১২ অক্টোবর ২০২৬, ২৭ আশ্বিন ১৪৩৩

দুধের চেয়েও কম নিয়ন্ত্রণ এআইতে, বললেন মাইক্রোসফট প্রেসিডেন্ট

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নিরাপত্তায় আইন, জরুরি বন্ধের ব্যবস্থা ও স্বাধীন পর্যবেক্ষক নিয়োগের দাবি জানিয়েছেন ব্র্যাড স্মিথ।

দুধের চেয়েও কম নিয়ন্ত্রণ এআইতে, বললেন মাইক্রোসফট প্রেসিডেন্ট

মাইক্রোসফটের প্রেসিডেন্ট ব্র্যাড স্মিথ। ছবি: ব্র্যাড স্মিথ, ক্রিয়েটিভ কমন্স

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 12 Oct 2026, 06:07 PM

Updated : 12 Oct 2026, 06:07 PM

দুধ ও কাপড় ধোয়ার যন্ত্রের চেয়েও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তি কম নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন মাইক্রোসফটের প্রেসিডেন্ট ব্র্যাড স্মিথ। তার মতে, এআই প্রযুক্তির নিরাপদ ব্যবহার নিশ্চিত করতে বিশ্বজুড়ে অভিন্ন নিরাপত্তাবিধি ও আইনি বাধ্যবাধকতা প্রয়োজন।

নতুন কোনো এআই পণ্য বাজারে ছাড়ার আগে স্বাধীন পর্যবেক্ষকদের অনুমোদন নেওয়া এবং এআই এজেন্ট নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিকে তা জানানোর আইনি বাধ্যবাধকতা চালুর প্রস্তাবও দিয়েছেন তিনি। এ ছাড়া কোনো এআই ব্যবস্থা অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়লে সেটি থামানো বা গতি কমানোর জন্য জরুরি ব্যবস্থা রাখার ওপর জোর দিয়েছেন স্মিথ।

বিবিসির ‘বিগ বস ইন্টারভিউ’ পডকাস্টে দেওয়া সাক্ষাৎকারে স্মিথ বলেন, “এই মুহূর্তে আপনার কাপড় ধোয়ার যন্ত্রটি এআইয়ের চেয়ে বেশি নিরাপত্তাবিধির আওতায় রয়েছে। মুদি দোকানে আপনি যে দুধের প্যাকেট দেখেন, প্রতিটি প্যাকেটের ক্ষেত্রেই নিরাপত্তাবিধি ও পরিদর্শনের ব্যবস্থা রয়েছে।”

তার এই অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের বক্তব্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ট্রাম্প মনে করেন, চীনের প্রতিদ্বন্দ্বী কোম্পানিগুলোর কাছে পিছিয়ে পড়া এড়াতে যুক্তরাষ্ট্রের এআই খাতকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ নিজেরাই করতে দেওয়া উচিত।

এআই খাতের বিশেষজ্ঞরা প্রযুক্তিটিকে মানবজাতির জন্য হুমকি বলে উদ্বেগ জানানোর পর এ খাতে আইন ও বিধিনিষেধ চালুর দাবি জোরালো হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক এআই কোম্পানি অ্যানথ্রপিক, ওপেনএআই ও গুগল ডিপমাইন্ডের প্রধানরাও এআইয়ের উন্নয়ন ধীর করার ধারণাকে সমর্থন করেছেন। তবে ট্রাম্প এ ধরনের উদ্যোগের বিরোধিতা করছেন।

স্মিথ এআইকে একই সঙ্গে একটি ‘হাতিয়ার ও অস্ত্র’ হিসেবে বর্ণনা করে বলেছেন, প্রযুক্তিটি নিয়ন্ত্রণে আনা জরুরি।

“আজই শুরু করা যাক,” বলেন তিনি।

এআই নিয়ন্ত্রণের বাইরে গেলে থামানোর ব্যবস্থা

এআই কোনোভাবে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে সেটিকে সাময়িকভাবে থামানো বা গতি কমানোর জন্য কোম্পানিগুলোর কাছে ‘ইমার্জেন্সি ব্রেক’ থাকা প্রয়োজন বলে মনে করেন স্মিথ। প্রযুক্তি খাতে এ ধরনের ব্যবস্থাকে প্রায়ই ‘কিল সুইচ’ বলা হয়।

এআইয়ের কারণে নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট কোনো ঘটনা ঘটলে কোম্পানিগুলোকে তার প্রতিবেদন তৈরি করতে হবে এবং ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের জানাতে হবে, এমন আইনি বাধ্যবাধকতারও প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি। নতুন এআই প্রযুক্তি বাজারে ছাড়ার আগে স্বাধীন সরকারি পর্যবেক্ষকদের দিয়ে তা যাচাই করানোর কথাও বলেছেন মাইক্রোসফটের প্রেসিডেন্ট।

