জন্মদিনে শোনা যাক স্টিভ জবসের জীবনের কয়েকটি ঘটনা

এর মধ্যে কিছু গল্প কেন্দ্রীয় চরিত্রের মতোই সুপরিচিত আর কিছু এমন গল্প যেগুলো অনেকেই জানেন না। দুই ধরনেরই মিলিয়ে আসুন চোখ বুলানো যাক স্টিভ জবসের জীবনের কয়েকটি ঘটনায়।

প্রযুক্তি ডেস্কবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 23 Feb 2024, 11:23 AM
Updated : 23 Feb 2024, 11:23 AM

বেঁচে থাকলে এ বছর ২৪ ফেব্রুয়ারি স্টিভ জবসের বয়স হতো ৬৯ বছর। জন্মের সময় তার নাম রাখা হয়েছিল স্টিভেন পল জবস।

বিখ্যাত ব্যক্তিদের বেলায় নানা গল্প শোনা যায়। এর মধ্যে কিছু গল্প কেন্দ্রীয় চরিত্রের মতোই সুপরিচিত আর কিছু এমন গল্প যেগুলো অনেকেই জানেন না। দু ধরনেরই মিলিয়ে আসুন চোখ বুলানো যাক স্টিভ জবসের জীবনের ৭টি ঘটনায়।

দত্তক নেওয়া এই সন্তান ছিলেন কলেজ ড্রপআউট

স্টিভ জবসের জন্মের পরপরই তাকে দত্তক দিয়েছিলেন তার মা-বাবা। বাংলা ভাষায় দত্তক নেওয়া সন্তানের বেলায় মা-বাবা বলতে অনেকেই জন্মসূত্রে মা-বাবাকেই বোঝান। তবে, স্টিভ জবসের বেলায় তিনি মা-বাবা বলতে সবসময়ই তার পালক মা-বাবাকে বুঝিয়েছেন।

জন্মসূত্রে জবস ছিলেন অর্ধেক আরব, তার বাবা ছিলেন সিরিয় বংশোদ্ভূত ও তার মা আমেরিকান। জন্মসূত্রে তার বাবা-মায়ের একটিই আর্জি ছিল - জবসকে যেন এমন কেউ দত্তক নেন যারা কলেজে গিয়ে শিক্ষা অর্জন করেছেন। কারণ তারা চেয়েছেন- সন্তান যেন শিক্ষিত হয়। এদিকে, দত্তক নিতে আগ্রহী পল ও ক্লারা  জবসের ছিল না কোনো স্নাতক ডিগ্রি। তারা দত্তক নিতে পেরেছিলেন এই শর্তে যে তারা এই শিশু সন্তানকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াবেন।

বাবা-মার ইচ্ছার পরও কলেজের পড়ালেখা শেষ করেননি স্টিভ জবস। মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে উঠে আসা জবস উচ্চ খরচের রিড কলেজে পড়তে গেলেও ছয় মাস পরেই ছেড়ে দেন। কারণ হিসাবে তিনি বলেছেন, মা-বাবার কষ্টার্জিত অর্থে তিনি এমন ডিগ্রি চাননি যেটি তার মনে হচ্ছে জীবনে কোনো কাজেই আসবে না।

কলেজের শিক্ষা কখনোই পছন্দ করেননি তিনি, ও অপ্রচলিত উপায়েই শিখতে পছন্দ করতেন। আশ্চর্যজনকভাবে, এর কয়েক দশক পরে জবস প্রকাশ করেন ম্যাকিনটশ কম্পিউটার। এর প্রথম দিকের টাইপোগ্রাফিকে অনুপ্রাণিত করেছিল রিড কলেজেরই একটি ক্যালিগ্রাফির ক্লাস।

এই গল্পটি জানা যায় ২০০৫ সালে স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটিতে দেওয়া তার সমাবর্তন বক্তৃতা থেকে।

মাউস বিভ্রাট

১৯৭০-এর দশকে তরুণ স্টিভ জবস ছোটবেলার বন্ধু স্টিভ ওজনিয়াকের সঙ্গে মিলে শুরু করেছিলেন ‘অ্যাপল’ নামের প্রকল্প। যখন প্রকল্পটি বড় হতে থাকে তখন অ্যাপলের যাত্রায় সাহায্য করার জন্য ‘হিউলেট-প্যাকার্ডে’র মতো বড় বড় কোম্পানি থেকে লোকজনকে নিয়ে এসেছিলেন। তবে, ম্যাকিনটশ কম্পিউটারের ‘গ্রাফিকাল ইউজার ইন্টারফেস’ নিয়ে তারাই জবসের সঙ্গে মতবিরোধ করে বসেন। তারা ‘মাউস’-এর ধারণার বিরুদ্ধে ছিলেন। ‘মাউস’-কে অনেক দামী ও অবাস্তব বলেছিলেন তারা।

অ্যাপল থেকেই বরখাস্ত হয়েছিলেন জবস!

১৯৮৩ সালে যখন অ্যাপল প্রাথমিক ধকল সামলাচ্ছে তখন জন স্কালি-কে অ্যাপলে যোগ দেওয়ার জন্য রাজি করিয়েছিলেন জবস। স্কালি সে সময় ছিলেন কোমল পানীয় উৎপাদক পেপসিকোর সিইও। সে সময় পেপসিকে মাত্র কয়েক বছরে লোকসান থেকে লাভে নিয়ে গিয়েছিলেন তিনি।

যে কথায় জবস স্কালিকে সে সময়ের শীর্ষ কর্পোরেট কোম্পানি থেকে ভাগিয়ে এনেছিলেন, সেটি হচ্ছে - “আপনি কী আজীবন এই চিনি মেশোনো পানি বিক্রি করবেন না আমার সঙ্গে এসে বিশ্বকে বদলে দেবেন?”

স্কালি অ্যাপলে যোগ দিয়ে ১৯৮৩ থেকে ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত সিইও’র দায়িত্ব পালন করেন।  তবে, যোগ দেওয়ার পরের ২ বছরে ফাটল ধরেছিল জবস ও স্কালির সম্পর্কে। আর অ্যাপলের বোর্ডও সমর্থন দিয়েছিল স্কালিকে। এর ফলে, ১৯৮৫ সালে জবসকে বের করে দেওয়া হয় তার নিজের কোম্পানি থেকেই। পরবর্তীতে ১৯৯৭ সালে আবারও ধুঁকতে থাকা অ্যাপলের সিইও’র পদে ফিরে আসেন জবস। সেখান থেকেই তিনি বদলে দিয়েছিলেন অ্যাপলের গল্পটা।

লাইসেন্স প্লেটে লুকোচুরি 

জবস তার সিলভার রঙের মার্সেইডিজ গাড়িটি ক্রমাগত ব্যবহার করা সত্ত্বেও কখনোই লাইসেন্স প্লেট রাখেননি। যুক্তরাষ্ট্রে নাম্বার প্লেটের আইন থাকার পরেও  এ কাজ কীভাবে করেছিলেন তিনি? নতুন গাড়ির একজন মালিককে লাইসেন্স প্লেট লাগাতে ছয় মাস সময় দেওয়া হয় ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের নিয়ম অনুসারে। আর এ নিয়মের সুযোগ নিয়েই জবস প্রতি ছয় মাস পর পর নিজের গাড়িটি একই মডেলের অপর একটি গাড়ির সঙ্গে বদলে নিতেন। এভাবে, লাইসেন্স প্লেট ছাড়াই গাড়ি চালিয়েছেন তিনি।

কারণ? লোকজন যেন গাড়ির নাম্বার প্লেট দেখে তার অবস্থান জেনে না ফেলে।

পোর্শে লুকোনোর গল্প

৮৫ সালে অ্যাপল থেকে বিতাড়িত হওয়ার পর নতুন প্রজেক্টে হাত দেন জবস। নতুন এই কোম্পানির নাম ছিল নেক্সট আর সেখান তার সঙ্গী ছিলেন সফটওয়্যার প্রকৌশলী র‍্যান্ডি অ্যাডামস।

