Published : 06 Mar 2026, 01:48 PM
টুইটার বিনিয়োগকারীদের দায়ের করা এক মামলায় আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন ইলন মাস্ক। বিনিয়োগকারীদের অভিযোগ, ২০২২ সালে সামাজিক মাধ্যম কোম্পানিটি কেনার সময় শেয়ারবাজার জালিয়াতির আশ্রয় নিয়েছিলেন মার্কিন এ ধনকুবের।
ব্রিটিশ পত্রিকা গার্ডিয়ান লিখেছে, বুধবার এ মামলায় আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছেন মাস্ক। এ ক্লাশ অ্যাকশন মামলায় দাবি করা হয়েছে, টুইটার কিনতে রাজি হওয়ার পর কয়েক মাস ধরে গড়িমসি করেছিলেন মাস্ক এবং সুপরিকল্পিতভাবে কোম্পানিটির সমালোচনা করেছিলেন, যাতে শেয়ারের দাম কমিয়ে কম মূল্যে প্লাটফর্মটি কেনা যায়।
দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর মাস্ক শেষ পর্যন্ত নিজের আগের প্রস্তাবিত দামেই (শেয়ার প্রতি ৫৪.২০ ডলার) টুইটার কিনেছিলেন, যার মোট মূল্য ছিল প্রায় ৪ হাজার ৪০০ কোটি ডলার।
বুধবার সাক্ষ্য দেওয়ার সময় মাস্ক দাবি করেছেন, তিনি বুঝতে পারেননি টুইটারে তার করা আক্রমণাত্মক বিভিন্ন টুইট কোম্পানির শেয়ারের দাম কমিয়ে দেবে বা বিনিয়োগকারীদের ক্ষতি করবে।
আমেরিকান সংসবাদমাধ্যম সিএনবিসি প্রতিবেদনে লিখেছে, শুনানির শুরুতে বিনিয়োগকারীদের আইনজীবী মাস্ককে প্রশ্ন করেন, টুইটারের বিরুদ্ধে তার প্রকাশ্যে কড়া সমালোচনাগুলো যে শেয়ার বাজারে প্রভাব ফেলতে পারে সে বিষয়ে তিনি সচেতন ছিলেন কি না।
জবাবে মাস্ক বলেছেন, “শেয়ার বাজার অনেকটা ‘ম্যানিক ডিপ্রেসিভ’ বা খামখেয়ালি মানসিক অবস্থার মতো।
“আমার টুইটগুলো মাঝেমধ্যে শেয়ার বাজারের ওপর এমন প্রভাব ফেলে, যা কেউ আশাই করে না। আবার কখনো কখনো সেগুলো প্রত্যাশিতভাবেই প্রভাব ফেলে।”
২০২২ সাল জুড়ে মাস্ক তার কোটি কোটি টুইটার অনুসারীদের উদ্দেশ্যে ক্রমাগত পোস্টে বলেছিলেন, এ সামাজিক মাধ্যম প্ল্যাটফর্মটি ‘বট’ বা স্বয়ংক্রিয় অ্যাকাউন্টে ভরা, যা স্প্যাম ছড়াচ্ছে ও ভুয়া অ্যাকাউন্ট তৈরি করছে।
এক পর্যায়ে মাস্ক টুইট করে দাবি করেন, টুইটারের অন্তত ২০ শতাংশ অ্যাকাউন্টই ভুয়া এবং কোম্পানিটি যদি এর উল্টোটা প্রমাণ করতে না পারে তবে টুইটার কেনার ‘চুক্তি এগোতে পারে না’।
বিচারক চার্লস ব্রেয়ারের অধীনে স্যান ফ্রান্সিসকোর ফেডারেল আদালতে এ বিচার প্রক্রিয়া চলছে। জুরি নির্বাচনের সময় সম্ভাব্য জুরিদের প্রায় অর্ধেককেই বাদ দেওয়া হয়েছিল। কারণ, মাস্কের প্রতি তাদের চরম নেতিবাচক ধারণা ছিল। সোমবার এ মামলার ‘ওপেনিং স্টেটমেন্ট’ শুরু হয়েছে।
মার্কিন বাণিজ্য প্রকাশনা বুমবার্গ-এর তথ্য অনুসারে, মামলার প্রারম্ভিক বক্তব্যে বাদীদের আইনজীবী মার্ক মোলামফি বলেছেন, “আমরা আজ এখানে, কারণ মাস্ক বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে প্রতারণা করেছেন। সাক্ষ্য-প্রমাণই বলে দেবে, মাস্ক জানতেন তিনি ঠিক কী করছেন।”
পাল্টা জবাবে মাস্কের আইনজীবী মাইকেল লিফ্রাক বলেছেন, টুইটার সম্পর্কে এ বিলিয়নেয়ারের অভিযোগগুলো ছিল যৌক্তিক এবং টুইটার কেনা নিয়ে তার এসব উদ্বেগ ‘বাস্তব ছিল, কোনো প্রতারণা নয়।”
মামলার তদন্তাধীন ওই ছয় মাস সময়কালে (এপ্রিল থেকে অক্টোবর ২০২২) বাদীরা অভিযোগ করেছেন, মাস্ক টুইটার বোর্ডকে চাপে ফেলার চেষ্টা করেছিলেন যেন তারা তার প্রাথমিক প্রস্তাবের চেয়ে কম দামে টুইটার বিক্রি করতে বাধ্য হয়।
