Published : 27 Mar 2026, 12:23 PM
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলা বাড়ার মধ্যেই তা মোকাবেলায় পারমাণবিক বোমা অর্জনের পথে তেহরানের যাওয়া উচিত হবে কিনা তা নিয়ে ইরানি কট্টরপন্থিদের মধ্যে বিতর্ক ক্রমশ জোরালো হচ্ছে।
একসময় যে প্রসঙ্গ নিয়ে কথা বলায় ব্যাপক বিধিনিষেধ ছিল এখন তা প্রতিনিয়ত প্রকাশ্যে আসছে, বলছে দেশটির ভেতরকার একাধিক সূত্র।
যুদ্ধের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল কয়েক দশকের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা থাকা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে মেরে ফেলার পর ইরানের ক্ষমতা কাঠামোতে রেভল্যুশনারি গার্ডের (আইআরজিসি) প্রভাব বেড়েছে, এতে পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ে কট্টর দৃষ্টিভঙ্গিও জোরাল হওয়ার সুযোগ পেয়েছে, ঊর্ধ্বতন দুই ইরানি সূত্র বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে এমনটাই বলেছে।
ইরান পারমাণবিক বোমা বানাতে চায়, তাদের শিগগিরই এমন অস্ত্র বানানোর সক্ষমতা রয়েছে—পশ্চিমা দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরে এ বয়ান ফেরি করে বেড়ালেও তেহরান বারবারই তা অস্বীকার করে এসেছে।
পারমাণবিক অস্ত্রবিস্তার চুক্তিতে (এনপিটি) স্বাক্ষরকারী দেশ হিসেবে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরার পাশাপাশি খামেনি যে পারমাণবিক অস্ত্রকে ‘হারাম’ ঘোষণা করেছেন তাও বলেছে তারা।
পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ে ইরানের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের কোনো পরিকল্পনা এখন পর্যন্ত দেখা যায়নি এবং তারা বোমা বানানোর সিদ্ধান্তও নেয়নি; যদিও ক্ষমতা কাঠামোর ভেতরে থাকা প্রভাবশালী অনেকে আগেও বিদ্যমান নীতি নিয়ে প্রশ্ন তুলতেন এবং তা বদলানোর দাবি জানাতেন, জানিয়েছে একটি সূত্র।
তবে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলা এবং তা তেহরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার মাঝপথে হওয়ায় এই সমীকরণ বদলেও যেতে পারে। ইরানের সমর কৌশলবিদদের এখন মনে হতেই পারে, পারমাণবিক বোমা না রাখায় কিংবা এনপিটি-তে থাকায় তাদের কোনো লাভই হয়নি।
এনপিটি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার হুমকি ইরানি কট্টরপন্থিদের দিক থেকে আগেও এসেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমগুলোতে এ কথা বারবার জায়গা পাচ্ছে; সঙ্গে থাকছে যত দ্রুত সম্ভব পারমাণবিক বোমা পাওয়ার আকুতিও। অথচ কিছুদিন আগেও প্রকাশ্যে এ বিষয় নিয়ে কথা বলায় এক ধরনের নিষেধাজ্ঞাই ছিল।
আইআরজিসি সংশ্লিষ্ট বার্তা সংস্থা তাসনিমে বৃহস্পতিবার প্রকাশিত এক নিবন্ধে বলা হয়েছে, বেসামরিক পারমাণবিক কর্মসূচিতে অটল থাকলেও ইরানের উচিত যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এনপিটি থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নেওয়া।
চলতি সপ্তাহে কট্টরপন্থি রাজনীতিক মোহাম্মদ জাভেদ লারিজানিও রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রায় একই সুরে কথা বলেছেন।
