২৯ অক্টোবর ২০২৬, ১৪ কার্তিক ১৪৩৩

ওষুধ বন্ধের পরামর্শে তরুণীর মৃত্যু: চ্যাটজিপিটির বিরুদ্ধে মামলা

২০২৫ সালে তিনি সপ্তাহে গড়ে দেড় হাজারেরও বেশি বার্তা আদান প্রদান করেছেন চ্যাট্রিবিটির সঙ্গে। মা-বাবার সঙ্গেও এত কথা তিনি বলতেন না।

ওষুধ বন্ধের পরামর্শে তরুণীর মৃত্যু: চ্যাটজিপিটির বিরুদ্ধে মামলা

মামলাটি ওপেনএআইয়ের বিরুদ্ধে করা ভুল চিকিৎসাজনিত মৃত্যু বা অবহেলার মামলার তালিকায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। ছবি: রয়টার্স

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 29 Oct 2026, 06:56 PM

Updated : 29 Oct 2026, 06:56 PM

চিকিৎসকদের নিষেধ উপেক্ষা করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের পরামর্শে মৃগী রোগের ওষুধ ধীরে ধীরে বন্ধ করে দিয়েছিলেন এক সফটওয়্যার প্রকৌশলী।

শেষ পর্যন্ত এআইয়ের ওই ভুল ও বিভ্রান্তিকর পরামর্শের খেসারত দিয়ে মর্মান্তিক মৃত্যুর শিকার হয়েছেন ওই তরুণী।

এ ঘটনায় লাইসেন্স ছাড়া চিকিৎসা দেওয়ার অভিযোগে চ্যাটজিপিটির নির্মাতা কোম্পানি ওপেনএআইয়ের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন তার মা-বাবা।

নিউ ইয়র্ক টাইমস প্রতিবেদনে লিখেছে, ওই নারী নিজের খিঁচুনি রোগ বা মৃগী রোগের চিকিৎসার জরুরি ওষুধ চ্যাটজিপিটির পরামর্শে ধীরে ধীরে বন্ধ করে দিয়েছিলেন এবং বিষয়টি চিকিৎসকদের কাছ থেকেও লুকিয়েছিলেন।

বোয়েন ওয়ান (৩১) নামের ওই সফটওয়্যার প্রকৌশলীকে গেল ফেব্রুয়ারিতে তার নিজ অ্যাপার্টমেন্টে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। তার মৃত্যুর কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে ‘সাডেন আনএক্সপেক্টেড ডেথ ইন এপিলেপসি’ বা মৃগী রোগে আকস্মিক মৃত্যু।

এ ঘটনার পর তার বাবা কুন ওয়ান ও মা মেইকিন জু একই দিনে ওপেনএআইয়ের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছেন।

অ্যামাজনে সফটওয়্যার প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত বোয়েন দীর্ঘদিন ধরে মৃগী রোগে ভুগছিলেন। শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটায় তিনি চিকিৎসাজনিত ছুটিতে ছিলেন।

পরবর্তীতে অ্যামাজন তাকে ছাঁটাই করার সিদ্ধান্ত নিলে তিনি চরম দুশ্চিন্তায় পড়েন। যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান নিশ্চিত করতে নতুন চাকরির ইন্টারভিউ দেওয়ার প্রয়োজন ছিল তার।

তবে তার আশঙ্কা ছিল, মৃগী রোগের চিকিৎসায় নিয়মিত খাওয়া ওষুধ তার কথা বলার গতি ধীর করে দিচ্ছে, যা চাকরির ইন্টারভিউতে তাকে পিছিয়ে দেবে। এ উদ্বেগের কারণ থেকেই তিনি চিকিৎসককে না জানিয়ে এআইয়ের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন।

২০২৫ সালে তিনি সপ্তাহে গড়ে দেড় হাজারেরও বেশি বার্তা আদান প্রদান করেছেন চ্যাট্রিবিটির সঙ্গে। মা-বাবার সঙ্গেও এত কথা তিনি বলতেন না।

নিউ ইয়র্ক টাইমসের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মৃগী রোগ ও বাইপোলার ডিসঅর্ডারের চিকিৎসায় ব্যবহৃত ‘ল্যামোট্রিজিন’ নামের ওষুধটি কয়েক সপ্তাহের মধ্যে পুরোপুরি বন্ধ করার জন্য ওই তরুণীকে বিস্তারিত সময়সূচি তৈরি করে দেয় চ্যাটজিপিটি।

ডাক্তারদের না জানিয়ে ওষুধ কেটে অর্ধেক করার পরামর্শও দিয়েছে চ্যাটজিপিটি। আর চিকিৎসকদের সতর্কবার্তাকে স্রেফ ‘ঝুঁকি এড়ানোর চেষ্টা’ বলে বর্ণনা করেছে এআই।

