Published : 07 Sep 2026, 03:07 PM
মঙ্গল গ্রহের উদ্দেশ্যে যাত্রা করা কোনো নভোচারীর মহাকাশযানে হঠাৎ যদি সব ইলেকট্রনিক ন্যাভিগেশন ও যোগাযোগ ব্যবস্থা বিকল হয়ে যায় তবে তারা কীভাবে নিরাপদে পৃথিবীতে ফিরে আসবেন?
মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার বিজ্ঞানীরা বলছেন, এ চরম ও মারাত্মক সংকটের একমাত্র ভরসা হতে পারে প্রায় ৩০০ বছর আগে উদ্ভাবিত এক সামুদ্রিক দিকনির্ণয় যন্ত্র সেক্সট্যান্ট।
বিবিসি লিখেছে, অতীতে পৃথিবীর সমুদ্রযাত্রায় নাবিকদের প্রধান হাতিয়ার ও নাসার প্রথম দিকের মহাকাশ মিশনে ব্যবহৃত যন্ত্রটিই এখন চাঁদ ও গভীর মহাকাশ অভিযানে নভোচারীদের জন্য হতে পারে শেষ মুহূর্তের জীবন রক্ষাকারী বিকল্প।
মহাকাশ বা সমুদ্রের বুকে নিজেদের সঠিক ভৌগোলিক অবস্থান হিসাবের জন্য তারা বা অন্যান্য গ্রহের মতো বিভিন্ন জ্যোতিষ্কের মধ্যকার কোণ পরিমাপ করতে সেক্সট্যান্ট ব্যবহৃত হয়।
তবে কেবল জরুরি পরিস্থিতি ঠেকাতেই নয়, মানুষ যখন মঙ্গল গ্রহ ও তারও দূরে অন্ধকারে পাড়ি জমানোর সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা করছে তখন এ প্রাচীন স্টার-সাইটিং বা তারা দেখে দিক নির্ণয়ের বিভিন্ন কৌশলের প্রতি নাসার প্রকৌশল ও ন্যাভিগেশন বিশেষজ্ঞদের আগ্রহ নতুন করে বাড়ছে।
এ বিষয়ে ওরিয়ন মহাকাশযান ও এর আর্টেমিস মিশনগুলোর ন্যাভিগেশন সিস্টেম ম্যানেজার গ্রেগ হোল্ট বলেছেন, “আমরা পৃথিবী থেকে যত দূরে ও মহাকাশের যত গভীরে প্রবেশ করব জিপিএস বা স্যাটেলাইটের মতো পৃথিবীভিত্তিক ন্যাভিগেশন প্রযুক্তির ওপর আমাদের নির্ভরতা ততটাই কমতে থাকবে।
“ফলে এখন আমাদের এমন সব ধ্রুপদী ন্যাভিগেশন প্রযুক্তির ওপর পুনরায় ফিরে তাকাতে হচ্ছে, যা ১৬, ১৭ ও ১৮ শতকে সামুদ্রিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে ব্যাপকভাবে প্রচলিত ছিল।”
সেই ক্লাসিক্যাল ন্যাভিগেশনের যুগে নিজেদের অবস্থান ও মহাকাশে মহাকাশযানের সঠিক অভিমুখ নির্ধারণ করতে একমাত্র ভরসা ছিল তারার গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা।
মহাকাশের গভীরে পৃথিবী থেকে লাখ লাখ মাইল দূরে চলে যাওয়ার পর এসব প্রাচীন কৌশলই হয়ে উঠতে পারে একমাত্র অবলম্বন। কারণ তখন চোখের সামনে তারাপুঞ্জ ছাড়া আর কোনো নির্ভরযোগ্য দিকচিহ্ন বা রেফারেন্স অবশিষ্ট থাকে না।
মহাকাশে যে কোনো ধরনের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার মতো ভয়াবহ বিপদের দিনে নভোচারীদের জীবন বাঁচানোর ক্ষেত্রে এ তারাভিত্তিক দিকনির্ণয়ের গুরুত্ব অনেক।
এ প্রসঙ্গে গ্রেগ হোল্ট বলেছেন, “আমরা নিশ্চিত করতে চাই যে, কোনো কারণে পৃথিবীর সঙ্গে সব ধরনের যোগাযোগ বিছিন্ন হয়ে গেলেও নভোচারীদের নিরাপদে পথ খুঁজে ঘরে ফিরে আসার নিশ্চিত পথ যেন সবসময় খোলা থাকে।”
চাঁদের পথে প্রাচীন যন্ত্রের হাতছানি
