০৪ নভেম্বর ২০২৬, ২০ কার্তিক ১৪৩৩

দায়িত্ব নিয়েই চিপ সংকটে টার্নাস, কমল অ্যাপলের মুনাফা

টিম কুকের স্থলাভিষিক্ত হয়ে দায়িত্ব নেওয়া টার্নাসকে এমন সংকটের মুখে পড়তে হচ্ছে, যা তার পূর্বসূরি কুককেও তার মেয়াদের শেষ মাসগুলোতে তীব্র ভোগান্তিতে ফেলেছিল।

দায়িত্ব নিয়েই চিপ সংকটে টার্নাস, কমল অ্যাপলের মুনাফা

সেপ্টেম্বরে আইফোনের প্রতিটি মডেলের দাম ১০০ ডলার পর্যন্ত বাড়ায় অ্যাপল, যা ইচ্ছার বিরুদ্ধে করতে হয়েছিল বলে জানান টার্নাস। ছবি: রয়টার্স

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 04 Nov 2026, 07:50 PM

Updated : 04 Nov 2026, 07:50 PM

অ্যাপলের নতুন প্রধান নির্বাহী জন টার্নাসের প্রথম আয়-ব্যয়ের হিসাব প্রকাশের বৈঠকটি বেশ ভালোভাবেই এগোচ্ছিল। বিপত্তি বাঁধল কেবল কোম্পানির সম্ভাব্য মোট মুনাফার হার সংক্রান্ত পূর্বাভাস দেওয়ার সময়।

সোমবার প্রত্যাশার চেয়েও ভালো আয় ও রাজস্বের হিসাব প্রকাশ করেছে অ্যাপল, যার পেছনে মূল চালিকাশক্তি ছিল আইফোনের শক্তিশালী বিক্রি। এ প্রান্তিকের বিক্রির পূর্বাভাসও বাজার বিশ্লেষকদের অনুমানকে ছাড়িয়ে গেছে।

তবে আর্থিক প্রতিবেদন নিয়ে বিশ্লেষকদের প্রশ্নোত্তরের ঠিক আগেই অ্যাপলের প্রধান অর্থ কর্মকর্তা কেভান পারেখ মন্দ খবরটি শোনান বলে প্রতিবেদনে লিখেছে আমেরিকান সংবাদমাধ্যম সিএনবিসি।

পারেখ বলেছেন, ছুটির মৌসুমকে ঘিরে থাকা ডিসেম্বর প্রান্তিকে অ্যাপলের মোট মুনাফার হার ৪৫ থেকে ৪৬ শতাংশের মধ্যে থাকতে পারে। বাজার বিশ্লেষকদের গড় অনুমানে যা হওয়ার কথা ছিল ৪৬.৩ শতাংশ।

Image

এ বছরের শুরুর তুলনায় এখন চিপের জন্য বেশি দাম দিতে হচ্ছে অ্যাপলকে। ছবি: রয়টার্স

মুনাফা কমে যাওয়ার কারণ ব্যাখ্যায় পারেখ বলেছেন, “উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ার পেছনে মেমোরি চিপের অস্বাভাবিক দামবৃদ্ধি ও ডিজিটাল অ্যাসিস্ট্যান্ট সিরি এআইয়ের পরিধি বাড়াতে নতুন করে যোগ হওয়া খরচ দায়ী।”

মুনাফার পূর্বাভাসের ঘাটতির প্রভাবে বাড়তি সময়ে অ্যাপলের শেয়ারের দর প্রায় ৩ শতাংশ পর্যন্ত পড়েছে। এর আগে, সোমবার লেনদেনের সময়ও কোম্পানিটির শেয়ারদর কমেছিল প্রায় ২ শতাংশ।

