Published : 23 Jun 2026, 04:26 PM
বিশ্বজুড়ে ফেলে দেওয়া কোটি কোটি টন ভেজা কফির বর্জ্য শুকানোর ঝামেলা ছাড়াই সরাসরি উচ্চমানের জ্বালানিতে রূপান্তরের নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছেন দক্ষিণ কোরিয়ার গবেষকেরা।
‘ফ্লেম প্লাজমা পাইরোলিসিস’ নামের বিশেষ পদ্ধতির মাধ্যমে কেবল ৯০ সেকেন্ডে কফির গুঁড়াকে অ্যানথ্রাসাইট কয়লার সমান পরিবেশবান্ধব ‘বায়োচারে’ রূপান্তর করা সম্ভব, যা বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বড় পরিবর্তন আনতে পারে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে বিজ্ঞানভিত্তিক সাইট নোরিজ।
বিশ্বজুড়ে প্রতি বছর কফি বর্জ্যের সিংহভাগেরই ঠাঁই হয় আবর্জনার স্তূপে বা এগুলোকে পুড়িয়ে ফেলা হয়, যা গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন ও পরিবেশ দূষণে ভূমিকা রাখে।
মূল সমস্যা হচ্ছে এসব বর্জ্য ভেজা থাকে, যার ফলে এগুলোকে উপযোগী কোনো পণ্যে রূপান্তর করা বেশ কঠিন ও ব্যয়বহুল। সাধারণত একে জ্বালানিতে রূপান্তরের আগে শুকিয়ে নিতে হয়, যা সময় ও শক্তি অপচয় করে।
তবে দক্ষিণ কোরিয়ার ‘ইনস্টিটিউট অফ জিওসায়েন্স অ্যান্ড মিনারেল রিসোর্সেস’-এর গবেষকদের উদ্ভাবিত নতুন প্রযুক্তি এ পরিস্থিতিকে পুরোপুরি বদলে দিতে পারে।
গবেষক দলটির উদ্ভাবিত নতুন প্রযুক্তির সাহায্যে কেবল ৯০ সেকেন্ডের মধ্যে ভেজা কফির গুঁড়াকে সরাসরি উচ্চমানের জ্বালানিতে রূপান্তর করা যাবে। এ প্রক্রিয়ার জন্য আগে থেকে কফির গুঁড়া শুকানো বা এর ভেতরের তৈলাক্ত নির্যাস অপসারণের কোনো প্রয়োজন পড়ে না।
‘ফ্লেম প্লাজমা পাইরোলিসিস’ বা এফপিপি পদ্ধতিতে প্রায় আটশ থেকে নয়শ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার উত্তপ্ত প্লাজমা শিখা ব্যবহৃত হয়, যা লিকুইফাইড পেট্রোলিয়াম গ্যাস ও সংকুচিত বাতাস ব্যবহারের মাধ্যমে এ অগ্নিশিখা তৈরি করে।
তীব্র তাপের সংস্পর্শে আসার সঙ্গে সঙ্গে ভেজা কফির গুঁড়ার ভেতরে আটকে থাকা পানি দ্রুত বাষ্পে পরিণত হয়। ফলে অভ্যন্তরীণ চাপের তৈরি হয়, যা উপাদানটির ভেতরে ছোট ছোট বিস্ফোরণ ঘটায়।
গবেষকরা এ প্রক্রিয়াটিকে ‘পপকর্ন ইফেক্ট’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যেখানে আর্দ্রতা বা ভেজা ভাব প্রক্রিয়ায় কোনো বাধা তৈরির পরিবর্তে ছিদ্রওয়ালা কার্বন কাঠামো তৈরি করে বিক্রিয়াটিকে আরও উন্নত করতে সাহায্য করে।
প্রক্রিয়াটি পুরোপুরি পরিবেশবান্ধব। প্রক্রিয়াজাতকরণের সময় খুব সামান্যই ধোঁয়া বা তৈলাক্ত অবশিষ্টাংশ তৈরি হয়। সবচেয়ে অনুকূল পরিস্থিতিতে গবেষকরা ৯০ সেকেন্ডের মধ্যে সম্পূর্ণ রূপান্তর ঘটাতে পেরেছেন।
‘বায়োচার’ নামে পরিচিত উৎপাদিত এ উপাদানটির শক্তিমান প্রতি কেজিতে ২৯ মেগাজুল, যা কফির মূল গুঁড়ার শক্তির চেয়ে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বেশি এবং মানের দিক থেকে অন্যতম শীর্ষ গ্রেডের ‘অ্যানথ্রাসাইট’ কয়লার সমান।
এ বায়োচার আরও কিছু বৈশিষ্ট্য দেখিয়েছে। এতে থেকে যাওয়া কার্বনের পরিমাণ প্রায় তিন গুণ, সব সালফার যৌগ দূর হয়েছে এবং এর পৃষ্ঠদেশের ক্ষেত্রফল নাটকীয়ভাবে বেড়েছে।
এসব বৈশিষ্ট্যের কারণে নতুন পদ্ধটিটি কেবল পরিবেশবান্ধব জ্বালানি হিসেবেই নয়, বরং পরিবেশ পরিচ্ছন্নকরণ ও বিভিন্ন শিল্পখাতে ব্যবহারের উপযোগী গুরুত্বপূর্ণ কার্বন উপাদান হিসেবেও দারুণ কার্যকরী হতে পারে।
এ প্রক্রিয়ার আরেকটি বড় সুবিধা দ্রুত গতি। ভেজা বায়োমাস বা জৈববর্জ্যকে জ্বালানিতে রূপান্তরের বিভিন্ন পদ্ধতিতে সাধারণত ৩০ মিনিট থেকে শুরু করে কয়েক ঘণ্টা পর্যন্ত সময় লেগে যায়।
নতুন এ এফপিপি প্রক্রিয়াটি ২০ থেকে ২৪০ গুণ পর্যন্ত দ্রুত হতে পারে। একইসঙ্গে তা শক্তির অপচয়ও কমায়। কারণ পদ্ধতিটি বিদ্যুৎ-সাশ্রয়ী ও বিদ্যুৎনির্ভর যন্ত্রপাতির পরিবর্তে দহন-প্রক্রিয়া থেকে তৈরি প্লাজমার ওপর নির্ভর করে।
গবেষকরা বলছেন, প্রযুক্তিটি পরবর্তীতে খাবারের উচ্ছিষ্ট, পয়ঃবর্জ্যের কাদা ও কৃষি বর্জ্যসহ অন্যান্য অনেক ধরনের ভেজা জৈববর্জ্যের ক্ষেত্রেও ব্যবহৃত হতে পারে। কমপ্যাক্ট বা ছোট আকৃতির ডিজাইন এবং দ্রুত প্রক্রিয়াকরণ সক্ষমতা পদ্ধতিটিকে স্থানীয় পর্যায়ে ‘বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ’ উৎপাদন কেন্দ্রগুলোর জন্য বিশেষভাবে উপযোগী করে তুলতে পারে।