“এনপিটি স্থগিত করতে হবে। এটা আমাদের কোনো কাজে এসেছে কিনা তা পর্যালোচনায় কমিটি করা উচিত আমাদের। যদি প্রমাণিত হয় এটি কাজের আমরা আবার চুক্তিতে ফিরে যাবো, আর না হলে চুক্তি তাদের কাছে থাকুক,” বলেছেন দিনকয়েক আগেই যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলায় নিহত শীর্ষ ইরানি নিরাপত্তা কর্মকর্তা আলি লারিজানির এই ভাই।
কিছুদিন আগে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত এক অনুষ্ঠানে রক্ষণশীল রাজনৈতিক ভাষ্যকার নাসের তোরাবিকে বলতে শোনা যায়, “পারমাণবিক অস্ত্র বানানোর লক্ষ্যে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানাচ্ছে ইরানি জনগণ। হয় আমরা বানাবো, না হয় সংগ্রহ করবো।”
শাসকশ্রেণির মধ্যে ব্যক্তিগত পর্যায়ের আলোচনাতেও পারমাণবিক নীতি প্রাধান্য পাচ্ছে বলে জানিয়েছে দুটি সূত্র। এসব আলোচনায় আইআরজিসিসহ কট্টরপন্থিদের সঙ্গে রাজনৈতিক মহলে বেশ প্রভাব রাখে এমন অনেকের মতবিরোধও ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে।
পশ্চিমাদের সঙ্গে দুই দশকের বেশি সময় ধরে চলা আলোচনায় ‘কৌশল হিসেবে’ ইরানি কর্মকর্তারা অতীতেও বারবার এনপিটি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার হুমকি দিয়েছিল, যদিও কখনোই তারা সেই হুমকি কার্যকর করেনি।
এবার যে প্রকাশ্যে এ নিয়ে এত কথাবার্তা হচ্ছে, সেটাও সেই একই ধরনের কৌশল হতে পারে বলেও অনেকে মনে করছেন।
গত বছর ১২ দিনের যুদ্ধ, তার আট মাস পর যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান সংঘাতে পারমাণবিক, ব্যালিস্টিক ও অন্যান্য বৈজ্ঞানিক স্থাপনায় ধারাবাহিক হামলার মধ্যে ইরান পারমাণবিক বোমা অর্জন করতে পারবে কিনা, পারলেও কত দ্রুত, তা নিয়ে প্রশ্নও আছে তাদের।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইরানের লক্ষ্য হচ্ছে ‘চাইলেই বানিয়ে ফেলতি পারি’ এমন অবস্থানে থাকা। এতে একদিকে যেমন প্রয়োজন পড়লেই দ্রুত পারমাণবিক বোমা বানিয়ে ফেলা যাবে, অন্যদিকে অস্ত্র বানিয়ে পশ্চিমাদের চক্ষুশূলও হওয়া লাগবে না।
আইআরজিসির কমান্ডার ও ঊর্ধ্বতন অনেক কর্মকর্তাই আগে হুমকি দিয়ে বলতেন, তাদের ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের অস্তিত্ব যদি ঝুঁকিতে পড়ে তাহলে তারা সরাসরি পারমাণবিক বোমা বানানোর দিকে ঝুঁকবেন। এবারের যুদ্ধকে তারা চাইলে সেই ‘অস্তিত্বের সঙ্কট’ হিসেবে দেখতেও পারেন।
পারমাণবিক অস্ত্রে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে খামেনি তার ওই ফতোয়াটা দিয়েছিলেন ২০০০-র দশকের প্রথমভাগে। তবে কখনোই ওই ফতোয়া লিখিত আকারে জারি করা হয়নি। ২০১৯ সালে খামেনি ফের পারমাণবিক অস্ত্রে তার নারাজি পুনর্ব্যক্ত করেন।
ঊর্ধ্বতন দুই ইরানি সূত্রের একটি জানিয়েছে, খামেনি ও তার ঘনিষ্ঠ সহচর আলি লারিজানির মৃত্যুর পর কট্টরপন্থিদের সামলানো মুশকিল হয়ে পড়েছে; পারমাণবিক অস্ত্রের পক্ষে থাকা যুক্তি মোকাবেলাও দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে।
আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির মৃত্যুর পরও তার অলিখিত ফতোয়া মানার বাধ্যবাধকতা রয়ে গেছে কিনা তা স্পষ্ট নয়। তার ছেলে মুজতাবা খামেনি এখন ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা, তিনি বাবার ফতোয়া প্রত্যাহার করে নেওয়ার আগ পর্যন্ত সেটি বলবৎ থাকবে বলেই অনেকের ধারণা।
সর্বোচ্চ নেতা হওয়ার পর মুজতাবাকে এখন পর্যন্ত প্রকাশ্যে দেখা যায়নি।