Published : 30 Jun 2025, 05:24 PM
বৈশ্বিক উষ্ণতা বা গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ের কারণে পৃথিবীর তাপমাত্রা যেভাবে বাড়ছে তাতে ঘুম সংশ্লিষ্ট মারাত্মক রোগ স্লিপ অ্যাপনিয়া আরও অনেক মানুষের মধ্যে দেখা দিতে পারে। এ সমস্যায় আক্রান্তের সংখ্যা বিশ্বজুড়ে দ্বিগুণ হতে পারে বলে সাম্প্রতিক এক গবেষণায় সতর্ক করেছেন বিজ্ঞানীরা।
‘ফ্লিন্ডার্স ইউনিভার্সিটি’র ঘুমবিষয়ক গবেষকদের নতুন এক গবেষণায় উঠে এসেছে, বৈশ্বিক তাপমাত্রা দ্রত বেড়ে যাওয়ার ফলে স্লিপ অ্যাপনিয়া বা ঘুমের সময় মানুষের শ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়ার সমস্যা আরও খারাপ হতে পারে। এরইমধ্যে গোটা বিশ্বের প্রায় একশ কোটি মানুষকে এই রোগ ভোগাচ্ছে।
গবেষণাটি প্রকাশ পেয়েছে বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল ‘নেচার কমিউনিকেশন্স’-এ। এতে প্রথমবারের মতো উঠে এসেছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ‘অবস্ট্রাকটিভ স্লিপ অ্যাপনিয়া’ বা ওএসপি রোগের মাত্রাও বাড়তে পারে। এ রোগ হরে কারো ঘুমের মধ্যে বারবার শ্বাস বন্ধ হয়ে আসে।
গবেষণায় দেখা গিয়েছে, রাতে তাপমাত্রা বেশি থাকলে স্লিপ অ্যাপনিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা ৪৫ শতাংশ বেশি থাকে। জলবায়ু পরিবর্তনের অবস্থা এমনভাবেই বদলাতে থাকে তবে এ শতাব্দীর শেষ নাগাদ বিশ্বের অনেক অঞ্চলে স্লিপ অ্যাপনিয়া দ্বিগুণ হয়ে যাবে। এতে মানুষের স্বাস্থ্য ঝুঁকি তৈরি হবে ও চিকিৎসার খরচও অনেক বাড়বে।
গবেষণার প্রধান লেখক ও ‘ফ্লিন্ডার্স হেলথ অ্যান্ড মেডিকেল রিসার্চ’-এর ঘুম বিশেষজ্ঞ ড. বাস্তিয়েন লেশা বলেছেন, রাতের গরম তাপমাত্রা ও স্লিপ অ্যাপনিয়া খারাপ হওয়ার মধ্যে এতটা জোরালো সম্পর্ক রয়েছে, যা তাকে বিস্মিত করেছে। বিষয়টি এত গুরুতর হতে পারে ভাবেননি তিনি।
“এ ধরনের গবেষণা এটিই প্রথম, যেখানে উঠে এসেছে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে আশপাশের তাপমাত্রার বদল ঘুমের সময় শ্বাস-প্রশ্বাসে সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে। এ প্রভাব অঞ্চলভেদে ভিন্ন ও ইউরোপের মানুষ আমেরিকা বা অস্ট্রেলিয়ার চেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকতে পারেন। এর সম্ভাব্য কারণ ইউরোপে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ বা এয়ার কন্ডিশনারের ব্যবহার কম।”
গবেষকরা বলছেন, স্লিপ অ্যাপনিয়ার ঠিকমতো চিকিৎসা না হলে এটি ডিমেনশিয়া, পারকিনসন্স, হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, উদ্বেগ ও বিষণ্ণতা’সহ বেশ কয়েকটি মারাত্মক রোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে। এ সমস্যা জীবনের মান কমিয়ে দেয়, গাড়ি দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ায় ও মৃত্যুর হারও বাড়িয়ে তোলে। কেবল অস্ট্রেলিয়াতেই স্লিপ অ্যাপনিয়ার মতো ঘুমের সমস্যার কারণে বছরে ছয় হাজার ৬ কোটি ডলারের বেশি ক্ষতি হয়।
