাহাজটিকে লারাক দ্বীপের আশেপাশে তাদের আঞ্চলিক জলসীমা দিয়ে পাহারা দিয়ে পার করে দেয়। আর যদি কোনও জাহাজ আইআরজিসি-র স্ক্রিনিং টেস্টে উত্তীর্ণ না হয়, তবে তাদের প্রবেশাধিকার দেওয়া হয় না।
গত মঙ্গলবার আইআরজিসি নৌবাহিনীর কমান্ডার আলিরেজা তাংসিরি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ একটি পোস্টে জানিয়েছিলেন যে, ‘সেলেন’ নামে একটি কনটেইনার জাহাজকে “আইনি প্রোটোকল না মানা এবং অনুমতি না থাকার কারণে” হরমুজ প্রণালি থেকে ফেরত পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেছিলেন, “এই জলপথ দিয়ে যে কোনো জাহাজ পারাপারের জন্য ইরানের মেরিটাইম অথরিটির সাথ পূর্ণ সমন্বয় প্রয়োজন।”
ইসরায়েল বৃহস্পতিবার দাবি করেছে যে, তারা বুধবার রাতে এক বিমান হামলায় তাংসিরিসহ নৌ-কমান্ডের “উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের” হত্যা করেছে। ইরান অবশ্য এ বিষয়ে এখনও কোনও মন্তব্য করেনি।
কারা এই টোল পরিশোধ করছে?
ইরান বলেছে যে যুক্তরাষ্ট্র এবং তার মিত্র দেশগুলো বাদে বাকি সবার জন্য হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত। গত মঙ্গলবার আইএমও-র ১৭৬টি সদস্য দেশের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে ইরান জানায়: “মিত্র ভাবাপন্ন জাহাজগুলো, যার মধ্যে অন্য রাষ্ট্রগুলোর মালিকানাধীন বা সংশ্লিষ্ট জাহাজও রয়েছে, তারা যদি ইরানের বিরুদ্ধে আগ্রাসনে অংশ না নেয় বা সমর্থন না দেয়
“এবং ঘোষিত নিরাপত্তা বিধিগুলো পূর্ণাঙ্গভাবে মেনে চলে, তাহলে তারা সংশ্লিষ্ট ইরানি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে হরমুজ প্রণালি দিয়ে নিরাপদ যাতায়াতের সুবিধা ভোগ করতে পারবে।”
শিপিং জার্নাল ‘লয়েডস লিস্ট’ এর তথ্যমতে, এ পর্যন্ত মালয়েশিয়া, চীন, মিশর, দক্ষিণ কোরিয়া এবং ভারতের কিছু জাহাজকে হরমুজ প্রণালি পার হওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
অন্তত দুটি জাহাজ চীনের মুদ্রা ‘ইউয়ান’-এ টোল পরিশোধ করেছে। লয়েডস লিস্ট সোমবার জানায় যে, একটি “পারাপারের মধ্যস্থতা করেছে একটি চীনা মেরিটাইম সার্ভিস কোম্পানি, যারা ইরানি কর্তৃপক্ষের কাছে পেমেন্টটিও হ্যান্ডেল করেছে।”
তবে জাহাজগুলো ঠিক কত অর্থ দিয়েছে তা স্পষ্ট নয়। অন্যদিকে, ভারত সরকার দাবি করেছে যে, তাদের পক্ষ থেকে ইরানকে কোনও অর্থ দেওয়া হয়নি।
ভারতের বন্দর ও নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের বিশেষ সচিব রাজেশ কুমার সিনহা মঙ্গলবার ভারতীয় সংবাদমাধ্যমকে বলেন, “প্রণালি দিয়ে চলাচলের জন্য কোনও অনুমতির প্রয়োজন নেই।
সেখানে চলাচলের স্বাধীনতা রয়েছে। যেহেতু প্রণালিটি সরু, তাই শুধু প্রবেশ এবং বের হওয়ার পথগুলো চিহ্নিত করা থাকে যা শিপিং লাইনগুলোকে মেনে চলতে হয়। এটি চার্টারার এবং শিপিং কোম্পানির সিদ্ধান্ত যে তারা কখন চলবে বা চলবে না।”
ভারতের মন্ত্রণালয় আরও জানায়, দুটি জাহাজ (যাতে ৯২,৬০০ টনের বেশি এলপিজি রয়েছে) ইতিমধ্যে প্রণালি পার হয়েছে এবং বৃহস্পতিবার থেকে শনিবারের মধ্যে উপদ্বীপে পৌঁছানোর কথা রয়েছে।
ভারতীয় আইন সংস্থা এএনবি লিগ্যাল-এর পার্টনার অপূর্ব মেহতা সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরাকে বলেন যে, নির্দিষ্ট কিছু বন্ধু রাষ্ট্রকে অনুমতি দেওয়া বৈষম্যমূলক হতে পারে।
তিনি আরও বলেন, “আগামী দিনগুলোতে ঠিক কোন জাহাজগুলোকে টোল দিতে হবে এবং কোন মুদ্রায় সেই পেমেন্ট হবে তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে মনে হচ্ছে এ ধরনের টোল দেওয়ার বৈধতার চেয়ে বাণিজ্যিক প্রয়োজনীয়তাই বড় হয়ে দাঁড়াবে এবং দেশগুলো পণ্য ছাড় করার জন্য টোল দিতেও আগ্রহী হবে।”
টোল আদায় কি আইনত বৈধ?