৯৬-এর দশকে নাসা প্রাচীন এ স্টার-সাইটিং বা তারা দেখে দিক নির্ণয়ের পদ্ধতি মহাকাশ ফ্লাইটে সফলভাবে যোগ করেছিল।
ওই সময় চাঁদের বুকে পা রাখা প্রথম মানুষ নিল আর্মস্ট্রংয়ের মনেও প্রশ্ন ছিল, পৃথিবীর সঙ্গে যোগাযোগ চিরতরে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে কেবল এই ক্লাসিক্যাল ন্যাভিগেশনের ওপর ভরসা করে নিরাপদে ফিরে আসা সম্ভব কি না।
১৯৬৬ সালে ‘জেমিনাই’ মহাকাশযানে রেডারে ত্রুটি দেখা দিলে বাজ আলড্রিন বাধ্য হয়েই হাতে ধরা সেক্সট্যান্ট ও চার্ট ব্যবহার করেন।
এ ছাড়া ১৯৭০ সালের প্রায় বিপর্যয়ের মুখে পড়া অ্যাপোলো ১৩ মিশনে জিম লোভেল পৃথিবীর দিগন্তকে চোখের সামনে রেখে ঘরে ফিরে আসার ঐতিহাসিক কাজটি করেছিলেন।
এ ধারাবাহিকতায় ২০১৮ সালে আন্তর্জাতিক মহাকাশ কেন্দ্রে নাসার গবেষকরা আরও একবার নভোচারী সেরেনা আউয়ন-চ্যান্সেলর ও আলেকজান্ডার গের্স্টকে দিয়ে খালি চোখে ও স্থির হাতে এক হ্যান্ডহেল্ড সেক্সট্যান্ট ব্যবহারের সফল পরীক্ষা চালান।
মহাকাশের মাইক্রোগ্রাভিটি বা শূন্য অভিকর্ষে পৃথিবীর চেয়েও সহজে এ যন্ত্র ব্যবহার করা যায় বলে জানিয়েছেন নভোচারীরা।
বর্তমানে হিউস্টন থেকে ভিডিও কলে কথা বলার সময় গ্রেগ হোল্ট যে সেক্সট্যান্টটি দেখান তা সামুদ্রিক যন্ত্রেরই পরিবর্তিত একটি রূপ। মহাকাশের কথা মাথায় রেখে এ যন্ত্রের ধারালো প্রান্তগুলো বিশেষভাবে রাউন্ড বা মসৃণ করা হয়েছে, যাতে কোনো দুর্ঘটনা না ঘটে।
এ ছাড়া, মহাকাশযানের দেওয়ালে আটকে রাখার জন্য এতে হুক-অ্যান্ড-লুপ ফাস্টনার যোগ করেছে নাসা, যা মাইক্রোগ্রাভিটিতে এটাকে ভেসে বেড়াতে দেবে না।
আর্টেমিস মিশন ও ওরিয়ন মহাকাশযানে বর্তমান প্রযুক্তির ছোঁয়া লেগেছে, যেখানে ব্যাকআপ হিসেবে আধুনিক ‘অপটিক্যাল ন্যাভিগেশন সিস্টেম’ ব্যবহৃত হয়েছে, যা উচ্চ প্রযুক্তির এক ডিজিটাল সেক্সট্যান্ট।
মহাকাশযানের সঙ্গে যোগ থাকা একটি ক্যামেরা আশপাশের তারা ও গ্রহের ছবি তুলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে তারার মধ্যবর্তী কোণ ও গ্রহের ব্যাস পরিমাপ করে।
গ্রেগ হোল্ট বলেছেন, “আর্টেমিস মিশনগুলোতে পৃথিবীর সঙ্গে যোগাযোগ ও গ্রাউন্ড-বেস্টেড ট্র্যাকিং সাময়িকভাবে নষ্ট হয়ে গেলেও এ অপটিক্যাল ন্যাভিগেশন সিস্টেমটি ক্রুদের নিরাপদ পথ দেখাবে।”
প্রতিদিন অন্তত একবার সিস্টেমটি সক্রিয় করে এর কার্যকারিতা যাচাই করা হয়, যা মহাকাশ অভিযানে নভোচারীদের নিরাপত্তা বহুগুণ বাড়িয়েছে।
প্রযুক্তির বাইরেও ভরসা প্রাচীন জ্ঞান
মহাকাশ অভিযানে আধুনিক প্রযুক্তির ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরতার পাশাপাশি প্রাচীন জ্ঞান ও কৌশলের গুরুত্ব অরেক। তবে উচ্চপ্রযুক্তির অপটিক্যাল ন্যাভিগেশন সিস্টেম কোনো কারণে ব্যর্থ হলে কি নভোচারীদের জন্য হাতে ধরা বা হ্যান্ডহেল্ড সেক্সট্যান্ট ব্যবহারের সুযোগ থাকে?