স্মিথ বলেন, “অন্যান্য পণ্যের ক্ষেত্রে কীভাবে এসব করতে হয়, তা আমরা জানি। সেই অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে এআইয়ের ক্ষেত্রে কীভাবে এসব প্রয়োগ করা যায়, তা নিয়ে আমাদের ভাবতে হবে।”

এআইয়ের জন্য বৈশ্বিক নিরাপত্তাবিধি তৈরিতে যুক্তরাজ্য নেতৃত্ব দিতে পারে বলেও মনে করেন তিনি। সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ঋষি সুনাকের সরকারের সময় ‘এআই সেইফটি ইনস্টিটিউট’ নামে যাত্রা শুরু করা প্রতিষ্ঠানটির নাম পরে ‘এআই সিকিউরিটি ইনস্টিটিউট’ রাখা হয়।

স্মিথের ভাষায়, “প্রযুক্তি খাতের আমার পরিচিত অধিকাংশ মানুষকে যদি জিজ্ঞাসা করা হয়, এই প্রযুক্তিগত সক্ষমতায় কোন দেশ নেতৃত্ব দিচ্ছে, তাহলে তারা বলবেন, উত্তরটি খুবই সহজ। সেটি যুক্তরাজ্য। তারাই সেরা।”

‘সময় এসে গেছে’

এআই নিয়ে স্মিথের অবস্থানের সঙ্গে ট্রাম্পের দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য রয়েছে। ট্রাম্প চান, যুক্তরাষ্ট্র এআইয়ের উন্নয়নে সর্বোচ্চ গতিতে এগিয়ে যাক। তিনি বারবার বলেছেন, “যে এআইয়ে জিতবে, সেই জিতবে।”

তবে যুক্তরাজ্যের নেতৃত্বে এআই নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগকে যুক্তরাষ্ট্রের সরকার ট্রাম্পের বক্তব্যের মতো বিরোধিতার চোখে দেখবে না বলে মনে করেন স্মিথ। ইউরোপীয় ইউনিয়নের তুলনায় যুক্তরাজ্যের উদ্যোগে যুক্তরাষ্ট্র বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতে পারে বলেও তার ধারণা।

তিনি বলেন, “ওয়াশিংটন ডিসিতে মানুষ যুক্তরাজ্য ও লন্ডনকে ব্রাসেলসের মতো করে দেখে না। এটি একটি শক্তি।”

এআই এজেন্ট মানুষের নিয়ন্ত্রণ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ঘটনা এবং শক্তিশালী এআই মডেলের কারণে বিশ্বজুড়ে সাইবার নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়ার প্রসঙ্গ তুলে স্মিথ বলেন, “আমি বলব, সময় এসে গেছে।”

তিনি আরও বলেন, “আসুন, আমরা শান্তভাবে কথা বলি, হয়তো নিচু স্বরেও, কিন্তু দৃঢ়ভাবে। আর মানুষকে এক জায়গায় নিয়ে আসা শুরু করি। একটি কোম্পানি হিসেবে আমরা এমন ভূমিকা রাখতে পারব বলে আশা করি। একটি দেশ হিসেবে যুক্তরাজ্যও এমন ভূমিকা রাখতে পারবে বলে আশা করি।”

গত মাসের শেষ দিকে হোয়াইট হাউসে যুক্তরাষ্ট্রের বড় প্রযুক্তি কোম্পানি ওপেনএআই, অ্যানথ্রপিক, এনভিডিয়া, স্পেসএক্স, মেটা ও গুগলের প্রধানদের সঙ্গে বৈঠক করেন ট্রাম্প। সেখানে কোম্পানিগুলোর নির্বাহীরা একটি ‘নৈতিকভাবে বাধ্যতামূলক’ নথিতে স্বাক্ষর করেন।

নথি অনুযায়ী, কোম্পানিগুলো তাদের এআই ব্যবস্থা প্রত্যাশা অনুযায়ী কাজ করছে কি না, তা যাচাই করতে “স্বাধীন নিরীক্ষকদের” সঙ্গে কাজ করতে সম্মত হয়েছে। এআই ব্যবস্থা যাতে “অনিচ্ছাকৃত উপায়ে প্রযুক্তিগত ব্যবস্থায় অনুপ্রবেশ বা প্রবেশাধিকার অর্জন না করে”, সেটিও নিশ্চিত করার কথা রয়েছে এতে।

এই ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়েছেন স্মিথ। তিনি বলেন, মাইক্রোসফটও এতে স্বাক্ষর করতে “আগ্রহী”।

“এটি একটি ভালো পদক্ষেপ, প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ। তবে আমার মনে হয় না, এখন আর এটুকু যথেষ্ট,” বলেন তিনি।

স্বনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার চ্যালেঞ্জ তুলে ধরে স্মিথ আরও বলেন, “ভালো কোম্পানিগুলো আপনার প্রত্যাশা অনুযায়ী কাজ করবে।”

তার মতে, “যেসব কোম্পানি ততটা দায়িত্বশীল নয়, তাদের নিয়েই আপনাকে উদ্বিগ্ন হতে হবে।”