Published : 13 Feb 2026, 11:52 AM
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যবহারকারীদের ‘আসক্ত’ হওয়ার ধারণা সরাসরি অস্বীকার করলেন ইনস্টাগ্রাম প্রধান।
ক্যালিফোর্নিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ এ মামলার বিচার চলাকালে স্বাক্ষ্য দেওয়ার জন্য ডাক পড়েছিল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমটির সিইও অ্যাডাম মোসেরির।
বুধবার সাক্ষীর কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে মোসেরি বলেছেন, “আমি মনে করি চিকিৎসাবিজ্ঞানের ‘আসক্তি’ আর ‘সমস্যাময় ব্যবহারের’ মধ্যে পার্থক্য করতে পারাটা জরুরি।”
ব্রিটিশ দৈনিক গার্ডিয়ান লিখেছে, মনোবিজ্ঞানীরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের আসক্তিকে এখনও কোনো রোগ হিসেবে বিবেচনা করেন না। তবে গবেষকরা তরুণদের মধ্যে এ মাধ্যমের অতিরিক্ত ব্যবহারের ক্ষতিকর বিভিন্ন দিক নথিবদ্ধ করেছেন এবং বিশ্বজুড়ে এর আসক্তি তৈরির শঙ্কা নিয়ে উদ্বিগ্ন আইনপ্রণেতারা।
এমন বিচারপ্রক্রিয়ায় সাক্ষ্য দেওয়া প্রথম কোনো শীর্ষ নির্বাহী মোসেরি, যেখানে শত শত পরিবার এবং স্কুল কর্তৃপক্ষ মেটা, স্ন্যাপ, টিকটক ও ইউটিউবের বিরুদ্ধে মামলা করেছে।
তাদের অভিযোগ, এসব কোম্পানি জেনেশুনে এমন সব আসক্তি তৈরিকরা অ্যাপ বানিয়েছে, যা তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি করছে। লস অ্যাঞ্জেলেসে শুরু হওয়া এ প্রাথমিক বিচারটি মূলত ২০ বছর বয়সী এক তরুণীকে কেন্দ্র করে, যাকে ‘কেজিএম’ নামে চিহ্নিত করা হচ্ছে।
মামলায় অভিযোগ, সামাজিক যোগোযোগ মাধ্যমের আসক্তি তৈরি করা ডিজাইন, যেমন একটানা স্ক্রলের সুবিধা তার বিষণ্ণতা ও আত্মহত্যার ভাবনাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
কেজিএম ও অন্য দুজন অভিযোগকারী মূলত ‘বেলওয়েদার ট্রায়াল’ বা পরীক্ষামূলক মামলার অংশ, যা উভয় পক্ষের জন্য জুরির মনোভাব বোঝার একটি মাধ্যম হিসেবে কাজ করছে।
বুধবার মোসেরিকে একের পর এক তীক্ষ্ণ প্রশ্ন করেন বাদীর আইনজীবী মার্ক ল্যানিয়ার। তিনি জানতে চান ইনস্টাগ্রাম কি নিরাপত্তার চেয়ে মুনাফাকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে কি না এবং ইনস্টাগ্রামের ‘কসমেটিক ফিল্টার’গুলো প্লাস্টিক সার্জারিকে উৎসাহিত করে কি না।
উত্তরে মোসেরি বলেছেন, কোম্পানিটি নতুন ফিচার চালুর আগে পরীক্ষা করে দেখে যে তরুণরা সেগুলো কীভাবে ব্যবহার করবে।
“আমরা যতটা সম্ভব নিরাপদ থাকার চেষ্টা করছি। তবে একইসঙ্গে সেন্সরশিপ বা তথ্যের ওপর নিয়ন্ত্রণও যতটা সম্ভব কম রাখার চেষ্টা করছি।”
কিছু পরিবার মোসেরির এমন আলাপ শোনার পর মনে করছেন, ইনস্টাগ্রামের কারণে হওয়া ক্ষতি সম্পর্কে তাদের আশঙ্কাই সত্যি হয়েছে।
এক বিবৃতিতে ‘সোশাল মিডিয়া ভিকটিম ল সেন্টার’-এর প্রতিষ্ঠাতা ও বাদীর আইনজীবী ম্যাথিউ পি বার্গম্যান বলেছেন, “আজ মোসেরির সাক্ষ্য থেকে প্রমাণ মেলে, ভুক্তভোগী বিভিন্ন পরিবার অনেকদিন ধরে সন্দেহ করে আসছে যে, ইনস্টাগ্রামের কর্তারা অপ্রাপ্তবয়স্কদের নিরাপত্তার চেয়ে প্ল্যাটফর্মের প্রচার ও প্রসারকেই বেশি গুরুত্ব দেবেন বলে সচেতনভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এটাই সত্যি।”
