০৩ নভেম্বর ২০২৬, ১৯ কার্তিক ১৪৩৩

বরফ গলার হার ৩০ বছরে ৬ গুণ, হিমবাহ রক্ষার শেষ তাগিদ

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পৃথিবীর বরফে ঢাকা অঞ্চলের গলন এমন বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছেছে যে এমনটাই সুপারিশ করেছে জাতিসংঘ।

বরফ গলার হার ৩০ বছরে ৬ গুণ, হিমবাহ রক্ষার শেষ তাগিদ

প্রাক-শিল্পায়ন যুগের তুলনায় পৃথিবী এরইমধ্যে ১.৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস উষ্ণ হয়েছে। ছবি: ম্যাগনিফিক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 03 Nov 2026, 12:51 PM

Updated : 03 Nov 2026, 12:51 PM

বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পেরলে পৃথিবীর হিমমণ্ডল বা বরফাবৃত অঞ্চলগুলোতে অপূরণীয় ক্ষতি নেমে আসবে বলে সতর্ক করেছেন বিজ্ঞানীরা।

এই ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার হিসাব এসেছে প্যারিস জলবায়ু চুক্তি থেকে, যেখানে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, শিল্প বিপ্লবের আগের যুগের তুলনায় পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা যেন কোনোভাবেই ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি না বাড়ে।

গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধির এই হার ঠেকানো না গেলে হিমালয় ও আল্পসসহ বিশ্বজুড়ে হিমবাহের সিংহভাগ গলে গিয়ে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়বে ও বিশ্বজুড়ে দেখা দেবে চরম পানিসংকট।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্থায়ী ও ব্যাপকহারে তুষার ও বরফ বিলীন হতে থাকায় ‘প্রচলিত একটি ভুল ধারণা’ ভেঙেছে।

এই ভুল ধারণাটি ছিল, প্যারিস জলবায়ু চুক্তির ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে তাপমাত্রা ২ বা ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছালেও তা হয়ত সামলানো সম্ভব। এরইমধ্যে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা ১.৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বেড়েছে।

গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন রোধ ও প্রকৃতি রক্ষায় ব্যর্থতার কারণে বিজ্ঞানীরা বলছেন, শতাব্দীর শেষ নাগাদ তাপমাত্রা বৃদ্ধি ১.৫ ডিগ্রিতে ধরে রাখার চেষ্টা করা হলেও কিছুটা সময়ের জন্য এই সীমা পেরিয়ে যাওয়া ঠেকানোর আর উপায় নেই।

ক্রায়োস্ফিয়ার বা হিমমণ্ডল বলতে পৃথিবীর যেসব অঞ্চলে পানি বরফ অবস্থায় থাকে, সেগুলোকে বোঝায়। এর মধ্যে রয়েছে হিমবাহ, বরফের স্তর, সমুদ্রের বরফ, তুষার ও পারমাফ্রস্ট। বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে এসব অঞ্চলের বরফ ও তুষার দ্রুত গলছে। এতে সূর্যের তাপ প্রতিফলিত করার পৃথিবীর ক্ষমতা কমে যাচ্ছে, যা উষ্ণতা বৃদ্ধিকে আরও ত্বরান্বিত করছে। বৈশ্বিক উষ্ণতা প্রাক্‌-শিল্প যুগের তুলনায় ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমিত রাখা এবং এই সীমা সাময়িকভাবে অতিক্রম করলেও তা যত দ্রুত সম্ভব কমিয়ে আনার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন বিজ্ঞানীরা।

এ ছাড়া, বায়ুমণ্ডল থেকে বিপুল পরিমাণ কার্বন অপসারণের তাগিদ দেওয়া হয়েছে, যাতে দীর্ঘমেয়াদি উষ্ণতা নিচে নেমে আসে, বিশেষ করে ২১৫০ সালের মধ্যে, যাতে তাপমাত্রার বৃদ্ধি ১ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে রাখা যায়।

