১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

বার্ধক্যে অসুস্থতার ৮০ শতাংশই হয় নিজের কারণে: গবেষণা

গবেষণায় দেখা গেছে, অকাল মৃত্যু ও জৈবিক বার্ধক্যের ক্ষেত্রে বংশগত জিনের চেয়ে পরিবেশগত প্রভাব ও বিভিন্ন অভ্যাসের ভূমিকা বেশি।

বার্ধক্যে অসুস্থতার ৮০ শতাংশই হয় নিজের কারণে: গবেষণা
গবেষণা বলছে, মানুষ সাধারণত যতটা মনে করে নিজের আয়ুর ওপর আসলে তার চেয়ে বেশি নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। ছবি: ফ্রিপিক

প্রযুক্তি ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 23 May 2026, 01:34 PM

Updated : 26 Aug 2026, 03:40 PM

বৃদ্ধ বয়সের অসুস্থতার জন্য মানুষ নিজেই অন্তত ৮০ শতাংশ দায়ী বলে উঠে এসেছে সাম্প্রতিক এক গবেষণায়।

বয়স বাড়লে শরীর ভেঙে পড়াটা অনিবার্য, অথবা এর দায় দেশের সরকারের– মানুষের মধ্যে থাকা এমন প্রচলিত ধারণাকে যাচাই করতেই এ গবেষণাটি করেছেন গবেষকরা।

এতে উঠে এসেছে, সঠিক জীবনযাত্রা ও অভ্যাসের মাধ্যমে নিজের দীর্ঘায়ু ও সুস্বাস্থ্যের নিয়ন্ত্রণ মানুষ নিজেই নিতে পারেন।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ান লিখেছে, গেল সপ্তাহে অক্সফোর্ডে অনুষ্ঠিত ‘স্মার্ট এজিং সামিট’-এ গবেষণাটি প্রকাশ পেয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে, মানুষ সাধারণত যতটা মনে করে, নিজের দীর্ঘায়ুর ওপর আসলে তার চেয়ে বেশি নিয়ন্ত্রণ রয়েছে।

গবেষণায় ধূমপানের মতো অ্যালকোহল বা মদ্যপানের বেলাতেও কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন গবেষকেরা।

‘লিভিং লঙ্গার, বেটার’ বা দীর্ঘদিন ও সুস্থভাবে বেঁচে থাকা শিরোনামের এ গবেষণাটি ‘অক্সফোর্ড লঞ্জিভিটি প্রজেক্ট’-এর প্রথম ‘এজ-লেস’ বা বয়স-প্রতিরোধী গবেষণা।

চিকিৎসা, শরীরতত্ত্ব, বার্ধক্য ও শিক্ষানীতি বিষয়ের একদল ব্রিটিশ বিশেষজ্ঞ যৌথভাবে গবেষণাটি করেছেন। এ উদ্যোগে পৃষ্ঠপোষকতা করেছে ‘অক্সফোর্ড হেলথস্প্যান’।

এ গবেষণার লেখক স্যার ক্রিস্টোফার বল, স্যার ম্যিউর গ্রে, ড. পল চ্যান, লেসলি কেনি ও অধ্যাপক ডেনিস নোবল। তারা লিখেছেন, এ ৮০ শতাংশের হিসাবটি একেবারেই ন্যূনতম একটা ধারণা।

সাবেক প্যারাসুট রেজিমেন্ট সেনা ৯১ বছর বয়সী স্যার ক্রিস্টোফার বল শতায়ু হওয়ার স্বপ্ন দেখেন। তিনি বলেছেন, “কেউ কেউ এ দায়টিকে আরও বাড়িয়ে প্রায় ৯০ শতাংশ পর্যন্ত বলেছেন। তবে আমার মনে হয় ৮০ শতাংশ বলাটাই সবচেয়ে বাস্তবসম্মত।”

তবে গবেষণার এ দাবিটিকে বড্ড সরলীকৃত বা একপেশে এমন সমালোচনাও রয়েছে।

সমালোচকরা বলছেন, দারিদ্র্য, দূষণ ও চিকিৎসাসেবা পাওয়ার মতো বিষয়গুলোর ক্ষেত্রে মানুষ আসলেই কতটা নিজের ইচ্ছামতো সিদ্ধান্ত নিতে পারে সেই বৃহত্তর বাস্তবতা এখানে বিবেচনায় আসেনি।

‘হার্ভার্ড টিএইচ চ্যান স্কুল অফ পাবলিক হেলথ’-এর সামাজিক মহামারি সংক্রান্ত বিষয়ের অধ্যাপক ন্যান্সি ক্রিগার বলেছেন, “জেনেটিক ডিটারমিনিজম বা বংশগতির অন্ধ বিশ্বাস বাতিলের জন্য এ গবেষণাটি নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার।

“তবে সমস্যা হচ্ছে, স্বাস্থ্যের ওপর সমাজের প্রভাব ও স্বাস্থ্য বৈষম্যের বিভিন্ন বিষয় এ গবেষণাটি এড়িয়ে গেছে। কাজের পরিবেশ, অর্থনৈতিক বঞ্চনা ও সরকারি নীতিমালার যে ভূমিকা রয়েছে, যার কারণে কর্পোরেট বিভিন্ন কোম্পানি অস্বাস্থ্যকর পণ্য বিক্রির অবাধ সুযোগ পায়, সেসব বিষয় এ গবেষণায় আসেইনি।”

‘ভার্জিনিয়া কমনওয়েলথ ইউনিভার্সিটি সেন্টার অন সোসাইটি অ্যান্ড হেলথ’-এর পরিচালক এবং পারিবারিক চিকিৎসা ও জনস্বাস্থ্য বিষয়ের অধ্যাপক স্টিভেন উলফও এ বক্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করে বলেছেন, গবেষণাটি “একটি জনগোষ্ঠীর অসুস্থতার পেছনে থাকা প্রকৃত ও বহুমাত্রিক মূল কারণগুলোকে উপেক্ষা ও অতি-সরল করেছে।

“স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব রয়েছে এমন অনেক উপাদানই মানুষের ব্যক্তিগত চাওয়া না চাওয়ার বাইরে। ফলে, নিজেদের সিদ্ধান্ত কীভাবে স্বাস্থ্যের ক্ষতি করছে সে বিষয়ে মানুষকে স্পষ্ট দিকনির্দেশনা দেওয়া ভালো হলেও এর মাধ্যমে নীতিনির্ধারক ও অন্যান্য দায়বদ্ধ বিভিন্ন পক্ষকে দায়িত্ব থেকে রেহাই দেওয়া হচ্ছে।”

‘ইউনিভার্সিটি অফ এডিনবরা’র বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্য বিভাগের অধ্যাপক ও চেয়ারপারসন ডেভি শ্রীধর বলেছেন, তিনি এই ৮০ শতাংশের হিসাবটির সঙ্গে ‘মোটাদাগে একমত’।

তবে তিনি বলেছেন, সামাজিক-অর্থনৈতিক অবস্থা ও সুস্বাস্থ্যের মধ্যে শক্তিশালী সম্পর্ক রয়েছে। সরকারি নীতিমালার নিয়ন্ত্রণ ও মানুষের অসুস্থতার মধ্যেও সরাসরি সংযোগ রয়েছে।

শ্রীধর প্রশ্ন তোলেন, “নইলে আমরা আসলে কী বলতে চাচ্ছি? যাদের দামি বাড়ি আছে তারা বেশি নিয়মতান্ত্রিক জীবনযাপন করেন?”

তবে স্যার ক্রিস্টোফার এসব দাবি খণ্ডন করে বলেছেন, “দোষ যদি আপনার নিজের হয় তবে সেটা আসলে ভালো খবর। কারণ এর মানে দাঁড়ায়, দায়িত্বটাও আপনার। আর দায়িত্ব যখন আপনার তখন আপনি নিজেই এ বিষয়ে কিছু একটা করতে পারবেন।

“আমরা এমন এক সংস্কৃতিতে বাস করি যেখানে আমরা সবসময় দোষ চাপানোর জন্য বাইরের কোনো কারণ খুঁজি, যেমন ‘সব দোষ আমার জিনের’, ‘সব আমার মা-বাবার দোষ’। আসলে তা নয়। আপনি যদি দোষারোপের এই খেলাটা খেলতেই চান তবে বলতে হবে, সব দোষ আপনার নিজেরই।”

যুক্তরাজ্যের ‘বায়োব্যাংক’-এর প্রায় পাঁচ লাখ অংশগ্রহণকারীর তথ্যের ওপর ভিত্তি করে করা এ গবেষণায় দেখা গেছে, অকাল মৃত্যু ও জৈবিক বার্ধক্যের ক্ষেত্রে বংশগত জিনের চেয়ে পরিবেশগত প্রভাব ও বিভিন্ন অভ্যাসের ভূমিকা বেশি।

গবেষণায় সুস্থ থাকার জন্য বেশ কিছু পরামর্শ এসেছে। এর মধ্যে রয়েছে, প্রক্রিয়াজাত খাবার পরিহার, অ্যালকোহল বা মদপান থেকে পুরোপুরি বিরত থাকা, ঘুমকে অগ্রাধিকার দেওয়া, সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার পর কিছু না খাওয়া ও ‘মাংস না খাওয়ার মানসিকতা’ গড়ে তোলা।

অ্যালকোহলের বিষয়ে গবেষণায় বর্তমান সরকারি নির্দেশনার চেয়েও বেশি কঠোর অবস্থান নিয়েছে। গবেষক বল বলেছেন, “অ্যালকোহল বিষাক্ত জিনিস। পান করবেন না।”