২০২২ সালের মে মাসে এক টুইটের মাধ্যমে মাস্ক বলেছিলেন, টুইটার কেনা ‘সাময়িকভাবে স্থগিত’ করা হল। এর পরবর্তী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে টুইটারের শেয়ারের দাম হু হু করে পড়ে যায়, এক পর্যায়ে তা ২০ শতাংশের নীচে নেমে আসে। এরপর কয়েক মাস ধরে শেয়ারের বাজারে অস্থিরতা চলতে থাকে।
এ মামলার বিনিয়োগকারীরা বলেছেন, মাস্ক যখন চুক্তিটি বাতিল করতে চাইছেন বলে মনে হয়েছিল তখন তারা শেয়ার প্রতি ৫৪.২০ ডলারের চেয়ে অনেক কম দামে তাদের শেয়ার বিক্রি করেছিলেন।
বুধবার সাক্ষ্য দেওয়ার সময় মাস্ক দাবি করেন, তিনি ভাবেননি যে তার ওই ‘স্থগিত’ করার টুইটটির কারণে প্লাটফর্মটির শেয়ারের দাম এভাবে ধসে পড়বে।
নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন বলছে, মাস্ক বলেছেন, “হয়ত এটি আমার খুব একটা বুদ্ধিদীপ্ত টুইট ছিল না। তবে আমি একে ‘ভয়াবহ বোকামি’ হিসেবেও বর্ণনা করব না। তবে ওই টুইট যদি আমাকে এই বিচারের মুখে দাঁড় করিয়ে দেয় তবে একে বোকামি বলাই যায়।”
বিনিয়োগকারীদের আইনজীবী অ্যারন আর্নজেন বলেছেন, মাস্ক ঠিক কী করছেন তা তিনি ভালো করেই জানতেন।
“মাস্ক অন্যরকম এক চুক্তি চেয়েছিলেন। ফলে প্রকাশ্যে এক নাটকীয় পরিস্থিতি তৈরি করে কোম্পানিটিকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেছেন মাস্ক, যাতে শেয়ারের দাম কমিয়ে আনা এবং চুক্তিটি পুনরায় আলোচনা বা বাতিল করা সম্ভব হয়।”
২০২২ সালে টুইটার কেনার পর প্লাটফর্মটিকে এক ব্যক্তিগত কোম্পানিতে রূপান্তর এবং এর নাম পরিবর্তন করে ‘এক্স’ রাখেন মাস্ক। গত বছর তিনি এ ব্যবসাকে তার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই কোম্পানি ‘এক্সএআই’-এর সঙ্গে একীভূত এবং পরবর্তীতে এ দুটি ব্যবসাংশকেই নিজের মহাকাশ কোম্পানি স্পেসএক্স-এর অধীনে নিয়ে আসেন।
৮০ হাজার কোটি ডলারেরও বেশি সম্পদের মালিক ও বিশ্বের শীর্ষ ধনী ব্যক্তি মাস্ক সম্ভবত এ বছরের কোনো এক সময় স্পেসএক্সকে শেয়ার বাজারে নিয়ে আসবেন, যা রেকর্ড ভাঙা আইপিও হতে যাচ্ছে। বেসরকারি বিনিয়োগকারীরা তার এ সম্মিলিত ব্যবসার মূল্য নির্ধারণ করেছেন ১.২৫ ট্রিলিয়ন ডলার।
জুরিরা টুইটার বিনিয়োগকারীদের পক্ষে রায় দিলে মাস্ক তাদের ক্ষতির অর্থ ফেরত দিতে বাধ্য হবেন। এ সিদ্ধান্তটি মাস্কের বিরুদ্ধে চলা অন্যান্য মামলার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। যার মধ্যে রয়েছে মার্কিন ‘সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন’ বািএসইসি-এর দায়ের করা এক মামলাও, যেখানে অভিযোগ উঠেছে, মাস্ক নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে টুইটারে তার মালিকানার কথা প্রকাশ না করে আইন লঙ্ঘন করেছেন।
মাস্ক বরাবরই কোনো ধরনের ভুলের কথা স্বীকার করেননি। এখন বিনিয়োগকারীদের আইনজীবীদের ওপরই দায় বর্তেছে বিষয়টি প্রমাণের যে, মাস্ক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে টুইটারের শেয়ারের দাম নিয়ে কারসাজি করার চেষ্টা করেছিলেন। এ বিচার প্রক্রিয়া দুই থেকে তিন সপ্তাহ পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।