বর্তমানে প্রচলিত নীতি অনুসারে, তাপমাত্রা বৃদ্ধি প্রায় ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছানোর উচ্চ ঝুঁকি রয়েছে। এমনটা ঘটলে ভূপৃষ্ঠের কাছাকাছি থাকা প্রায় সব ‘পারমাফ্রস্ট’ বা চিরহিমায়িত অঞ্চল গলে যাবে।

এতে করে মহাসাগরের স্বাভাবিক সঞ্চালনে ‘গুরুতর ও আকস্মিক’ বিপর্যয় ঘটতে এবং সাগরের পানি এসিডযুক্ত হয়ে পড়তে পারে। এ ছাড়া, সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, সামুদ্রিক বরফ আগের ধারণার চেয়ে ধীরে পুনরুদ্ধার হচ্ছে।

আইসিসিআই ও জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচি বা ইউএনইপি’র যৌথ উদ্যোগে ৮০ জন বিজ্ঞানীর তৈরি এ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্ব তাপমাত্রা পরবর্তীতে ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হলেও এরইমধ্যে অনেক স্থায়ী ক্ষতি হয়ে যাবে।

হিমবাহ গলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়বে, যা পর্যাপ্ত পরিমাণ পানি ও গ্রহণযোগ্য মানের পানির সহজলভ্যতাকে তীব্র হুমকির মুখে ফেলবে।

Image

১৯৯০-এর দশকের তুলনায় বর্তমানে গ্রিনল্যান্ড ও অ্যান্টার্কটিকা ঢেকে রাখা বরফের আস্তরণ প্রায় ছয় গুণ দ্রুত গতিতে গলছে। ছবি: ম্যাগনিফিক

আইসিসিআই’র হিমবাহবিদ ও এ প্রতিবেদনের প্রধান লেখক জেমস কার্কহাম বলেছেন, জলবায়ু ব্যবস্থার মধ্যে ক্রায়োস্ফিয়ার হচ্ছে ‘অন্যতম সংবেদনশীল উপাদান’, যা ধ্বংস হওয়ার প্রভাব পড়বে গোটা বিশ্বজুড়ে।

“এ বছর নেপাল-চীন সীমান্তে আমরা এ যাবৎকালের অন্যতম বড় ও প্রাণঘাতী বরফ-পাথর ধসের ঘটনা দেখেছি। এক প্রাকৃতিক দুর্যোগেই হাজার হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে ও নেপালের জিডিপির ১০ শতাংশের মতো ক্ষতি হয়েছে।

“গত পাঁচ বছরে সুইজারল্যান্ড তাদের মোট হিমবাহের ২০ শতাংশ বরফ হারিয়েছে। আর প্রতি বছরই আগামী দশকগুলোতে বিশ্বজুড়ে হাজার হাজার হিমবাহ চিরতরে বিলুপ্ত হয়ে যাবে।”

তুরস্কে জলবায়ু বিষয়ক ৩১তম বার্ষিক কপ সম্মেলনে বিশ্বনেতা ও কূটনীতিকরা একত্র হওয়ার আগেই এ প্রতিবেদন প্রকাশিত হল। এতে অ্যান্টার্কটিকা, গ্রিনল্যান্ড ও মেরু অঞ্চলের বরফ এবং হিমমণ্ডলের অতি দ্রুত ও বিপজ্জনক গলনের তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।

এতে করে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে শত কোটি মানুষ হুমকির মুখে পড়ছে এবং চিরহিমায়িত পারমাফ্রস্ট গলে বেরিয়ে আসছে নির্গত হচ্ছে বায়ুমণ্ডল-উত্তপ্তকারী আরও গ্যাস।

প্রতিবেদন অনুসারে, বৈশ্বিক উষ্ণতা দীর্ঘমেয়াদে কমিয়ে ০.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে আনা সম্ভব হলেও তাপমাত্রার প্রভাবে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলতে থাকা ক্ষয়ের কারণে হিমবাহগুলোর বর্তমান আয়তনের সর্বোচ্চ ৭০ শতাংশ রক্ষা করা সম্ভব হবে।

