ডিভাইসের র্যাম, রমের কাজ কী? পার্থক্য কোথায়?
ডিভাইসে র্যামের পরিমাণ যত বেশি হবে তত বেশি অ্যাপ ও ব্রাউজার ট্যাব খোলা রাখা সম্ভব ও গেইম চালানো সহজ হয়।
প্রযুক্তি বইয়ের পাতায় র্যাম ও রমের পার্থক্যটি সহজ মনে হলেও আধুনিক ডিজিটাল ডিভাইসে এর পেছনের প্রযুক্তিটি বেশ জটিল।
প্রযুক্তি সংবাদের সাইট এনগ্যাজেট প্রতিবেদনে লিখেছে, এরইমধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ডেটা সেন্টারের আগ্রাসী চাহিদার কারণে বিশ্ববাজারে গ্রাহকদের জন্য র্যামের দাম নজিরবিহীনভাবে আকাশচুম্বী হতে শুরু করেছে।
সহজ কথায়, ‘র্যান্ডম অ্যাক্সেস মেমোরি’ বা র্যাম হচ্ছে ডিভাইসের সেই মেমোরি যার মাধ্যমে ডিভাইস তাৎক্ষণিকভাবে কাজ করে। অন্যদিকে, ‘রিড-অনলি মেমোরি’ বা রম হচ্ছে স্থায়ী স্মৃতিকোষ।
প্রসেসর বর্তমানে যে কাজটি করছে তা সাময়িকভাবে র্যামে জমা থাকে ও বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই এসব তথ্য মুছে যায়। তবে ডিভাইসটি চালু করার জন্য প্রয়োজনীয় স্থায়ী নির্দেশনা ধরে রাখে রম, যা বিদ্যুৎ না থাকলেও অক্ষত থাকে।
তবে আধুনিক যুগে প্রায় কোনো ডিভাইসের মেমোরিই এখন আর পুরোপুরি ‘রিড-অনলি’ বা কেবল পাঠযোগ্য অবস্থায় নেই। পিসির ফার্মওয়্যার চিপ বা স্মার্টফোনের স্পেসিফিকেশনে উল্লিখিত রম সবই এখন পরিবর্তনযোগ্য হয়ে উঠেছে।
র্যাম কীভাবে কাজ করে
স্মার্টফোন বা কম্পিউটারে যে কোনো কিছু খোলার সঙ্গেই র্যামের ভূমিকা শুরু হয়। যেমন, একটি ব্রাউজার ট্যাব খোলার সঙ্গে সঙ্গে তা স্টোরেজ থেকে সরাসরি র্যামে কপি হয়, যাতে প্রসেসর মুহূর্তের মধ্যেই তা ব্যবহার করতে পারে।
বর্তমানে ‘ডি-র্যাম’ সবচেয়ে ব্যবহৃত র্যাম প্রযুক্তি, যা প্রতি সেকেন্ডে হাজার হাজার বার রিফ্রেশ হয়ে ক্ষুদ্র ক্যাপাসিটরে চার্জ হিসেবে ডেটা ধরে রাখে। বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হলে রিফ্রেশ প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে সংরক্ষিত সব তথ্য চোখের পলকে উধাও হয়ে যায়।
কম্পিউটারপ্রেমী বা কাস্টম পিসি ব্যবহারকারীদের কাছে ‘ডিডিআর-৫’ র্যাম খুবই পরিচিত একটি নাম, যা বর্তমানে ব্যয়বহুল।
অন্যদিকে, ফোন ও পাতলা ল্যাপটপে ব্যবহৃত হয় ‘এলপিডিডিআর’ র্যাম, যা প্রসেসর বা মাদারবোর্ডের সঙ্গে স্থায়ীভাবে ঝালাই করা থাকে। এর বাইরে গ্রাফিক্স কার্ডের জিপিইউ-এর চারপাশে ‘জিডিডিআর’ চিপ বসানো থাকে।
ডিভাইসে র্যামের পরিমাণ যত বেশি হবে ব্যাকগ্রাউন্ডে তত বেশি অ্যাপ ও ব্রাউজার ট্যাব খোলা রাখা সম্ভব ও ভারী গেইম চালানো সহজ হয়।
গবেষণা কোম্পানি ‘ট্রেন্ডফোর্স’-এর তথ্য অনুসারে, বছরের শুরুতেই ডি-র্যাম চিপের চুক্তিভিত্তিক দাম এক প্রান্তিকেই ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।
বিশ্বের বড় বড় প্রযুক্তি কোম্পানির মধ্যে এআই ডেটা সেন্টার গড়ে তোলার যে প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে তার ফলেই র্যামের যোগান অস্বাভাবিক হারে কমেছে।
যেমন, ওপেনএআইয়ের সঙ্গে ১০ গিগাওয়াটের শক্তিশালী এআই ডেটা সেন্টার নির্মাণের জন্য এনভিডিয়ার প্রায় ১০ হাজার কোটি ডলার বিনিয়োগ পরিকল্পনার বিষয়টি উল্লেখ করা যায়।
চুক্তিটি বাস্তবায়নে সাময়িক বিলম্ব হলেও কীভাবে এআই খাতের কারণে ভোক্তাদের জন্য প্রয়োজনীয় মেমোরি চিপের দাম সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে এটা তার স্পষ্ট প্রমাণ।
এমন পরিস্থিতিতে গত বছর অন্যতম মেমোরি চিপ নির্মাতা কোম্পানি ‘মাইক্রন’ ঘোষণা দিয়েছিল, তারা গ্রাহকদের ব্যবহৃত জনপ্রিয় প্রসাধন ব্র্যান্ড ‘ক্রুশিয়াল’-এর উৎপাদন বন্ধ করে দেবে।