এ প্রসঙ্গে গ্রেগ হোল্ট বলেছেন, এপ্রিলে চাঁদের উদ্দেশ্যে পরিচালিত ‘আর্টেমিস টু’ মিশনে উৎক্ষেপণের আগে এ ধরনের একটি জরুরি হ্যান্ডহেল্ড সেক্সট্যান্ট প্রস্তুত রাখা হয়েছিল। ওই সময়ে আধুনিক ক্যামেরানির্ভর সিস্টেমে কোনো ত্রুটি দেখা দিলে শেষ মুহূর্তে সেক্সট্যান্টটি মহাকাশযানে তুলে দেওয়া হত।
তবে ওরিয়ন মহাকাশযানে সেক্সট্যান্টটি নিয়মিতভাবে সঙ্গে রাখা হয় না। এর পেছনের কারণ ব্যাখ্যা করে গ্রেগ হোল্ট বলেছেন, মহাকাশ মিশনে প্রতিটি গ্রামের ওজন মূল্যবান। ফলে অপ্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সেখানে বহন করা হয় না।
উৎক্ষেপণের পর মহাকাশে যদি কোনো বড় ধরনের সিস্টেম ফেইলিওর বা বিপর্যয় ঘটে তবে নভোচারীদের কাছে সাধারণত সেক্সট্যান্টটি থাকে না। কিন্তু সে ক্ষেত্রে তারা যেন বিপদে না পড়েন সেজন্য তাদের খালি চোখে ন্যাভিগেশনের বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।
যেমন, নির্দিষ্ট কোনো তারা কখন পৃথিবী বা চাঁদের পেছনে ঢাকা পড়ে বা অদৃশ্য হয়ে যায় তার সময় হিসাব করে নিজেদের বর্তমান অবস্থানের ধারণা পেতে পারেন নভোচারীরা।
এ ছাড়া, আধুনিক প্রকৌশলীদের জন্যও এ প্রাচীন যন্ত্রের সঙ্গে পরিচিতি থাকা জরুরি। হোল্ট বলেছেন, আধুনিক হাই-টেক সিস্টেম ডেভেলপারদের তিনি সবসময় সেক্সট্যান্ট নিয়ে অনুশীলন করতে বলেন, যাতে তারা এর পেছনের মূল গণিত ও জ্যামিতিক ভিত্তি ভালোভাবে অনুধাবন করতে পারেন।
গ্রহাণুর পথ ধরে মঙ্গল যাত্রা
আগে সমুদ্রযাত্রার সময় যেভাবে উজ্জ্বল তারা ও তারামণ্ডলগুলো নাবিকদের পথ দেখাত আধুনিক নভোচারীদের জন্যও সেগুলো সমানভাবে কার্যকর। কারণ এসব তারা মানুষ খুব সহজেই শনাক্ত করতে পারে, তা সে পৃথিবীর মাটি থেকেই হোক বা গভীর মহাকাশযানের জানালা দিয়ে।
আসন্ন মঙ্গল অভিযানের ক্ষেত্রে এসব ন্যাভিগেশন পয়েন্টের মধ্যে গ্রহাণুও অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে বলে জানান গ্রেগ হোল্ট।
“নভোচারীদের নির্দিষ্ট করে বলে দেওয়া হতে পারে যে, আমরা আশা করছি অমুক গ্রহাণুটি জেমিনাইয়ের দুটি প্রধান তারার ঠিক মাঝামাঝি অবস্থানে থাকবে। ফলে সেদিকে তাকিয়ে গ্রহাণুটি খুঁজে বের করুন, রিডিং নিন ও প্রত্যাশিত হিসেবের সঙ্গে তা মিলিয়ে প্রয়োজনীয় অংক কষে নিন।”
রিডিংয়ে কোনো গরমিল দেখা গেলে নভোচারীরা তাৎক্ষণিকভাবে মহাকাশযানের গতিপথ বা কোর্স কারেকশন করে সঠিক পথে ফিরে আসতে পারেন।
প্রকৌশল ও বিজ্ঞানের এ মেলবন্ধন নিয়ে নিজের ভালোলাগার কথা জানিয়ে গ্রেগ হোল্ট বলেছেন, “আমার কাছে এ কাজের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হচ্ছে দেখা, যে কীভাবে প্রাচীনতম তারা দেখার কৌশল থেকে শুরু করে মঙ্গল গ্রহ বা তারও দূরের গভীরে পাড়ি জমানোর আধুনিক বিভিন্ন ন্যাভিগেশন পদ্ধতি একে অপরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে।”
প্রাচীন যুগে লাঠি বা সেক্সট্যান্ট দিয়ে ম্যানুয়ালি করা হোক বা বর্তমান যুগে উচ্চপ্রযুক্তির ক্যামেরা দিয়ে সব সুদূরপ্রসারী মিশনের ন্যাভিগেশনের মূল ভিত্তি কিন্তু একই। আর তা হল তারাগুলোর দিকে তাকানো, সেগুলোর সাপেক্ষে অন্যান্য মহাজাগতিক বস্তুর অবস্থান তুলনা ও জ্যামিতিক সম্পর্কের মাধ্যমে নিজেদের সঠিক অবস্থান নির্ধারণ করা।