জাতিসংঘের সমুদ্র আইন বিষয়ক কনভেনশন (ইউএনসিএলওএস)-এর ৩৮ নম্বর ধারা অনুযায়ী, সব জাহাজ এবং বিমানের ‘ট্রানজিট প্যাসেজ’ (অতিক্রমণ পথ) পাড়ির অধিকার রয়েছে, যা কোনও দেশ স্থগিত করতে পারে না।
ভারতীয় আইন সংস্থা এএনবি লিগ্যাল-এর পার্টনার অপূর্ব মেহতা বলেন, কনভেনশনের ১৭ নম্বর ধারা অনুযায়ী, যে কোনও বিদেশি জাহাজের অন্য দেশের আঞ্চলিক জলসীমায় ‘ইনোসেন্ট প্যাসেজ’ (নির্দোষ অতিক্রমণপথ) পার হওয়ার অধিকার আছে।
তিনি আল-জাজিরাকে বলেন, “ইউএনসিএলওএস-এর ১৯ নম্বর ধারা অনুযায়ী, পারাপার ততক্ষণই নির্দোষ যতক্ষণ না তা উপকূলীয় রাষ্ট্রের শান্তি, শৃঙ্খলা বা নিরাপত্তার জন্য ক্ষতিকর হয়।” মেহতা ব্যাখ্যা করেন যে, ১৩টি ক্যাটাগরিতে এই পারাপারকে ‘ক্ষতিকর’ হিসেবে গণ্য করতে পারে উপকূলীয় রাষ্ট্র।
তিনি বলেন, “যদি উপকূলীয় রাষ্ট্র মনে করে, পারাপারটি নির্দোষ নয়, তবে তারা তা প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে পারে। এর মধ্যে নির্দিষ্ট এলাকায় বিদেশি জাহাজের যাতায়াত স্থগিত করাও হতে পারে, যদি তা তাদের নিরাপত্তার জন্য অপরিহার্য হয়।”
মেহতা আরও উল্লেখ করেন যে, ইরান ইউএনসিএলওএস-এ সই করলেও তাদের পার্লামেন্ট তা এখনও অনুমোদন করেনি। তিনি বলেন, “তাই ইরান দাবি করতে পারে যে, তারা জাতিসংঘের সমুদ্র আইন বিষয়ক কনভেনশনের আন্তর্জাতিক বিধি মেনে চলতে দায়বদ্ধ নয়।”
মেরিটাইম ল-এর অধ্যাপক জেসন চুয়াহ জানিয়েছেন যে, হরমুজ প্রণালির সবচেয়ে সরু অংশটি মাত্র ২১ নটিক্যাল মাইল চওড়া। ইউএনসিএলওএস অনুযায়ী, একটি দেশ ১২ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত আঞ্চলিক জলসীমা দাবি করতে পারে।
সিটি ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের এই অধ্যাপক বলেন, “পুরো প্রণালিটিই মূলত ইরান এবং ওমানের ওভারল্যাপিং আঞ্চলিক জলসীমার মধ্যে পড়ে।” সেখানে কোনও উচ্চ সমুদ্র বা ‘হাই সি’ নেই। তিনি আল-জাজিরাকে বলেন, “তাই ইরান এই এলাকার ওপর সার্বভৌমত্ব দাবি করে।”
তবে তিনি এ বিষয়টি তুলে ধরেন যে, ১২ নটিক্যাল মাইলের বাইরে ইরানের কোনও এখতিয়ার নেই। তিনি বলেন, “তাই আপনার জাহাজ যদি ওমান উপকূল ব্যবহার করে, তবে ইরান টোল নিতে পারে না।
“কিন্তু ইরান ক্ষেপণাস্ত্র, মাইন বা ড্রোন দিয়ে যে কোনো জাহাজকে আক্রমণ করার অধিকার রাখে, সেটি ওমান বা ইরান যে পাশেই হোক না কেন।”
তিনি আরও বলেন, “তাই আপনার জাহাজকে নিরাপদ রাখতে চাইলে আপনি ইরানের পাশ দিয়ে যাওয়া এবং টোল দিয়ে নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।”