এর প্রধান লক্ষ্য ছিল অধিক লাভজনক এআই ডেটা সেন্টারের চাহিদা মেটানো। এ বছরের ফেব্রুয়ারি থেকেই ব্র্যান্ডটির কার্যক্রম পুরোপুরি গুটিয়ে নেওয়া হয়।
গ্রাহকপর্যায়ে মেমোরি চিপের এই তীব্র সংকট অবশ্য নতুন নয়। এর আগে ২০১৭ সালেও চিপ সংকটের কারণে হুয়াওয়ে তাদের ‘পি১০’ মডেলের স্মার্টফোনে ইচ্ছাকৃতভাবে একই মডেলে দ্রুত ও ধীরগতির মিশ্র ফ্ল্যাশ চিপ ব্যবহার করতে বাধ্য হয়েছিল, যার ফলে ফোনগুলোর গতি কমে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছিল।
যেভাবে রম আর ‘রিড-অনলি’ রইল না
একসময় রম চিপের ডেটা সরাসরি তার সার্কিটের ভেতর স্থায়ীভাবে তৈরি করা হত। ফলে তাতে কোনো পরিবর্তন আনতে হলে নতুন সিলিকন চিপ বানানোর জন্য সরাসরি কারখানায় যেতে হত।
১৯৫৬ সালে ‘প্রোগ্রামেবল রম’ বা ‘প্রম’ আসার পর এই সীমাবদ্ধতা দূর হয়। আমেরিকান বোশ আরমা কোম্পানির প্রকৌশলী ওয়েন সিংহ চাও এ প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছেন, যাতে মার্কিন বিমানবাহিনী চিপের ভেতরের মাইক্রোস্কোপিক ফিউজ পুড়িয়ে মিসাইল গাইডেন্স কম্পিউটারে লক্ষ্যবস্তুর ডেটা লোড করতে পারে।
তবে সমস্যা ছিল একটাই, ফিউজ তো কেবল একবারই পোড়ানো যায়। ফলে প্রম-এ করা প্রতিটি লেখা বা পরিবর্তনই ছিল চিরস্থায়ী, যার মধ্যে কোনো ভুল হলে তা শুধরানোর উপায় ছিল না।
এরপর ১৯৭১ সালে ইনটেলের প্রকৌশলী ডভ ফ্রোহম্যান নিয়ে আসেন ‘ইপ্রম’। ইনটেলের অন্য একটি পণ্যের ত্রুটি নিয়ে কাজ করার সময় তিনি এই মোচনযোগ্য চিপটি উদ্ভাবন করেন।
প্রতিটি ইপ্রম চিপে একটি ছোট্ট কোয়ার্টজ জানালা থাকত, যার ভেতর দিয়ে কয়েক মিনিট অতিবেগুনি বা ইউভি আলো ফেললে চিপটি সম্পূর্ণ পরিষ্কার হয়ে নতুন করে প্রোগ্রাম করার উপযোগী হত।
পরবর্তীতে এই ঝক্কি এড়াতে ইলেকট্রনিক উপায়ে ডেটা মোছার প্রযুক্তির হাত ধরে আসে ‘ইইপ্রম’। তোশিবার প্রকৌশলী ফুজিও মাসুওকা এরপর এই ধারণাকে চূড়ান্ত রূপ দেন ও ফ্ল্যাশ মেমোরি আবিষ্কার করেন।
১৯৮৪ সালে ‘নর’ ফ্ল্যাশ ও ১৯৮৭ সালে ‘ন্যান্ড’ ফ্ল্যাশ বাজারে আসে। বর্তমানে বাজারে থাকা প্রতিটি এসএসডি, স্মার্টফোন, মেমোরি কার্ড ও ইউএসবি ড্রাইভের ভেতরে এই ন্যান্ড ফ্ল্যাশই রয়েছে।
পিসির মাদারবোর্ডে থাকা ফার্মওয়্যার চিপটিকে আজও ‘বায়োস রম’ বলা হলেও এটা আসলে একটি ছোট্ট ফ্ল্যাশ চিপ, যা ফার্মওয়্যার আপডেটের সময় নতুন করে রিরাইট বা পুনর্লিখিত হয়।
স্মার্টফোনের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটে। শাওমি রেডমি ১৩-এর স্পেসিফিকেশনে যে ‘রম’-এর কথা বলা হয় তা ‘ইউএফএস’ বা ‘ইএমএমসি’ ফ্ল্যাশ মেমোরি, যার সিস্টেম পার্টিশনগুলো কেবল পড়ার উপযোগী হিসেবে লক করা থাকে।
আলাপচারিতায় বা পুরনো গেইমের ক্ষেত্রে হয়ত খাঁটি রম চিপের দেখা পাওয়া যায়, যা পুরনো প্লাস্টিকের গেইম কার্টিজে ব্যবহৃত হত। ঠিক এ কারণেই ইম্যুলেটরের জন্য সেগুলোর ফাইলকে আজও ‘রমস’ বলা হয়ে থাকে।
কারখানায় নির্ধারিত সেই আসল বা প্রপার রম চিপ কি তবে পুরোপুরি হারিয়ে গেছে? না, একদম সাশ্রয়ী কিছু ইলেকট্রনিক ডিভাইসের গভীরের অংশে যেমন, যেসব ক্ষুদ্র মাইক্রোকন্ট্রোলারের কোড কখনোই বদলানোর প্রয়োজন হয় না, সেখানে এখনও এর দেখা মেলে।
অন্য সব জায়গাতেই র্যামের অর্থ গত ছয় দশকে অপরিবর্তিত থাকলেও রম শব্দটি এখন যে কোনো এমন মেমোরির সমার্থক হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা ব্যবহারকারীর স্পর্শ করা বারণ।
