Published : 23 Jun 2026, 05:20 PM
ট্রিলিয়ন ডলারের ওপেনএআই বা অ্যালফাবেটের মতো টেক জায়ান্টদের ওপর রাষ্ট্রীয় মালিকানা বা অংশীদারত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প।
এআই খাতের প্রত্যাশিত লভ্যাংশ সাধারণ আমেরিকানরা পাবেন না– এমন উদ্বেগে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেছেন, শীর্ষস্থানীয় বিভিন্ন এআই কোম্পানিতে জনগণকে অংশীদারত্ব দেওয়ার বিভিন্ন উপায় খতিয়ে দেখছেন তিনি।
রয়টার্স লিখেছে, নীতিনির্ধারক ও বিশেষজ্ঞরা তিনটি সম্ভাব্য উপায়ের কথা বলছেন, যেমন পরিচালনা পর্ষদে সরকারি প্রতিনিধি রাখা, নগদ অর্থের বদলে শেয়ারের মাধ্যমে কর আদায় করা বা সরাসরি সরকারি অর্থায়নের বিনিময়ে কোম্পানির পার্টনারশিপ নেওয়া।
এ মাসে ট্রাম্পের উত্থাপিত বিভিন্ন এআই কোম্পানি জনগণকে ‘ফিরিয়ে দেওয়ার’ ভাবনার সপক্ষে বেশ কয়েকটি প্রস্তাব দিয়েছেন নীতিনির্ধারক, কোম্পানি ও আইনজীবীরা। যার মধ্যে রয়েছে, কোম্পানিগুলোর পরিচালনা পর্ষদ বা বোর্ডে মার্কিন সরকারি প্রতিনিধি নিয়োগ, এ শিল্পের ওপর নির্দিষ্ট ট্যাক্স বা কর আরোপ এবং সরকারি তহবিলের বিনিময়ে কোম্পানির শেয়ার গ্রহণ করা।
সরকারকে শেয়ার দেওয়ার যে কোনো চুক্তি যুক্তরাষ্ট্রের রাজস্ব ব্যবস্থাকে পুনর্গঠন করতে পারে।
রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুসারে, শীর্ষ সারির দুই এআই কোম্পানি ওপেনএআই ও অ্যানথ্রপিক এ মাসেই মার্কিন শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার জন্য গোপনে আবেদন করেছে। যার মধ্যে ওপেনএআইয়ের বাজারমূল্য প্রায় ১ ট্রিলিয়ন ডলার ছোঁয়ার লক্ষ্য রয়েছে।
এআই খাতে মার্কিন সরকারের অংশীদারত্ব নেওয়ার বিষয়ে রয়টার্সের মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি অ্যানথ্রপিক, গুগল ও ওপেনএআই।
শেয়ারের মাধ্যমে কর পরিশোধ
এআইভিত্তিক সম্পদের একটি অংশ ধরে রাখতে কর ব্যবস্থাকে ব্যবহারের প্রস্তাব দিয়েছেন ভার্মন্টের স্বতন্ত্র সেনেটর বার্নি স্যান্ডার্স। তার প্রস্তাব অনুসারে, বড় বিভিন্ন কোম্পানি সরকারকে ৫০ শতাংশ মালিকানা ও বোর্ডে প্রতিনিধিত্ব দেবে।
তিনি বলেছেন, “আমেরিকান জনগণের অধিকার থাকা উচিত এআইয়ের নানা ক্ষতিকর দিক বন্ধ করার এবং এর থেকে হওয়া আর্থিক লাভ বন্টন করার।”
তার এই ভাবনাটি দুই আইন অধ্যাপকের দেওয়া এক প্রস্তাবের প্রতিধ্বনি, যেখানে নগদের পরিবর্তে শেয়ারের মাধ্যমে কর পরিশোধের কথা বলা হয়েছিল। ফলে কোনো পাবলিক ইনভেস্টমেন্ট বা সরকারি বিনিয়োগ ছাড়াই কার্যকরভাবে শেয়ার সরকারের কাছে স্থানান্তরিত হবে।
‘জর্জ ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি ল স্কুল’-এর অধ্যাপক জেরেমি বেয়ারার-ফ্রেন্ড বলেছেন, এ পদ্ধতির মাধ্যমে সরকারের কাছে কোম্পানির নিয়ন্ত্রণকারী অংশীদারত্ব থাকবে না।
সরকারি তহবিলের বিনিময়ে শেয়ার
আরেকটি মডেলে অনুসরণ করা হয়েছে ইনটেল-এর সঙ্গে করা চুক্তিটিতে, যেখানে দেশের অভ্যন্তরে উৎপাদন সক্ষমতা বেড়ে যাওয়ার জন্য শত কোটি ডলার অর্থায়নের বিনিময়ে সরকার কোম্পানিটির ১০ শতাংশ মালিকানা নিয়েছে।