এর আগেও এ ধরনের সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন মোসেরি, তিনি প্ল্যাটফর্মের আসক্তিবান্ধব ডিজাইন সম্পর্কে বিভিন্ন সতর্কবার্তাকে গুরুত্ব দেননি।
বাদীর আইনজীবী তার ‘ওপেন স্টেটমেন্ট’-এ মেটা গবেষকদের মধ্যকার এক আলাপ তুলে ধরেন, যেখানে প্ল্যাটফর্মটির আসক্তিকর বিষয় নিয়ে জোর দেওয়া হয়েছিল।
একজন কর্মী অভ্যন্তরীণ এক বার্তায় পরামর্শ দিয়েছিলেন, “ইনস্টাগ্রাম মাদকের মতো” ও অন্য একজন বলেছিলেন, “হা হা হা, আসলে সব সামাজিক মাধ্যমই তাই। আমরা মূলত ড্রাগ বিক্রেতা বা পুশার।”
তাদের মধ্যে একজন আরও উল্লেখ করেছিলেন, “আমি জানি মোসেরি এসব শুনতে চায় না... টিনএজারদের বিভিন্ন মৌলিক বিষয় নিয়ে আমার রিভিউতে যখন আমি ডোপামিন নিয়ে কথা বলেছিলাম তিনি তখন খেপে গিয়েছিলেন। তবে এমনটি অস্বীকারের উপায় নেই যে, বিষয়টি যেমন জৈবিক তেমনই মনস্তাত্ত্বিক।”
বুধবার আদালতে এমন কিছু মা-বাবা উপস্থিত ছিলেন যাদের অভিযোগ, সামাজিক মাধ্যমের আসক্তিবান্ধব ডিজাইনের কারণে তাদের সন্তানদের ক্ষতি হয়েছে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে মারাও গেছেন। তাদের মধ্যে একজন জন ডিমায়। তার ছেলে জর্ডান ২০২২ সালে ১৭ বছর বয়সে অনলাইনে ‘সেক্সটোরশন’ বা যৌন ব্ল্যাকমেইল স্ক্যামের শিকার হওয়ার কেবল কয়েক ঘণ্টা পর নিজের জীবনাবসান ঘটান।
নাইজেরিয়ার দুই ভাই হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে পাওয়া একটি ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে নিজেদের মেয়ে পরিচয় দিয়ে জর্ডানের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। জর্ডান তাদের নিজের কিছু নগ্ন ছবি পাঠানোর পর তাকে ব্ল্যাকমেইল করতে শুরু করেন তারা। জর্ডানের কাছে ১ হাজার ডলার দাবি করে ও হুমকি দেয় যে, অর্থ না দিলে এসব ছবি তার বন্ধু ও পরিবারের কাছে পাঠিয়ে দেবে।
মোসেরির সাক্ষ্য দেওয়ার কয়েক ঘণ্টা আগে জন ডিমায় অনুমান করেছিলেন, মোসেরি কেবল নিজের ভাবমূর্তি রক্ষার চেষ্টা ছাড়া আর বিশেষ কিছু করবেন না।
“বিষয়টি আমাদের জন্য এরইমধ্যে একটি জয়। কারণ এ সাক্ষ্য ও ভেতরের নথিপত্র এখন সবার সামনে। এখন মোসেরিকে কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে বলতে হবে, কেন তার কোম্পানি এমন আসক্তি তৈরি করা পণ্য বানাচ্ছে ও কেন এটা চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছে তারা, যেখানে শিশুরা এর কারণে মারা যাচ্ছে।”
এ সপ্তাহের শুরুতে হওয়া শুনানিতে বাদীদের আইনজীবী মার্ক ল্যানিয়ার মেটা ও গুগলের কিছু অভ্যন্তরীণ নথিও তুলে ধরেছেন। তার দাবি, এসব কোম্পানি চার বছর বয়সী শিশুদেরও নিজেদের টার্গেট বানিয়েছিল। বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যম অ্যাপকে ‘ডিজিটাল ক্যাসিনো’ বলে বর্ণনা করেছেন তিনি। কারণ এগুলোতে ‘এন্ডলেস স্ক্রলিং’-এর মতো বৈশিষ্ট্য রয়েছে।
অন্যদিকে, ইউটিউব একটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও এর ব্যবহারকারীরা আসক্ত এমন দাবি বাতিল করেছেন ইউটিউবের আইনজীবীরা।
মেটার আইনজীবীরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আসক্তির পেছনের বিজ্ঞান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ও যুক্তি দিয়েছেন, মামলার মূল ভুক্তভোগী কেজিএমের মানসিক সমস্যার কারণ তার পারিবারিক সমস্যা, সামাজিক মাধ্যম নয়।