বিশ্বজুড়ে মেমোরি চিপ সংকটের কারণে কয়েক প্রান্তিক ধরেই উচ্চ খরচ বহন করছে অ্যাপল। এ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে মুনাফা কমে গেলে তা হবে টানা তৃতীয়বারের মতো দরপতন। জুনের প্রান্তিকে কোম্পানিটি ৫০.১ শতাংশ মুনাফা পেয়েছিল, যা সেপ্টেম্বরের প্রান্তিকে এসে দাঁড়ায় ৪৭.৯ শতাংশে। যদিও ওই প্রান্তিকে ১ শতাংশ শুল্ক রিফান্ডের সুবিধা পেয়েছে অ্যাপল।

নতুন পূর্বানুমানের মধ্যবর্তী সূচক অনুসারে, এটা ২০২৩ সালের চতুর্থ প্রান্তিকের পর অ্যাপলের সর্বনিম্নে নেমে যাওয়া মুনাফার হার হতে যাচ্ছে।

আর্থিক বিবরণী প্রকাশ সভায় সিইও জন টার্নাস বলেছেন, “মেমোরি চিপের বাজারদরে আমরা যে ঊর্ধ্বগতি দেখছি তা অকল্পনীয়।”

Image

মুনাফার হার কমলেও টিম কুকের দায়িত্ব নেওয়ার প্রাথমিক সময়ের তুলনায় অ্যাপলের মোট মুনাফার হার এখনও বেশ ভালো অবস্থানে রয়েছে। ছবি: রয়টার্স

এ বছরের শুরুর তুলনায় এখন চিপের জন্য বেশি দাম দিতে হচ্ছে অ্যাপলকে। ডিসেম্বর প্রান্তিকের পর চিপ কেনার খরচ আরও বাড়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন টার্নাস।

১ সেপ্টেম্বর টিম কুকের স্থলাভিষিক্ত হয়ে দায়িত্ব নেওয়া টার্নাসকে এমন এক সংকটের মুখোমুখি হতে হচ্ছে, যা তার পূর্বসূরি কুককেও তার মেয়াদের শেষ মাসগুলোতে তীব্র ভোগান্তিতে ফেলেছিল।

জুনে মার্কিন বাণিজ্য প্রকাশনা ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে চিপের এ সংকটকে ‘বিরল ও ভয়াবহ সংকট’ বলে উল্লেখ করেছিলেন টিম কুক।

পরবর্তীতে বাধ্য হয়ে ম্যাক, আইপ্যাডসহ অন্যান্য আনুষাঙ্গিকের দাম বাড়িয়েছিল অ্যাপল। এরপর সেপ্টেম্বরে আইফোনের প্রতিটি মডেলের দাম ১০০ ডলার পর্যন্ত বাড়ায় কোম্পানিটি, যা ইচ্ছার বিরুদ্ধে করতে হয়েছিল বলে জানান টার্নাস।

সরবরাহ শৃঙ্খলে নমনীয়তার অভাব

মেমোরি চিপের এই সংকটে কেবল অ্যাপল একা নয়, বিশ্বজুড়ে কম্পিউটার ও স্মার্টফোন নির্মাতারা চরম ভোগান্তিতে পড়েছে।

পিসি বাজারের মন্দার পূর্বাভাসের কারণে শুক্রবার পুঁজিবাজারে ১৯৭০ সালের পর সবচেয়ে বাজে দিন পার করেছে চিপ নির্মাতা কোম্পানি ইনটেল। পুরো সংকটের মূল অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের লাগামহীন চাহিদা।

এনভিডিয়ার মতো এআই সার্ভার নির্মাতা জায়ান্ট ও বড় ডেটা সেন্টার পরিচালনা করা ‘হাইপারস্কেলার’ কোম্পানিগুলো বাজারের প্রায় সব র‍্যাম চড়াদামে কিনেছে।

এর ফলে স্মার্টফোন ও ট্যাবলেট নির্মাতা কোম্পানিগুলোর জন্য মেমোরি চিপের সামান্যতম জোগান পাওয়াও কঠিন হয়ে পড়েছে।