এদিকে, ১৯৯০-এর দশকের তুলনায় বর্তমানে গ্রিনল্যান্ড ও অ্যান্টার্কটিকা ঢেকে রাখা বরফের আস্তরণ প্রায় ছয় গুণ দ্রুত গতিতে গলছে। তাপমাত্রা সাময়িকভাবে ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নামিয়ে আনা সম্ভব হলেও বরফ ক্ষয়ের এই গতি থামবে না।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, মেরু অঞ্চলের বরফের জন্য নিরাপদ দীর্ঘমেয়াদি উষ্ণতার মাত্রা ১.০ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তারও নিচে হওয়া প্রয়োজন।

জেমস কার্কহাম বলেছেন, “তাপমাত্রা সামান্য বাড়লেও তুষার ও বরফ তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দেখায়। এই সীমা একবার ছাড়িয়ে গেলে ও চরম বিপজ্জনক ধাপ পেরলে বরফ ব্যবস্থার স্বাভাবিক রূপ ফিরে পেতে শত শত বা হাজার বছর লেগে যাবে, যা প্রায় অপ্রতিবর্তনীয়।”

Image

বর্তমান নীতি বহাল থাকলে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি ২.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছাবে। ছবি: ম্যাগনিফিক

গেল মাসে প্রকাশ পাওয়া এক প্রতিবেদনে ইউএনইপি বলেছে, প্রাক-শিল্পায়ন যুগের চেয়ে তাপমাত্রা বৃদ্ধি ১.৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমিত রাখতে হলে বিশ্বজুড়ে নির্গমন ২০৩০ সালের মধ্যে ১৮ শতাংশ ও ২০৩৫ সালের মধ্যে ৪৫ শতাংশ কমাতে হবে।

১.৫ ডিগ্রির উপরে তাপমাত্রা ধরে রাখার ‘কোনো ভালো পরিণতি নেই’ বলেও সতর্ক করেছে ইউএনইপি।

বর্তমান নীতি বহাল থাকলে বৈশ্বিক উষ্ণতা ২.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছাবে। এতে রকি পর্বতমালা, আল্পস, আইসল্যান্ড ও স্ক্যান্ডিনেভিয়ার হিমবাহগুলোয় মাত্র ১০ শতাংশের কম বরফ অবশিষ্ট থাকবে।

তবে উষ্ণতা যদি ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে রাখা যায় তবে এসব অঞ্চলের ২০ থেকে ৩৫ শতাংশ হিমবাহ রক্ষা সম্ভব।

বিশ্বের প্রায় চার ভাগের এক ভাগ মানুষের পানির মূল উৎস ‘হিন্দু কুশ হিমালয়’ অঞ্চলের ক্ষেত্রে বর্তমান নীতির কারণে কেবল ৪১ শতাংশ বরফ টিকে থাকবে। উষ্ণতা ১.৫ ডিগ্রিতে রাখতে পারলে সেখানকার ৮৩ শতাংশ বরফ রক্ষা করা যাবে।

প্রতিবেদনের সঙ্গে জড়িত নন ‘ক্লাইমেট অ্যানালিটিকস’-এর প্রধান নির্বাহী ও জলবায়ু বিজ্ঞানী বিল হেয়ার। তিনি বলেছেন, “৩০ বছর আগের চেয়ে বরফের আস্তরণ ছয় গুণ দ্রুত গলে যাওয়া, রেকর্ড গতিতে পর্বত ও সাগরের বরফ বিলীন হওয়া, সমুদ্রের উচ্চতা বেড়ে যাওয়া ও মেরু অঞ্চলের মহাসাগরগুলোর এসিডে রূপান্তরিত হওয়া এসবের পরিণতি মানবজীবনের সাপেক্ষে সম্পূর্ণ অপূরণীয়।

“জলবায়ু সুরক্ষার বিভিন্ন পদক্ষেপকে বাধাগ্রস্ত করা বা শিথিল করার পেছনে ভূমিকা রাখা প্রতিটি দেশের সরকার ও জীবাশ্ম জ্বালানি খাতের নির্বাহীরা এ প্রতিবেদন দেখে বুঝতে পারবেন, কীভাবে তাদের সিদ্ধান্ত আমাদের এই পৃথিবীর মৌলিক ও স্থায়ী ক্ষতি করেছে।”