গবেষণার জন্য বিশ্বজুড়ে এক লাখ ১৬ হাজারেরও বেশি মানুষের ঘুমের তথ্য বিশ্লেষণ করেছেন গবেষকরা, যেগুলো সংগ্রহ হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ‘ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন’ বা এফডিএ অনুমোদিত এক ঘুম সেন্সরের মাধ্যমে, যেটি ম্যাট্রেসের নিচে বসানো থাকে।
গবেষণায় অংশগ্রহণ করা ব্যক্তিরা গড়ে তাদের ৫০০ রাতের ঘুমের তথ্য দিয়েছেন। এরপর এসব ঘুমের তথ্যকে মিলিয়ে দেখা হয়েছে ওইসব রাতে তারা যেসব অঞ্চলে ঘুমিয়েছিলেন সেখানকার রাতের তাপমাত্রা কত ছিল, যাতে বোঝা যায় গরম ও ঘুমের সমস্যার মধ্যে কোনো সম্পর্ক আছে কি না। এক্ষেত্রে তাপমাত্রার তথ্য নেওয়া হয়েছে বিশ্বব্যাপী জলবায়ু মডেল থেকে।
গবেষণায় তথ্যের বিশাল এক ভাণ্ডার তৈরি করেছেন বিজ্ঞানীরা। ফলে তারা বুঝতে পেরেছেন সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ও পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে তাপমাত্রা বদলে যাওয়ার ফলে স্লিপ অ্যাপনিয়ার তীব্রতা কীভাবে পরিবর্তিত হয়েছে।
এরপর গবেষকরা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য ব্যবহার করে এ রোগের অবনতির কারণে গোটা বিশ্বে স্বাস্থ্য ও অর্থনীতির ওপর কী প্রভাব পড়বে, তা হিসাব করেছেন। তারা বলছেন, অসুস্থতা বা অকালমৃত্যুর কারণে একজন মানুষের সুস্থ জীবন নষ্ট হবে এবং এর ফলে অর্থনীতিতে বড় ক্ষতি হবে।
গবেষণায় উঠে এসেছে, কেবল ২০২৩ সালেই তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ার কারণে ২৯টি দেশে প্রায় ৮ লাখ মানুষ সুস্থ জীবন হারিয়েছেন। আর এ ক্ষতি বাইপোলার ডিজঅর্ডার, পারকিনসনস ও দীর্ঘমেয়াদি কিডনি রোগের মতো গুরুতর নানা রোগের কারণে যে ক্ষতি হয়, তার সমান।
আর্থিকভাবে এ ক্ষতির পরিমাণ ছিল ৯ হাজার ৮০০ কোটি ডলার। যার মধ্যে ৬ হাজার ৮০০ কোটি ডলার ক্ষতি হয়েছে মানুষের জীবনের মান কমে যাওয়ার কারণে এবং ৩ হাজার কোটি ডলার ক্ষতি হয়েছে কাজের জায়গায় উৎপাদনশীলতা কমে যাওয়ার ফলে। কারণ অসুস্থতার কারণে ঠিকমতো কাজ করতে পারেননি তারা।
গবেষকরা বলছেন, এখন যা দেখা যাচ্ছে, তা কেবল শুরু। যদি বৈশ্বিক উষ্ণতা কমাতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হয় তবে ২১০০ সালের মধ্যে স্লিপ অ্যাপনিয়ার সমস্যা পুরো বিশ্বে দ্বিগুণ হতে পারে।
এ গবেষণার জ্যেষ্ঠ গবেষক অধ্যাপক ড্যানি একার্ট বলেছেন, তাদের গবেষণায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের বেশিরভাগই ধনী দেশ থেকে এসেছেন, যাদের ঘুমানোর পরিবেশ ভালো ও এয়ার কন্ডিশনিংয়ের মতো সুবিধাও ছিল। ফলে তার অনুমান, যেসব দেশে সাধারণ মানুষ এসব সুযোগ-সুবিধা পান না, সেখানে স্বাস্থ্যগত ও অর্থনৈতিক ক্ষতি আরও বেশি হতে পারে।
গবেষণাটিতে আরও একবার প্রমাণ মিলেছে, জলবায়ু পরিবর্তন সরাসরি মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলছে, বিশেষ করে ঘুমের সময়ও। বৈশ্বিক তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে স্লিপ অ্যাপনিয়ার সঠিকভাবে নির্ণয় ও চিকিৎসার বিষয়টি এখন জরুরি হয়ে উঠেছে।
অধ্যাপক একার্ট বলেছেন, “জলবায়ু সংকট এখন কেবল পরিবেশের বিষয় নয়, বরং এটি আমাদের ঘুম, আমাদের জীবনযাপন ও আমাদের কাজের পদ্ধতির সঙ্গেও জড়িয়ে রয়েছে।”