বড় আকার ও বৈশ্বিক প্রভাবের পরও অ্যাপল বলেছে, ছুটির মৌসুমে চিপ সংকটের কারণে আইফোন ও ম্যাক সরবরাহে ঘাটতি দেখা দিতে পারে।

আর্থিক বিবরণী সভায় চিপ ও যন্ত্রাংশ সংক্রান্ত প্রশ্নের উত্তর দিতে নিজেদের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সামনে নিয়ে আসেন সিইও টার্নাস। তারই অংশ হিসেবে কোম্পানিটির প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা সাবিহ খান বিশ্লেষকদের মুখোমুখি হন।

২০১০ সালে স্টিভ জবসের সিইও থাকাকালে টিম কুকের অংশগ্রহণের পর এই প্রথম অ্যাপলের কোনো সিওও আর্থিক বিশ্লেষণ সভায় বক্তব্য দিলেন।

সভা চলাকালে সাবিহ খান বলেছেন, “আমরা আগে যেমনটা বলেছিলাম, বর্তমানে সরবরাহ শৃঙ্খলে স্বাভাবিকের চেয়ে নমনীয়তা অনেক কমেছে।”

চিপের যোগান নিশ্চিত করতে অ্যাপল তাদের কাঁচামাল কেনার লক্ষ্য একলাফে বিপুল পরিমাণে বাড়িয়েছে। জুন প্রান্তিক থেকে সেপ্টেম্বর প্রান্তিকের মধ্যে এ কেনাকাটা ৩ হাজার ৩০০ কোটি ডলার বেড়েছে।

তবে মেমোরি উৎপাদনকারীদের সঙ্গে অ্যাপল কোনো দীর্ঘমেয়াদী চুক্তি করেছে কি না সেই সংক্রান্ত প্রশ্নের জবাব এড়িয়ে গেছেন সাবিহ খান।

“আমরা সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক করতে নিরন্তর কাজ করে যাচ্ছি।”

সাম্প্রতিক সময়ে মুনাফার হার কমলেও টিম কুকের দায়িত্ব নেওয়ার প্রাথমিক সময়ের তুলনায় অ্যাপলের মোট মুনাফার হার এখনও বেশ ভালো অবস্থানে রয়েছে।

ওই সময়ে মুনাফা ৩৮ থেকে ৩৯ শতাংশের মধ্যে থাকত। পরবর্তীতে লাভজনক সার্ভিস ব্যবস্থার পরিধি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ২০২১ সালে এসে মোট মুনাফা ৪০ শতাংশ পেরিয়ে ধারাবাহিকভাবে বাড়তে থাকে।

বর্তমান এই বৈশ্বিক বাজার মন্দার মধ্যেও অ্যাপলের জন্য আশার আলো দেখছেন প্রযুক্তি ও বাজার বিশ্লেষকরা।

বাড়তি খরচের বড় একটি অংশ বহন করার সক্ষমতা অ্যাপলের থাকায়, উইন্ডোজ পিসি ও অ্যান্ড্রয়েড ফোন নির্মাতাদের বাজার হাতানোর সুযোগ রয়েছে তাদের সামনে কারণ ওইসব কোম্পানির এমন আর্থিক সুরক্ষা নেই।

বাজার গবেষণা সংস্থা ‘আইডিসি’র তথ্য উল্লেখ করে জন টার্নাসও বলেছেন, বাজার দখলের সেই প্রক্রিয়া এরইমধ্যে শুরু হয়েছে।

“আইডিসির তথ্য অনুসারে, এই প্রান্তিকে ও পুরো অর্থবছরে বিশ্বজুড়ে আমরা আমাদের বাজার পরিধি বাড়াতে পেরেছি। বিদায়ী অর্থবছরে অ্যাপল যে পরিমাণ ম্যাক বিক্রি করেছে তা ইতিহাসে সর্বোচ্চ।

“এটা আমাদের পণ্যের শ্রেষ্ঠত্ব ও চাহিদারই অনন্য প্রমাণ।”