Published : 24 Jun 2026, 10:18 AM
একটি ছবি। সেখানে কোনো নগ্নতা নেই। কোনো যৌন ইঙ্গিতও নেই। শুধু একজন নারী, যার কাঁধ খোলা দেখা যাচ্ছে এবং তিনি পশ্চিমা ধাঁচের পোশাক পরেছেন। তবু সেই ছবিই তার পরিবার, সামাজিক অবস্থান এবং সম্পর্কগুলোকে ভেঙে দিতে পারে।
নতুন এক গবেষণা বলছে, অনলাইনে ছবির অপব্যবহার নিয়ে আমরা সম্ভবত ভুল জায়গায় নজর দিচ্ছি।
প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্ম ও সরকারি সংস্থাগুলো ছবিভিত্তিক অনলাইন নির্যাতনের ক্ষেত্রে সম্মতির বদলে নগ্নতার বিষয়টিকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে বলে উঠে এসেছে বিবিসি-তে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে। আর সেখানেই বড় একটি সমস্যা তৈরি হচ্ছে বলে মনে করছে বৈশ্বিক লিঙ্গবিচারবিষয়ক অলাভজনক সংগঠন চেইন।
সংগঠনটির নতুন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, অনেক সমাজেই ক্ষতিকর একটি ছবি মানেই নগ্ন ছবি নয়। বরং পুরোপুরি পোশাক পরা একটি ছবিও একজন নারীর জীবনে সমান ভয়াবহ প্রভাব ফেলতে পারে।
এই বাস্তবতার একটি উদাহরণ পাকিস্তানের একজন নারী, যার নাম গোপন রাখতে প্রতিবেদনে তাকে মাহনুর নামে উল্লেখ করা হয়েছে।
৩২ বছর বয়সী এই বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক বিবিসিকে বলেছেন, বিয়েবিচ্ছেদের পর তিনি নিজের শৈশবের বাড়িতে ফিরে এসেছিলেন। ধারণা ছিল, পরিবার তাকে সমর্থন দেবে। কিন্তু বাস্তবে উল্টোটা হয়েছে।
এক বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও তার বাবা ও ভাইরা এখনও তার সঙ্গে কথা বলেন না। কর্মস্থলের দীর্ঘদিনের সহকর্মীরাও চোখে চোখ রেখে কথা বলতে চান না।
মাহনুর বলছেন, তার দাম্পত্য জীবন কখনও সহজ ছিল না। পারিবারিকভাবে ঠিক হওয়া এই বিয়েতে তার স্বামী দীর্ঘদিন ধরে তাকে মানসিক ও শারীরিকভাবে নির্যাতন করেছেন।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাকে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করেছে তার একান্ত ব্যক্তিগত জীবন প্রকাশ্যে চলে আসা।
অনেক তরুণীর মতো তিনিও নিজের ফোনে বিভিন্ন ছবি জমিয়ে রেখেছিলেন।
কোথাও ভালো একটি ডিনারের ছবি, কোথাও সুন্দর আলোয় তোলা সেলফি। একটি ছবিতে নতুন চুল কাটার পর হাসিমুখে দেখা যাচ্ছে তাকে। আরেকটিতে বিদেশে শিক্ষাবিনিময় কর্মসূচিতে বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটাচ্ছেন তিনি। আবার কোনো ছবিতে বিছানায় শুয়ে চোখ বন্ধ করে আইলাইনার দেখাচ্ছেন।
এই ছবিগুলোর কোনোটিই কখনও প্রকাশ্যে শেয়ার করেননি তিনি।
পাকিস্তানের রক্ষণশীল সামাজিক বাস্তবতার কারণে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও তিনি খুব কম ছবিই প্রকাশ করতেন।
মাহনুরের অভিযোগ, তার সাবেক স্বামী তার ফোনে প্রবেশ করে এসব ব্যক্তিগত ছবি সংগ্রহ করেন এবং পরে আত্মীয়স্বজন, সহকর্মী ও পরিচিতদের মধ্যে ছড়িয়ে দেন।
শুধু তা-ই নয়, অনেক বন্ধুর সঙ্গে তোলা কিছু ছবিও কেটে এমনভাবে সাজানো হয়, যাতে মনে হয় তিনি একজন পুরুষের সঙ্গে একা দাঁড়িয়ে আছেন।
এর মাধ্যমে তাকে ‘খারাপ চরিত্রের নারী’ হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা ছিল।
আর অনেক সমাজেই এমন অভিযোগ একজন নারীর জীবনে ভয়াবহ, এমনকি প্রাণঘাতী পরিণতি ডেকে আনতে পারে।
মাহনুর বিবিসিকে বলেন, “আমি আমার জবান হারিয়ে ফেলেছিলাম। নিজেকে আর দৃশ্যমান মনে হয়নি।”
তিনি আরও বলেন, “আমার পরিবার একসময় আমাকে সম্মান করত। আমার ভাইয়েরা আমাকে সম্মান করত। বাবা-মায়ের কাছে নিজের মতামতের মূল্য পাওয়া খুব বড় একটি বিষয়। তারা আগে আমার পরামর্শ চাইতেন। এখন আর চান না।”
অন্যদিকে, তার সাবেক স্বামী নতুন করে বিয়ে করেছেন।
চেইনের প্রতিবেদন বলছে, ছবিভিত্তিক নির্যাতন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে রিভেঞ্জ বা প্রতিশোধমূলক পর্নোগ্রাফি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি নগ্ন ছবি কিংবা যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ কনটেন্ট।
