Published : 16 Jul 2026, 04:07 PM
মধ্যরাতের পর ১৬ ও ১৭ বছর বয়সী কিশোরদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে নতুন ধরনের কারফিউ চালুর প্রস্তাব বিবেচনা করছে যুক্তরাজ্য সরকার।
প্রস্তাব অনুযায়ী, রাত বারোটা থেকে সকাল ছয়টা পর্যন্ত ইনস্টাগ্রাম, টিকটক ও ইউটিউবের মতো প্ল্যাটফর্মগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে অচল থাকবে। তবে অ্যাকাউন্টের সেটিং পরিবর্তন করে ব্যবহারকারীরা চাইলে এই সীমাবদ্ধতা বন্ধও করতে পারবে।
প্রস্তাবিত এ কারফিউয়ের পাশাপাশি স্বয়ংক্রিয় ভিডিও চালু হওয়া এবং অন্তহীন স্ক্রলিংয়ের মতো আসক্তি তৈরি করতে পারে এমন ফিচারও সরকার ডিফল্টভাবে বন্ধ রাখার পরিকল্পনা করেছে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে বিবিসি। তাদের দাবি, এসব পদক্ষেপ কিশোরদের মনোযোগ, ঘুমের মান এবং পারিবারিক সম্পর্ক উন্নত করতে সহায়ক হবে।
এর আগে জুন মাসে সরকার ঘোষণা দিয়েছে, ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য বেশ কয়েকটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা হবে। নতুন প্রস্তাব সেই পরিকল্পনারই পরবর্তী ধাপ।
যুক্তরাজ্যের প্রযুক্তিমন্ত্রী লিজ কেনডাল বলেন, “এই পদক্ষেপগুলো তরুণদের প্রয়োজনীয় ঘুম নিশ্চিত করতে, স্কুল ও কলেজে মনোযোগ ধরে রাখতে এবং পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে আরও মানসম্মত সময় কাটাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এগুলো সুখী, সুস্থ ও পরিপূর্ণ প্রাপ্তবয়স্ক জীবন গড়ে তোলার ভিত্তি।”
তিনি আরও বলেন, “আমরা চাই তরুণরা প্রযুক্তির সুবিধা উপভোগ করুক, একই সঙ্গে এমন রিসোর্সও পাক যাতে অনলাইন জগৎ তাদের বিকাশের উপযোগী হয়ে ওঠে।”
তবে প্রস্তাবটি নিয়ে সমালোচনাও শুরু হয়েছে। বিরোধী কনজারভেটিভ দলের ছায়া শিক্ষামন্ত্রী লরা ট্রট একে ‘এলোমেলো পরিকল্পনা’ বলে মন্তব্য করেন।
তার ভাষায়, “সরকার যদি মনে করে ১৬ ও ১৭ বছর বয়সীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করবে, তাহলে করবে। আর যদি না করে, তাহলে করবে না। কিন্তু এমন কারফিউ, যা তারা সহজেই বন্ধ করে দিতে পারে, তাতে কোনো বাস্তব ফল আসবে না।”
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক চ্যাটবট শিশুদের জন্য নিরাপদ করতে নতুন ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও সরকার বলেছে। এর অংশ হিসেবে ১৮ বছরের কম বয়সীদের জন্য নিয়মিত বিরতির ব্যবস্থা রাখতে সেবাদাতাদের বাধ্য করার পরিকল্পনা রয়েছে।
সরকারের লক্ষ্য, এ বছরের শেষ নাগাদ প্রস্তাবগুলো পার্লামেন্টে উপস্থাপন করা এবং আগামী বছরের শুরুতে ১৬ বছরের কম বয়সীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষেধাজ্ঞার সঙ্গে এগুলো কার্যকর করা।
তবে শিশু নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংগঠন ও বিশেষজ্ঞরা মধ্যরাতের কারফিউর কার্যকারিতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন।
মলি রোজ ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী অ্যান্ডি বারোজ বলেন, “কিশোরদের জন্য এই পদক্ষেপকে আমরা স্বাগত জানাই। কিন্তু এটি আবারও খণ্ডিত কিছু ঘোষণা, শিশুদের নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজনীয় পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা নয়।”