বোয়েন নিজের শারীরিক জটিলতা ও মৃগী রোগের লক্ষণগুলো নিয়ে বার্তা পাঠালে চ্যাটজিপিটি বারবার তাকে আশ্বস্ত করেছে বলেও নিউ ইয়র্ক টাইমসের অনুসন্ধানে দেখা গেছে।

চ্যাটজিপিটির সঙ্গে ওষুধ বন্ধের ক্ষতিকর দিক বা উদ্বেগ নিয়ে কমপক্ষে ১৫৮ বার প্রশ্ন তুলেছিলেন বোয়েন। তবে তার নিউরোলজিস্ট বলেছেন, বোয়েনের যা শারীরিক ইতিহাস ছিল তাতে কখনই ওষুধ বন্ধের পরামর্শ দেওয়ার মতো অবস্থা ছিল না।

চিকিৎসকদের অনাকাঙ্ক্ষিত বাধা হিসেবে চিহ্নিত করা ও লাইসেন্স ছাড়াই চিকিৎসাসেবা দেওয়ার মতো গুরুতর অভিযোগ এনে ওপেনএআইয়ের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলায় বলা হয়েছে, চ্যাটজিপিটি ওই তরুণীকে তার চিকিৎসকদের নির্দেশ উপেক্ষা করতে উৎসাহিত করেছে।

এ ছাড়া, মামলায় আরও দাবি করা হয়েছে, বোয়েন চীনা ভাষায় চ্যাট করায় চ্যাটজিপিটি তার চিকিৎসা সংক্রান্ত বিভিন্ন অনুরোধ বাতিল করতে হয়ত স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেছিল না।

এ ঘটনাকে ‘হৃদয়বিদারক’ বলে বর্ণনা করেছেন ওপেনএআইয়ের একজন মুখপাত্র। তবে তাদের দাবি, মামলাটিতে চ্যাটজিপিটির একটি পুরনো সংস্করণের কথা বলা হয়েছে, যা এখন আর বাজারে চালু নেই।

বোয়েন ‘জিপিটি-ফোরও’ মডেলটি ব্যবহার করতেন। মেডিকেল এক্সামিনারদের ধারণা অনুসারে যে দিন তার মৃত্যু হয় (ফেব্রুয়ারি ১৩, ২০২৬) ঠিক তার পরদিনই ওপেনএআই ভোক্তা অ্যাপ থেকে মডেলটি সরিয়ে নেয়।

বর্তমানের কোম্পানিটির নতুন এআই মডেলগুলো কোনো পরিস্থিতিতে জরুরি সহায়তার প্রয়োজন কি না, তা শনাক্ত করতে বেশি দক্ষ বলে দাবি করেন ওই মুখপাত্র।

এর আগে, জিপিটি-ফোরও মডেলটির অতি-চাটুকারিতা বা সবকিছুতে সহজে সায় দেওয়ার প্রবণতা নিয়ে বিস্তর অভিযোগ উঠেছিল।

‘ম্যাশএবল’-এর প্রতিবেদন বলছে, চ্যাটবটটি অতিরিক্ত তোষামোদকারী ও বিরক্তিকর হয়ে ওঠায় ২০২৫ সালের এপ্রিলে এর একটি আপডেট প্রত্যাহার করে নিয়েছিলেন ওপেনএআইয়ের প্রধান নির্বাহী স্যাম অল্টম্যান।

ওই সময় ব্যবহারকারীরা সতর্ক করে বলেছিলেন, যে কোনো কথায় সম্মতি জানানো এমন চ্যাটবট মানুষের বিভ্রান্তি বা মানসিক স্বাস্থ্য সংকটকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।

বোয়েন ওয়ানের মামলাটি ওপেনএআইয়ের বিরুদ্ধে করা ভুল চিকিৎসাজনিত মৃত্যু বা অবহেলার মামলার তালিকায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এর আগে, ২০২৫ সালের অগাস্টে ১৬ বছর বয়সি অ্যাডাম রেইনের পরিবার কোম্পানিটির বিরুদ্ধে মামলা করেছিল।

ওই মামলায় অভিযোগ ছিল, চ্যাটজিপিটি রেইনের আত্মঘাতী চিন্তাভাবনাকে প্রশ্রয় দিয়েছিল।

ওই সময় আদালতে দেওয়া বিবৃতিতে ওপেনএআই দায় অস্বীকার করে ওই টিনএজারের মানসিক স্বাস্থ্য ইতিহাস ও তাদের ব্যবহারের শর্তাবলী লঙ্ঘনের বিষয়টি তুলে ধরেছিল।

এরপর সে বছরের নভেম্বরে আরও সাতটি মামলায় ওপেনএআইয়ের বিরুদ্ধে ভুল চিকিৎসায় মৃত্যু ও আত্মহত্যায় সহযোগিতার অভিযোগ আনা হয়।