Published : 16 Jul 2026, 10:06 AM
মানুষের সম্মতি ছাড়াই তাদের পোশাকহীন বা যৌনাবেদনময় স্পষ্ট ছবি তৈরি করার লক্ষ্যে তথাকথিত ‘ন্যুডিফাই’ অ্যাপ ও ওয়েবসাইটে ব্যবহারকারীকে পৌঁছে দেওয়ার বড় বাহনে ইউটিউব ও এক্স পরিণত হয়েছে বলে উঠে এসেছে নতুন এক গবেষণায়।
উগ্রবাদবিরোধী গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক ডায়ালগের প্রকাশিত গবেষণায় দেখা গেছে, ছোট বা কম নিয়ন্ত্রিত অনলাইন কমিউনিটির বদলে মূলধারার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকেই এসব সাইটে সবচেয়ে বেশি ব্যবহারকারী যাচ্ছে।
সোমবার প্রকাশিত গবেষণাটি নিয়ে বিজ্ঞান ও গবেষণা সংবাদের সাইট ওয়্যার্ডে প্রকাশিত এক প্রতিবেদন বলছে, এতে অনুমতি ছাড়া যৌন স্পষ্ট ডিপফেইক তৈরি করতে ব্যবহৃত শীর্ষ দশটি অ্যাপ ও ওয়েবসাইট এবং ব্যবহারকারীরা কীভাবে সেখানে পৌঁছান, তা বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ডিসেম্বর থেকে এ বছরের মার্চ পর্যন্ত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে ন্যুডিফাই সাইটগুলোতে প্রায় ৫৭ লাখের বেশি ভিজিট এসেছে। এর মধ্যে ইউটিউব একাই প্রায় ১৮ লাখ ২০ হাজার ভিজিটের জন্য দায়ী, যা মোট রেফারেলের ৩০ শতাংশেরও বেশি। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা এক্স থেকে এসেছে ১৩ লাখেরও বেশি ভিজিট।
গবেষণায় দেখা গেছে, “পোশাক খুলে দেওয়ার অ্যাপ” বা “ন্যুডিফাই অ্যাপ” ধরনের শব্দ লিখে খুঁজলে এমন ভিডিও পাওয়া যায়, যেখানে নির্দিষ্ট অ্যাপের পর্যালোচনা, প্রচার, এমনকি বিনা মূল্যে ব্যবহার করার জন্য প্রচারণামূলক কোডও দেওয়া হয়েছে।
গবেষণার লেখকদের মতে, এই ফলাফল ইউটিউবের নিজস্ব নীতিমালার সঙ্গে “সরাসরি সাংঘর্ষিক”। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, “এতে যৌন স্পষ্ট কনটেন্ট নিষিদ্ধ করা হয়েছে। যৌক্তিকভাবে এর মধ্যে অনুমতি ছাড়া যৌন স্পষ্ট ছবি তৈরি করে এমন ন্যুডিফাই ওয়েবসাইট বা সরঞ্জামও পড়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে এসব নীতিভঙ্গকারী কনটেন্ট প্ল্যাটফর্মে সহজেই খুঁজে পাওয়া ও ব্যবহার করা গেছে, যা কার্যত ইউটিউবকে ন্যুডিফাই ওয়েবসাইটের প্রবেশদ্বারে পরিণত করেছে।”
ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক ডায়ালগের গবেষণা ও নীতিবিষয়ক জ্যেষ্ঠ পরিচালক মেলানি স্মিথ বলেন, “ইউটিউব শুধু ব্যবহারকারী পাঠানোর একটি নিষ্ক্রিয় উৎস থাকেনি। অনেক ক্ষেত্রে এটি এসব সরঞ্জাম ব্যবহারে সহায়তাও করেছে।”
তিনি আরও বলেন, ইউটিউবের নীতিমালায় শুধু যৌন স্পষ্ট কনটেন্ট প্রকাশ নয়, এমন ওয়েবসাইটের লিংক দেওয়া বা বিজ্ঞাপন প্রচারও নিষিদ্ধ। “তাত্ত্বিকভাবে এর আওতায় অনুমতি ছাড়া তৈরি অন্তরঙ্গ ছবি, প্রতিশোধমূলক পর্নোগ্রাফি বা ফাঁস হওয়া নগ্ন ছবিও পড়ার কথা। কিন্তু মনে হচ্ছে, এ নিয়মগুলো সর্বত্র কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে না।”
এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাইলে ইউটিউবের মুখপাত্র বুট বুলউইঙ্কল বলেন, “অনুমতি ছাড়া যৌনায়ন করা কনটেন্ট, যেমন সম্মতি ছাড়া শেয়ার করা অন্তরঙ্গ ছবি, নিষিদ্ধ করার ক্ষেত্রে আমাদের কঠোর নীতিমালা রয়েছে।” তিনি বলেন, এই নীতিমালা ইউটিউবের নিজস্ব কনটেন্টের পাশাপাশি বাইরের লিংকের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য এবং এর মধ্যে “বাস্তবসম্মতভাবে নগ্নতা অনুকরণ করে এমন পরিবর্তিত বা কৃত্রিমভাবে তৈরি কনটেন্টও” অন্তর্ভুক্ত।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, কিছু অ্যাপ ও ওয়েবসাইটে মাত্র এক ডলার খরচেই একটি যৌন স্পষ্ট ডিপফেইক ছবি তৈরি করা যায়। খরচ কম হলেও এসব সেবা থেকে বছরে সম্মিলিতভাবে প্রায় তিন কোটি ষাট লাখ ডলার পর্যন্ত আয় হতে পারে বলে সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
গবেষণায় বলা হয়েছে, এসব অ্যাপের সাধারণ লক্ষ্য বর্তমান বা সাবেক প্রেমিকা ছাড়াও বোন, চাচাতো বা মামাতো ভাইবোনের মতো আত্মীয়রাও। গবেষকদের মতে, এসব সরঞ্জাম ব্যবহারকারীদের উদ্দেশ্য সব সময় যৌন নয়।
মেলানি স্মিথ বলেন, “অনেক অনুরোধই ছিল মানুষের চাকরি খোয়ানো, জীবিকা নষ্ট করা এবং নানা ক্ষতিকর উপায়ে তাদের জীবন বিপর্যস্ত করার উদ্দেশ্যে।”
এ বছরের জানুয়ারিতে এক্সও সমালোচনার মুখে পড়ে, যখন ব্যবহারকারীরা প্রতিষ্ঠানটির কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক চ্যাটবট গ্রক ব্যবহার করে নারীদের, এমনকি কিছু অপ্রাপ্তবয়স্কেরও, অনুমতি ছাড়া নগ্ন বা যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ ছবি তৈরি করতে শুরু করেন। পরে কোম্পানিটি এ সুবিধা কেবল অর্থপ্রদানকারী গ্রাহকদের মধ্যে সীমিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
বিবৃতিতে এক্স বলেছে, “সবাইয়ের জন্য এক্সকে নিরাপদ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে রাখতে আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। শিশুদের যৌন নিপীড়ন, অনুমতি ছাড়া নগ্নতা এবং অনাকাঙ্ক্ষিত যৌন কনটেন্টের ক্ষেত্রে আমাদের শূন্য সহনশীলতার নীতি রয়েছে।”
যুক্তরাষ্ট্রে অনুমতি ছাড়া অন্তরঙ্গ ছবি ছড়িয়ে দেওয়া বেআইনি। চলতি বছরের মে মাস থেকে পুরোপুরি কার্যকর হওয়া ‘টেইক ইট ডাউন’ আইনের আওতায়, কোনো ভুক্তভোগী ছবি অপসারণের আবেদন করলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে আটচল্লিশ ঘণ্টার মধ্যে সেই ছবি সরাতে হবে। এ ছাড়া বেশির ভাগ অঙ্গরাজ্য ডিপফেইকবিরোধী আইন করেছে এবং গত মে মাসে মিনেসোটা ন্যুডিফাই অ্যাপ নিষিদ্ধ করা প্রথম অঙ্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে।
তবু গবেষণায় বলা হয়েছে, এসব অ্যাপের বিস্তার থামছে না, বরং সেগুলো আরও সহজলভ্য ও ব্যবহারবান্ধব হয়ে উঠছে। তাই গবেষকেরা অনলাইন ও অফলাইনে সমন্বিত নীতিগত পদক্ষেপ, প্ল্যাটফর্মের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ এবং স্কুলে ডিজিটাল সচেতনতা কর্মসূচিতে বিনিয়োগ বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন।