Published : 15 Apr 2026, 12:01 PM
মেটার স্মার্ট চশমায় মুখাবয়ব বা চেহারা শনাক্তকরণ প্রযুক্তি যোগের পরিকল্পনা নিয়ে তীব্র আপত্তি জানিয়েছে কয়েক ডজন মানবাধিকার সংগঠন।
তাদের দাবি, এ প্রযুক্তি চালু হলে সাধারণ মানুষের প্রাইভেসি নষ্ট হবে ও অপরাধীরা ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহার করে মানুষকে হয়রানির সুযোগ পাবে।
প্রযুক্তি সংবাদের সাইট এনগ্যাজেট প্রতিবেদনে লিখেছে, মেটার স্মার্ট চশমায় ‘ফেইশল রিকগনিশন প্রযুক্তি’ যোগের বিপদ সম্পর্কে সতর্ক করে কোম্পানিটির সিইও মার্ক জাকারবার্গকে একটি চিঠি দিয়েছে মানবাধিকার সংস্থাগুলো।
৭০টিরও বেশি সংগঠন একসঙ্গে হয়ে জোট গঠন করে জাকারবার্গকে এ পরিকল্পনা বাতিলের আহ্বান জানিয়েছে। তাদের দাবি, এ প্রযুক্তি চালু হলে তা স্টকার বা পিছু নেওয়া ব্যক্তি, যৌন নিপীড়ক এবং অন্যান্য অপরাধীদের আরও শক্তিশালী করে তুলবে।
এ জোটে ‘এসিএলইউ’, ‘ইলেকট্রনিক প্রাইভেসি ইনফরমেশন সেন্টার’, ‘ফাইট ফর দ্য ফিউচার অ্যান্ড অ্যাকসেস নাও’সহ আরও সংগঠন রয়েছে। চিঠিতে তারা কেবল সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেনি, বরং ফিচারটি পুরোপুরি বাতিলের আহ্বান জানিয়েছে।
সংগঠনগুলোর মতে, এ ধরনের ফেইশল রিকগনিশন প্রযুক্তির ধারণাটি এতটাই বিপজ্জনক যে, কোনো ধরনের ডিজাইন পরিবর্তন, অপ্ট-আউট বা ফিচারটি বন্ধ রাখার সুযোগ বা বাড়তি নিরাপত্তা দিয়েও এর ঝুঁকি কমানো সম্ভব নয়।
তাদের কথা যুক্তিসঙ্গতও বটে। কারণ আশপাশের সাধারণ মানুষ টেরই পাবেন না যে তাদের পরিচয় শনাক্ত করা হচ্ছে এবং এক্ষেত্রে তাদের সম্মতি নেওয়ারও উপায় নেই।
চিঠিতে উল্লেখ রয়েছে, “মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাপনের সময় এমন ভয় থাকা উচিত নয় যে, কোনো স্টকার, প্রতারক, নিপীড়ক, ফেডারেল এজেন্ট বা রাজনৈতিক কর্মী নীরবে ও অদৃশ্যভাবে তাদের পরিচয় যাচাই করছে।
“তাদের নামের সঙ্গে মিলিয়ে মানুষের অভ্যাস, শখ, সম্পর্ক, স্বাস্থ্য ও আচরণ সংক্রান্ত সহজলভ্য নানা তথ্য হাতিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।”
সংস্থাগুলো মেটাকে অনুরোধ করেছে, যেন কোম্পানিটি তাদের পরিধানযোগ্য ডিভাইস ব্যবহার করে পিছু নেওয়া, হয়রানি বা পারিবারিক সহিংসতার মতো কোনো ঘটনার তথ্য জানা থাকলে তা প্রকাশ করে।
আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি বিশ্লেষণ সাইট ওয়্যারড প্রতিবেদনে লিখেছে, সংগঠনগুলো আরও জানতে চেয়েছে, আইসিই‘সহ বিভিন্ন ফেডারেল আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সঙ্গে স্মার্ট গ্লাস বা অন্যান্য ডিভাইসের ব্যবহার নিয়ে মেটার কোনো আলোচনা হয়েছে কি না বা বর্তমানে চলছে কি না।
“এখানে উদ্বেগের যথেষ্ট কারণ রয়েছে।”
নিউ ইয়র্ক টাইমস প্রতিবেদনে লিখেছে, গত বছর মেটার এক অভ্যন্তরীণ নথিতে উঠে এসেছিল, প্রযুক্তিটি এমন এক সময়ে বাজারে আনা যেতে পারে যখন মানবাধিকার সংগঠনগুলো অন্যান্য রাজনৈতিক ইস্যুতে ব্যস্ত থাকবে।
করপোরেট ভাষায় এর অর্থ দাঁড়ায়, “আমরা ফিচারটি তখনই চালু করব যখন মানুষের নজর অন্যদিকে থাকবে”। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর জোট মেটার এ কৌশলকে ‘নীচ আচরণ’ উল্লেখ করে বলেছে, কোম্পানিটি আদতে ‘স্বৈরতান্ত্রিক পরিবেশের’ সুবিধা নিতে চাইছে।
মেটা বিতর্কিত এ প্রযুক্তির নাম দিয়েছে ‘নেইম ট্যাগ’, যা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহার করে স্মার্ট চশমার সামনে থাকা ব্যক্তিদের সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য চোখের সামনে থাকা ডিসপ্লেতে তুলে ধরবে।
প্রযুক্তিটি অনেকটা সেসব বিজ্ঞানভিত্তিক কল্পকাহিনীর মতো শোনায়, যেখানে প্রযুক্তি মানুষের ব্যক্তিগত প্রাইভেসিকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেয়।
মেটা এ টুলসেটের দুটি সংস্করণ নিয়ে কাজ করছে। একটি কেবল তাদেরই শনাক্ত করবে যারা বর্তমানে মেটার কোনো প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে যুক্ত। অন্য সংস্করণটি ইনস্টাগ্রামের মতো সার্ভিসে পাবলিক অ্যাকাউন্ট আছে এমন যে কোনো ব্যক্তিকে শনাক্ত করবে।
তবে এখন পর্যন্ত এমন কোনো উপায় দেখা যাচ্ছে না যা দিয়ে রাস্তায় থাকা কোনো অপরিচিত ব্যক্তিকে চেনা যাবে যার কোনো ধরনের মেটা অ্যাকাউন্ট নেই। অন্য কথায়, এ প্রযুক্তি চালু হলে ব্যবহারকারীদের অ্যাকাউন্ট বাতিলের হিড়িক পড়ে যেতে পারে।
এক ইমেইল বিবৃতিতে মেটার একজন মুখপাত্র বলেছেন, “আমাদের প্রতিযোগীরা এ ধরনের ফেইশল রিকগনিশন পণ্য সরবরাহ করলেও আমরা করি না। আমরা যদি কখনো এমন কোনো ফিচার নিয়ে আসি তবে তা চালুর আগে চিন্তাশীল পদক্ষেপ নেব।”
অতীতেও ফেইশল রিকগনিশন প্রযুক্তি থেকে মেটাকে পিছিয়ে আসতে বাধ্য করেছে জনসাধারণের তীব্র প্রতিবাদ। নাগরিক অধিকার রক্ষা সংগঠনগুলোর চাপ ও বছরের পর বছর ধরে চলা মামলার মুখে ২০২১ সালে ফেইসবুকের ‘ফটো-ট্যাগিং’ সিস্টেম বন্ধ করেছিল কোম্পানিটি।
ইলিনয় ও টেক্সাসে ‘বায়োমেট্রিক প্রাইভেসি’ সংক্রান্ত মামলা মেটাতে মেটাকে কয়েকশ কোটি ডলার জরিমানা দিতে হয়েছে।
এছাড়া, ফেইশল রিকগনিশন সফটওয়্যারের সঙ্গে আংশিকভাবে জড়িত অন্য এক প্রাইভেসি লঙ্ঘন মামলায় মার্কিন ‘ফেডারেল ট্রেড কমিশন’ বা এফটিসিকে ৫০০ কোটি ডলার পরিশোধ করেছিল মেটা।