তিনি আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার “পরিকল্পনা ছাড়াই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করে দায়িত্ব ছাড়ছেন”, আর সম্ভাব্য উত্তরসূরি অ্যান্ডি বার্নহ্যাম “হারিয়ে যাওয়া অনেক সুযোগের উত্তরাধিকার” পাবেন।
লন্ডন স্কুল অফ ইকোনমিক্সের ‘শিশুদের ডিজিটাল অধিকার’ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক সোনিয়া লিভিংস্টোনের মতে, এই কারফিউ ঝুঁকিতে থাকা কিছু শিশুর জন্য ক্ষতিকরও হতে পারে।
তিনি বলেন, “যদি এটি এমন কারফিউ হয়, যাতে কোম্পানিগুলো রাতের বেলায় বারবার নোটিফিকেশন পাঠিয়ে কাউকে জাগিয়ে রাখতে না পারে, তাহলে অবশ্যই কারফিউ থাকা উচিত।”
তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, “যদি এমন হয় যে সাহায্য, সমর্থন বা সান্ত্বনার প্রয়োজন থাকা কোনো শিশু গভীর রাতে বিশ্বস্ত কারও সঙ্গে যোগাযোগই করতে পারল না, তাহলে সেটি বেশ ক্ষতিকর হতে পারে।”
ইংল্যান্ডের শিশু কমিশনার র্যাচেল ডি সুজা বলেন, “আমাদের তরুণদের কথা শুনতে হবে। তারা নিষেধাজ্ঞা চায় না, তবে আসক্তিকর অন্তহীন স্ক্রলিং থেকে সুরক্ষা চায়।”
তিনি আরও বলেন, “কারফিউয়ের মতো নীতিগুলো কীভাবে বাস্তবায়ন হবে, সে বিষয়ে আরও জানতে চাই। একই সঙ্গে অনলাইন বিশ্বকে শিশুদের জন্য আরও নিরাপদ করতে অফকম যেন তার সব ক্ষমতা ব্যবহার করে, সেটিও নিশ্চিত করতে চাই।”
সরকার এই পরিকল্পনা তৈরির আগে যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন পরিবারের অংশগ্রহণে একটি পরীক্ষামূলক কর্মসূচি চালিয়েছে। এতে তিনশ কিশোরকে তিনটি ভিন্ন দলে ভাগ করা হয়। কারও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পুরোপুরি বন্ধ রাখা হয়, কারও ক্ষেত্রে রাত নয়টা থেকে সকাল সাতটা পর্যন্ত বন্ধ রাখা হয়, আবার কারও দৈনিক ব্যবহার এক ঘণ্টায় সীমিত করা হয়। তুলনার জন্য একটি দলকে কোনো পরিবর্তন ছাড়াই রাখা হয়েছিল।
মঙ্গলবার প্রকাশিত সরকারি প্রতিবেদনে দেখা গেছে, রাতের কারফিউ চালু থাকা দল সবচেয়ে ভালো ঘুমের সুবিধা পেয়েছে। পাশাপাশি পরিবারের সদস্যদের মধ্যে আরও বেশি কথোপকথন ও সময় কাটানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে। অভিভাবকদের জন্যও এটি সবচেয়ে সহজে বাস্তবায়নযোগ্য ব্যবস্থা ছিল।
এই ফলাফলের প্রসঙ্গে লিজ কেনডাল বলেন, “এই গবেষণা দেখিয়েছে, অভিভাবকরা এত দিন যা বলে আসছিলেন, সেটিই সত্য। শিশুরা যখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কম সময় কাটায়, তখন তার ইতিবাচক সুফল বাস্তবেই দেখা যায়।”
তবে যোগাযোগ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক পিট এচেলস বলেন, এই গবেষণার ওপর অতিরিক্ত নির্ভর করা উচিত হবে না।
তার ভাষায়, “এটি ছোট পরিসরের একটি গবেষণা। প্রযুক্তি ব্যবহারে বিধিনিষেধের সঙ্গে শিশু ও অভিভাবকরা বাস্তবে কীভাবে খাপ খাইয়ে নেবেন, তা বোঝার বেলায় বৃহত্তর চিত্রের মাত্র একটি অংশ।”
অস্ট্রেলিয়ায় ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধ করার পর যুক্তরাজ্যও একই পথে হাঁটছে। তবে অস্ট্রেলিয়ায় অনেক কিশোর নিষিদ্ধ প্ল্যাটফর্মেও প্রবেশ করতে পারছে বলে সমালোচনা রয়েছে। ফলে বয়স যাচাইয়ের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
ভার্চুয়াল প্রাইভেট নেটওয়ার্ক ব্যবহারের মাধ্যমে বয়স যাচাই এড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কাও আলোচনায় ছিল। তবে সরকার বলেছে, তাদের কমিশন করা গবেষণায় এমন প্রমাণ খুব কমই মিলেছে যে শিশুরা ব্যাপকভাবে এই পদ্ধতি ব্যবহার করছে।