জবস ও র‌্যান্ডি দুজনেরই তখন পোর্শে গাড়ি ছিল। সে সময় ‘নেক্সট’ বিনিয়োগ খুঁজছিল। একদিন জবস অ্যাডামসকে বলেন, তাদের পোর্শে দুটি লুকিয়ে রাখতে হবে। অ্যাডামসের প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, টেক্সাসের শীর্ষ তেল ব্যবসায়ী রস পেরো কোম্পানিতে বিনিয়োগ করার কথা ভাবছেন ও কোম্পানি দেখতে আসছেন। কিন্তু জবস চাননি গাড়ি দুটি দেখে পেরো ভাবুন নেক্সটের কাছে ভালোই অর্থকড়ি আছে।

জবসের ওই কৌশল কাজে লেগেছিল। রস পেরো ১৯৮৭ সালে দুই কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছিলেন নেক্সটে।

বিখ্যাত শিল্পীর সঙ্গে প্রেম

মার্কিন ফোক কিংবদন্দী জোয়ান বায়েজের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক বলতে কোন নামটি সবার আগে মনে পড়ে? বব ডিলান, তাই তো? অনেকেই সম্ভবত জানেন না, বায়েজের সঙ্গে বিশেষ সম্পর্ক হয়েছিল স্টিভ জবসেরও।

১৯৮২ সালে তৈরি হওয়া ওই প্রেমকে জবস বর্ণনা করেছিলেন এভাবে- “দুর্ঘটনাক্রমে বন্ধু থেকে প্রেমিক-প্রেমিকা হয়ে যাওয়া দুজন মানুষের গুরুতর সম্পর্ক।”

জোয়ান বায়েজের দীর্ঘদিনের প্রণয় অবশ্য ছিল বব ডিলানের সঙ্গে, প্রায় দুই দশক ধরে। তাদের সম্পর্কের ক্রমাগত উত্থানপতন উঠে এসেছে দুই শিল্পীর গানেই। 

জবসও ডিলানের বিশাল ভক্ত ছিলেন। ওজনিয়াক ও তার বন্ধুত্বের অন্যতম কারণ হচ্ছে দুজনই ছিলেন ডিলানের ফ্যান। তবে, ২০০৪ সালে ডিলান ও জবসের দেখা হলেও তাদের কথোপকথনের বিষয়গুলো অজানাই রয়েছে।

‘তারা অভ্যস্ত হয়ে যাবে’

২০০৬ সালে মার্কিন ব্যবসায়ী ও ওয়েব ব্রাউজার গুরু মার্ক অ্যান্ড্রেসেনকে প্রথম আইফোনের একটি প্রোটোটাইপ সংস্করণ দেখিয়েছিলেন জবস। ফোনটি নেড়েচেড়ে দেখার পর অ্যান্ড্রেসেন তাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন ব্যবহারকারীদের ফিজিকাল কিবোর্ড ছাড়া কেবল স্ক্রিনের ওপরে টাইপ করতে কোনো সমস্যা হবে বলে জবস মনে করেন কিনা। এর উত্তরে, একটি তীক্ষ্ণ দৃষ্টি দিয়ে জবস কেবল বলেছিলেন, “তারা এতে অভ্যস্ত হয়ে যাবে”। বাকি গল্পটা সবারই জানা।

‘ওয়ান মোর থিং’

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে স্টিভ জবসের শেষ বাণীর নামে বেশ কিছু ভিডিও কনটেন্ট প্রচারিত হয়েছে। ওইসব ভিডিওতে আফসোস করেছেন তিনি। কথাগুলো এমন- “ব্যবসায় আমি সাফল্যের চূড়ায় উঠেছি। অন্যের চোখে আমি সাফল্যের প্রতীক। আমি আজীবন অর্থের পেছনে ছুটেছি। আজ বুঝতে পারছি ধনসম্পদ আসলে অর্থহীন…”

এই ভিডিওগুলোর সবই ভুয়া। স্টিভ জবস বেঁচে থাকতেই তার জীবনী লিখতে শুরু করেছিলেন ওয়াল্টার আইজ্যাকসন। জবস মারা যাওয়ার পরও তার কাছের মানুষদের সঙ্গে কথা বলেছেন এই লেখক।

মৃত্যুর আগে স্টিভ জবসের শেষ বাক্য আসলে ছিল - ‘ওহ ওয়াও, ওহ ওয়াও!”