Published : 23 Aug 2025, 07:33 PM
ভারতের কর্ণাটক রাজ্যের মন্দির শহর ধর্মস্থলে একাধিক খুন, ধর্ষণ ও গণকবর দেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল। সেই মামলা এবার নাটকীয় মোড় নিয়েছে। এ ঘটনায় মূল অভিযোগকারী সাবেক পরিচ্ছন্নতা কর্মীকেই শনিবার গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
অভিযোগকারীর বক্তব্য এবং তার জমা দেওয়া নথিতে অসঙ্গতি ধরা পড়ায় পুলিশ তাকে আটক করে।
ভুয়া তথ্য দেওয়া এবং মিথ্যা বলার জন্য অভিযোগকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে বিবিসি-কে শনিবার জানিয়েছেন বিশেষ তদন্তকারী দলের (সিট) নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা।
বিবিসি জানায়, জুলfইয়ের শুরুর দিকে মধ্যবয়সী ওই সাবেক পরিচ্ছন্নতাকর্মী পুলিশের কাছে অভিযোগ দায়ের করেছিলেন এবং একজন ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে তার বয়ান রেকর্ড করান।
তার পরিচয় এখন পর্যন্ত প্রকাশ করা হয়নি। তাকে জনসম্মুখেও হাজির করা হয়েছে পুরোপুরি কালো পোশাকে ঢেকে এবং মাথায় হুড ও মুখে মাস্ক পরিয়ে।
পুলিশের কাছে দেওয়া অভিযোগনামায় অভিযোগকারী বলেছিলেন, ১৯৯৫ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত তিনি মন্দিরে সাফাইয়ের কাজ করতেন। ওই সময়ে তাকে ধর্মস্থলে শত শত মৃতদেহ কবর দিতে বাধ্য করা হয়েছিল।
কবর দেওয়া লাশের মধ্যে নারী ও শিশুদের মৃতদেহও ছিল। কিছু দেহে যৌন নির্যাতনের চিহ্ন পাওয়া গিয়েছিল। অভিযোগকারী তদন্তকারীদেরকে নির্দিষ্ট একটি স্থানও দেখিয়েছিলেন, যেখানে কবর খনন করা হয়েছিল বলে অভিযোগ ছিল তার। সেই স্থান থেকে কিছু কঙ্কালও উদ্ধার হয়।
সাবেক ওই পরিচ্ছন্নতাকর্মী প্রমাণ হিসাবে মাথার খুলি নিয়ে থানায় হাজির হয়ে তার বয়ান রেকর্ড করেছিলেন। তাকে প্রাণে মেরে ফেলার হুমকি দেওয়া হয়েছিল বলে তিনি জানিয়েছিলেন এবং অপরাধবোধ থেকেই তিনি পুলিশকে সাহায্য করতে চেয়েছিলেন বলেও দাবি করেন।
অভিযোগকারী এই অপরাধের ঘটনায় কারও নাম বলেননি। তবে এর জন্য মন্দির প্রশাসন ও এর স্টাফদেরকে দায়ী করেন। তার এমন বক্তব্যের পর বিষয়টি নিয়ে ভারতে তোলপাড় সৃষ্টি হয়।
অভিযোগ ওঠে যে, মন্দিরের নির্দেশেই সেখানে মাটি চাপা দিয়ে দেহ লোপাট করা হত। মন্দির প্রশাসনের প্রধান অবশ্য এসব অভিযোগ ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দেন। তবে অভিযোগের প্রেক্ষিতে গত ১৯ জুলাই বিশেষ তদন্তকারী দল (সিট) গঠন করে কর্ণাটক রাজ্য সরকার।
ধর্মস্থল কর্ণাটকের দক্ষিণ কন্নড় জেলার একটি বিখ্যাত তীর্থস্থান এবং দীর্ঘদিন ধরে শান্তির প্রতীক হিসেবে পরিচিত। কিন্তু সেখানে এমন ভয়ংকর অপরাধের অভিযোগ এই শান্তিপূর্ণ মন্দির শহরের অন্ধকার দিক সামনে এনেছে।
২৮ জুলাই থেকে শুরু হওয়া খনন কার্যক্রমে সিট মোট ১৩টি সম্ভাব্য কবরস্থান চিহ্নিত করে, যা অভিযোগকারীর তথ্যের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়েছিল।
প্রথম পাঁচটি সাইটে দুই দিন ধরে খননের পর কোনও মানুষের অবশেষ পাওয়া যায়নি। তবে ৩১ জুলাই ষষ্ঠ সাইটে খননের সময় নেত্রাবতী নদীর স্নানঘাটের কাছে একটি জঙ্গল এলাকায় হাড়ের টুকরো উদ্ধার করা হয়।
ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা প্রাথমিকভাবে ধারণা করছেন, এই হাড়গুলি একজন পুরুষের, তবে ডিএনএ বিশ্লেষণ ও ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমে সেটি নিশ্চিত হওয়া যাবে।
ধর্মস্থলের এই মামলার আরেক অভিযোগকারী সুজাতা ভাট দাবি করেছিলেন, তার মেয়ে অনন্যা নিখোঁজ। পরে তিনি এই কথা থেকে সরে এসেছেন। বলেছেন, অনন্যা নামে তার কোনও মেয়ে ছিল না। তাকে এমন কথা বলার জন্য চাপ দেওয়া হয়েছিল।
এ ঘটনা ঘিরে রাজ্য তুমুল রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়েছে। কংগ্রেস পার্টির বিরুদ্ধে মন্দির শহরকে অপমানের অভিযোগ করেছে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। এনডিটিভি-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে কর্ণাটকের বিজেপি সভাপতি বিওয়াই বিজয়েন্দ্র এই ঘটনাকে "বড় ষড়যন্ত্র" বলে অভিযোগ করেছেন।
তিনি বলেন, পুরোটাই "হিন্দুত্ববিরোধী। এর নেপথ্যে বামপন্থি এবং কমিউনিস্টদের হাত আছে।" ওদিকে, কংগ্রেসের পালটা দাবি, বিজেপি গোটা বিষয়টি থেকে রাজনৈতিক সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করছে।
অন্যদিকে, কর্নাটকের উপমুখ্যমন্ত্রী ডি কে শিবকুমার তদন্তকে স্বাগত জানিয়ে বলেছেন, "ধর্মস্থল পরিবার নিজেই মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে বলেছে যে, তদন্ত চলছে। যে-ই ভুল করুক না কেন আমরা তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেব। আমরা কারও পক্ষে বা বিপক্ষে নই।"