প্রযুক্তি খাতে নিয়মিতভাবে মোটা অংকের অংকের নগদ অর্থের যোগান প্রয়োজন হয় এবং গত এক বছর ধরে খাতটি এআই অবকাঠামোর অর্থায়নের জন্য বিপুল পরিমাণ তহবিল সংগ্রহের চেষ্টা করছে। সরকারি বিনিয়োগ সেই অর্থায়নেরই একটি অংশ হতে পারে।
এ মাসে গুগল ডিপমাইন্ড-এর মূল কোম্পানি অ্যালফাবেট বলেছে, তারা তাদের শেয়ারের পরিমাণ বাড়িয়ে ৮ হাজার ৪৭৫ কোটি ডলারে উন্নীত করবে।
তবে মার্কিন সরকারকে ইনটেলের মতো এসব চুক্তি অনুকরণ না করার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন মুক্তবাজার বিশ্লেষকেরা। তাদের মতে, এমন পদক্ষেপ কোম্পানিগুলোর কাজের অনুপ্রেরণা বা উদ্দীপনাকে বিকৃত করতে পারে।
‘অ্যাবানডেন্স ইনস্টিটিউট’-এর এআই নীতিমালার নেতৃত্ব দেওয়া রিপাবলিকান সদস্য নিল চিলসন বলেছেন, “বিষয়টি সরকারকে এমন এক অবস্থানে ঠেলে দেয়, যেখানে জনস্বার্থে যুক্তরাষ্ট্রের প্রয়োজনীয় সক্ষমতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যটি আড়ালে পড়ে যায়। তাদের মনোযোগ তখন কেন্দ্রীভূত হয় নিজেদের বিনিয়োগের অর্থ কীভাবে উসুল করা যায়, সে বিষয়ে।”
গেল নভেম্বরে ওপেনএআইয়ের প্রধান নির্বাহী স্যাম অল্টম্যান বলেছিলেন, চিপ তৈরির কারখানার জন্য ফেডারেল ঋণ গ্যারান্টির বিষয়ে সরকারের সঙ্গে আলোচনা করলেও, ডেটা সেন্টারের জন্য তারা এ ধরনের কোনো ব্যবস্থার পেছনে ছোটেনি।
আমেরিকানদের অর্থ দেওয়া
কোম্পানিটির এক বিবৃতি অনুসারে, এপ্রিলে ওপেনএআই এক ‘পাবলিক ওয়েলথ ফান্ড’ বা জনকল্যাণ তহবিল তৈরির প্রস্তাব দিয়েছিল; যার মূল কাজ হবে এআই কোম্পানিগুলোতে বিনিয়োগ এবং সেখান থেকে আসা লভ্যাংশ সরাসরি নাগরিকদের মধ্যে বণ্টন করা।
এদিকে, অ্যানথ্রপিক বলেছে, তারা ‘ডিজিটাল ডিভিডেন্ড’ বা ডিজিটাল লভ্যাংশ দেওয়ার বিষয়টি খতিয়ে দেখছে, যেখানে এআই খাতের ওপর আরোপিত কর থেকে সংগৃহীত অর্থ সরাসরি আমেরিকান নাগরিকদের দেওয়া হবে।
এ ভাবনাটির সঙ্গে ‘আলাস্কা পার্মানেন্ট ফান্ড’-এর বেশ মিল রয়েছে। আলাস্কার মালিকানাধীন এ কর্পোরেশনটি অঙ্গরাজ্যটির প্রাকৃতিক সম্পদের দীর্ঘমেয়াদী মূল্য ধরে রাখতে তেলের রাজস্ব থেকে প্রাপ্ত তহবিল দিয়ে শুরু হয়েছিল।
এ তহবিল থেকে আলাস্কার স্থায়ী বাসিন্দাদের প্রতি বছর লভ্যাংশ দেওয়া হয় এবং সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তা আলাস্কার রাষ্ট্রীয় বাজেট পরিচালনায়ও সাহায্য করছে।
এ ধারণার পক্ষের মানুষেরা বলছেন, এআই খাতের ক্ষেত্রেও একই ধরনের মডেল প্রয়োগ সম্ভব। কারণ প্রযুক্তিটি সাধারণ মানুষের তৈরি ডেটা বা তথ্যের ওপর নির্ভর করে গড়ে উঠেছে।
এদিকে, ‘রাটগার্স ইউনিভার্সিটি’তে কর্পোরেট গভর্নেন্স বা প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন বিষয়ে পড়ানো জোসেফ ব্লাসি বলেছেন, “যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি অবকাঠামো নাগরিকদের নিজস্ব সম্পত্তি। এটা এমন কিছু নয়, যা এখানে-ওখানে থাকা দু-একজন বিলিয়নেয়ার বা ট্রিলিয়নেয়ার স্রেফ নিজেদের দখলে নিয়ে নেবে।”