Published : 19 Jul 2026, 12:59 PM
আদালতের আদেশে ঢাকার গুলশানে সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদের দুই ফ্ল্যাট ক্রোকের অংশ হিসেবে মালামালের তালিকা তৈরির কাজ চলছে।
রোববার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে ফ্ল্যাট দুটিতে প্রবেশ করেন দুদক কর্মকর্তারা। তাদের সঙ্গে পুলিশ সদস্যরাও রয়েছেন।
দুদকের জনসংযোগ কর্মকর্তা ও উপপরিচালক আকতারুল ইসলাম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, আদালতের অনুমতি নিয়ে দুদকের উপপরিচালক মশিউর রহমানের নেতৃত্বে একটি যৌথ দল নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামানের দুটি ফ্ল্যাটে মালামালের ইনভেন্টরি তৈরির কাজ করছে।
দুদকের উপপরিচালক ও অনুসন্ধান দলের নেতা মশিউর রহমান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “ফ্ল্যাটে প্রবেশ সম্পন্ন হয়েছে। এখন ইনভেন্টরির কাজ চলছে। এটি শেষ করতে দুই দিন লাগবে।”
দুদক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তালিকা তৈরির সময় ফ্ল্যাট থেকে রোলেক্স ব্র্যান্ডের একটি হাতঘড়ির ওয়ারেন্টি কার্ড পাওয়া গেছে।
এ কার্ডের তথ্য অনুযায়ী, ঘড়িটির মডেল নম্বর ৫০৫১৯, সিরিয়াল নম্বর ৭৩৪৫২৪৫৯। ক্রেতা হিসেবে সাইফুজ্জামান চৌধুরীর নাম রয়েছে। ২০১৯ সালের ২৪ জানুয়ারি লন্ডনের হ্যারডস ডিপার্টমেন্ট স্টোর থেকে ঘড়িটি কেনা হয়েছিল।
১৮ ক্যারেট হোয়াইট গোল্ডের রোলেক্স সেলিনি ডেট ঘড়ির দাম ১৬ হাজার ৫০০ ডলার পর্যন্ত হয়ে থাকে।

ফ্ল্যাট দুটির অবস্থান গুলশানের ৬৬ নম্বর সড়কের নর্থওয়েস্ট (বি) ব্লকের ১১ নম্বর প্লটে। এর মধ্যে এ-৭ নম্বর ফ্ল্যাটের আয়তন ৩ হাজার ৭৪৭ বর্গফুট; আর বি-৭ নম্বর ফ্ল্যাটের আয়তন ৩ হাজার ৮৩২ বর্গফুট। দুটি ফ্ল্যাটের মোট আয়তন ৭ হাজার ৫৭৯ বর্গফুট।
ঢাকা মহানগর জ্যেষ্ঠ বিশেষ জজ আদালতের আদেশে দুদকের সম্পদ ব্যবস্থাপনা ইউনিটের পরিচালককে ফ্ল্যাট দুটির রিসিভারের দায়িত্ব দেওয়া হয়। তার দায়িত্ব সম্পত্তির নিয়ন্ত্রণ, ব্যবস্থাপনা, তদারকি ও রক্ষণাবেক্ষণ করা।
তবে ফ্ল্যাট দুটি তালাবদ্ধ থাকায় রিসিভার সেখানে প্রবেশ করতে পারছিলেন না। পরে দুদকের আবেদনের পর গত ২৯ এপ্রিল আদালত অভিযোগ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির অনুপস্থিতিতেও বাধাহীনভাবে ফ্ল্যাটে প্রবেশ এবং ভেতরে থাকা মালামালের তালিকা করার অনুমতি দেয়।
দুদক আদালতে বলেছিল, ফ্ল্যাট দুটি তালাবদ্ধ থাকায় রিসিভারের দায়িত্ব পালন করা সম্ভব হচ্ছে না। ভাড়া দেওয়ার উপযোগী করার কাজও করা যাচ্ছে না। এরপর আদালত একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে রিসিভারকে ফ্ল্যাটে প্রবেশের অনুমতি দেন।
ওই আদেশ বাস্তবায়নে গুলশান রাজস্ব সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. নিলয় রহমানকে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। আর দুদকের চিঠিতে সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ এবং ভবনটির ব্যবস্থাপক ইমরান হোসেনকেও নির্ধারিত সময়ে উপস্থিত থাকতে বলা হয়।
আদালতের নথি অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১৮ নভেম্বর ক্রোকের আদেশ হয়। পরে চলতি বছরের ১২ জানুয়ারি রিসিভার নিয়োগ এবং ২৯ এপ্রিল তালা খুলে রিসিভারের প্রবেশ ও মালামালের তালিকা করার অনুমতি দেওয়া হয়।
সাইফুজ্জামান ও তার স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং অর্থ পাচারের অভিযোগ অনুসন্ধান করছে দুদকের একটি যৌথ দল।
চলতি বছরের ১৩ জানুয়ারি দুদকের আবেদনে সাইফুজ্জামানের যুক্তরাষ্ট্র, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ফিলিপিন্স, মালয়েশিয়া, কম্বোডিয়া, ভারত, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামে থাকা ৩৩০টি বাড়ি, ফ্ল্যাট ও অ্যাপার্টমেন্ট জব্দের আদেশ দেয় আদালত। দুদকের হিসাবে, এসব সম্পদ এবং যুক্তরাষ্ট্রের দুটি কোম্পানিতে তার বিনিয়োগের মূল্য প্রায় ২ হাজার ৩২১ কোটি টাকা।
পরে ২৬ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাজ্যে তার নামে থাকা ৫১৮টি ফ্ল্যাট ও অ্যাপার্টমেন্ট জব্দের আদেশ দেওয়া হয়। দুদকের আবেদনে এসব সম্পদের মূল্য ২৭ কোটি ১৮ লাখ ৫২ হাজার ৮৭২ পাউন্ড দেখানো হয়েছে।
এর আগে ২০২৫ সালের মার্চে তার ৩৯টি ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ এবং ২৩টি কোম্পানির শেয়ার জব্দের আদেশ দেওয়া হয়। একই অনুসন্ধানের বিভিন্ন পর্যায়ে তার ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আরও ব্যাংক হিসাব ও বিও হিসাবও অবরুদ্ধ করা হয়।
এদিকে ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক থেকে ঋণের নামে ২৫ কোটি টাকা বিদেশে পাচারের অভিযোগে করা এক মামলায় চলতি বছরের মার্চে সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ, তার স্ত্রীসহ ৩৬ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেয় চট্টগ্রামের একটি আদালত। একই সঙ্গে পলাতক আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও জারি করা হয়।
দুদকের বিভিন্ন আবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে, সাইফুজ্জামান অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে সম্পদ অর্জনের পাশাপাশি অর্থ বিদেশে পাচার করেছেন। তবে এসব অভিযোগের বিচারিক নিষ্পত্তি এখনো হয়নি।
সাইফুজ্জামান এর আগে বিদেশে তার সম্পদ নিয়ে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছিলেন, বৈধ ব্যবসার আয় দিয়েই তিনি সম্পদ কিনেছেন। তার দাবি, তার বিরুদ্ধে নেওয়া পদক্ষেপ ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’।