অধ্যাপক জেসন চুয়াহ আরও জানান যে, যুদ্ধের আইন এবং আত্মরক্ষার নীতি অনুযায়ী ইরান দাবি করতে পারে যে, শত্রু দেশের যুদ্ধপ্রচেষ্টায় জাহাজটি সহায়তা করছে কি না তা দেখার জন্য ‘ভিজিট অ্যান্ড সার্চ’ বা তল্লাশি করার অধিকার তাদের আছে।
এই পদ্ধতি যুদ্ধের সময় চালু থাকে, যখন শত্রু দেশের জন্য কোনও নিষিদ্ধ পণ্য বহন করা হচ্ছে কি না তা যাচাই করতে যুদ্ধজাহাজগুলো বাণিজ্যিক জাহাজ থামানোর অধিকার রাখে।
তবে অধ্যাপক চুয়াহ’র মতে, “সব বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল বন্ধ করা বা ফি আদায় করা আত্মরক্ষার সীমা ছাড়িয়ে অবৈধ অর্থনৈতিক যুদ্ধে পরিণত হতে পারে।”
ইতিহাস এবং প্রতিক্রিয়া:
যুদ্ধ চলাকালীন টোল আদায়ের ঘটনা এটিই প্রথম নয়। ২০২৪ সালের অক্টোবরে জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছিল যে, ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা তাদের উপকূল দিয়ে যাতায়াতকারী জাহাজগুলোর কাছ থেকে অবৈধ ফি আদায় করছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, “অভিযোগ ছিল, হুতিরা লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগর দিয়ে জাহাজ চলাচল করতে দেওয়ার জন্য কিছু শিপিং এজেন্সির কাছ থেকে অবৈধ ফি আদায় করছে। সূত্রমতে হুতিরা এই খাত থেকে মাসে প্রায় ১৮ কোটি ডলার আয় করেছে।” হুতি গোষ্ঠী অবশ্য এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে।
ওই সময়ে ইরান-সমর্থিত হুতিরা ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করে লোহিত সাগরে বিভিন্ন বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালাচ্ছিল। তাদের দাবি ছিল, গাজায় ইসরায়েলের গণহত্যামূলক যুদ্ধের প্রতিবাদ জানাতে তারা কেবল ইসরায়েল সংশ্লিষ্ট এবং ইসরায়েলগাতী জাহাজগুলোতেই হামলা চালাচ্ছে।
আর এখন ইরান হরমুজ প্রণালিতে যে টোল বুথ চালু করেছে সেটি এখনও আইনগতভাবে অনুমোদন পায়নি। ফলে হরমুজ প্রণালিতে ইরানের এই ব্যবস্থাকে ‘অর্থনৈতিক সন্ত্রাস’ বলে বর্ণনা করেছেন আবুধাবির জাতীয় তেল কোম্পানি অ্যাডনক-এর প্রধান নির্বাহী সুলতান আল-জাবের।
বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রে এক বক্তৃতায় আল-জাবের বলেন, “ইরান যখন হরমুজকে জিম্মি করে, তখন প্রতিটি জাতি তার মাসুল দেয় গ্যাসের পাম্পে, মুদি দোকানে এবং ওষুধের দোকানে। কোনও দেশকে এভাবে বিশ্ব অর্থনীতি অস্থিতিশীল করার সুযোগ দেওয়া যেতে পারে না। এখন না, কখনওই না।”