কিন্তু এই কাঠামোতে একটি বড় বাস্তবতা বাদ পড়ে যাচ্ছে।
অনেক সমাজে লজ্জা, সামাজিক মর্যাদা ও নিয়ন্ত্রণের সংস্কৃতি কীভাবে কাজ করে, সেটি যথেষ্ট গুরুত্ব পাচ্ছে না।
চেইনের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রতিবেদনের লেখক হেরা হুসেইন বলেন, “ক্ষতিকর হতে হলে ছবিটি নগ্ন হওয়ার প্রয়োজন নেই। কখনও কখনও শরীরের একটি অংশ খোলা না থাকলেও সেটি সমান ক্ষতিকর হতে পারে।”
তিনি আরও বলেন, “আমরা ছবিভিত্তিক নির্যাতন নিয়ে আলোচনাকে নগ্নতা থেকে সরিয়ে সম্মতির দিকে নিতে চাই।”
এই গবেষণার জন্য ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৬৪টি সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে।
এতে পাকিস্তানের বিভিন্ন অঞ্চল ছাড়াও যুক্তরাজ্য, কানাডা, জার্মানি, মালয়েশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কুয়েতে বসবাসকারী পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত ব্যক্তিরাও অংশ নিয়েছেন।
সেখানে নারীরা জানিয়েছেন, কোন ধরনের ছবি প্রকাশ হওয়ার আশঙ্কা তাদের সবচেয়ে বেশি আতঙ্কিত করে।
যেমন, মাথার ওড়না ছাড়া দৃশ্যমান চুল, পশ্চিমা পোশাক, অনাত্মীয় কোনো পুরুষের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ছবি, খণ্ডিত বা ভুয়া কথোপকথনের স্ক্রিনশট কিংবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি বিকৃত ছবি।
এসবের কোনোটিতেই নগ্নতা নেই।
তবু সবগুলোই একজন মানুষের বিরুদ্ধে ক্ষতিকর গল্প তৈরি করতে পারে।

পাকিস্তানের অভিনেত্রী আয়েশা ওমরের অভিজ্ঞতাও একই ধরনের।
দুই দশকের বেশি সময় ধরে পাকিস্তানের চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন অঙ্গনে কাজ করছেন তিনি।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যাপক জনপ্রিয় হওয়ারও আগে তার ব্যক্তিগত ছবি চুরি হয়েছিল।
এক দশকের বেশি আগে থাইল্যান্ডে এক নারী বন্ধুর সঙ্গে সমুদ্রসৈকতে ছুটি কাটানোর সময় তোলা ছবি তার অজান্তেই একটি ল্যাপটপ থেকে সংগ্রহ করে অনলাইনে ছড়িয়ে দেওয়া হয়।
ছবিগুলোতে তিনি সাঁতারের পোশাক ও শর্টস পরেছিলেন।
তিনি বলেন, “আমার ক্যারিয়ারের জন্য এটি খুব ক্ষতিকর ছিল। আমি বিজ্ঞাপনের কাজ হারিয়েছি। আরও কিছু কাজ হারিয়েছি।”
এরপর একটু থেমে তিনি বলেন, “আমাদের সংস্কৃতিতে একটি নির্দিষ্ট ভাবমূর্তি বজায় রাখতে হয়। আপনি যদি কোনো ব্র্যান্ডের প্রতিনিধিত্ব করেন বা টেলিভিশনে কোনো চরিত্রে অভিনয় করেন, তবুও সেটি গুরুত্বপূর্ণ। তাই এটি আমাকে মানসিক ও ইমোশনের জায়গা থেকে অনেক ক্ষতি করেছে।”
তিনি আরও বলেন, এই অভিজ্ঞতার পর তিনি সব সময় সতর্ক থাকেন। আশপাশে কেউ তার ছবি গোপনে তুলছে কি না, সেটি নিয়ে ভাবতে থাকেন।
হেরা হুসেইনের মতে, সমাজ এখনও ভুল প্রশ্ন করছে।
তার মতে, তিনটি বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। একজন মানুষের কী ক্ষতি হয়েছে, ছবি ছড়ানোর পেছনে উদ্দেশ্য কী ছিল এবং তার সম্মতি ছিল কি না।
তার ভাষায়, “মূল বিষয় হলো সম্মান, মর্যাদা ও সম্মতি। এগুলোই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।”
কিন্তু প্রযুক্তি কোম্পানি ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো সেখানেই ব্যর্থ হচ্ছে বলে অভিযোগ তাদের।
মাহনুর যখন পাকিস্তানের জাতীয় সাইবার অপরাধ তদন্ত সংস্থার কাছে অভিযোগ করেন, তখন তাকে জানানো হয়, ছবিগুলো নগ্ন বা যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ নয় বলে সেগুলো তাদের আওতার বাইরে পড়ে।
মোবাইল সেবাদাতা কোম্পানির কাছেও সহায়তা চেয়েছেন তিনি।
সেখানে তাকে বলা হয়, অভিযুক্ত ব্যক্তি যে সিম ব্যবহার করেছেন, সেটি দেখাতে না পারলে কিছু করা সম্ভব নয়। অথচ সেই সিমও তার সাবেক স্বামী নিয়ে গিয়েছিলেন।
হোয়াটসঅ্যাপকেও অভিযোগ করেছিলেন তিনি।
তবে তার দাবি, প্ল্যাটফর্মটি জানিয়েছিল, এসব ছবি তাদের নীতিমালা লঙ্ঘন করে না।
এ বিষয়ে সরাসরি মন্তব্য না করলেও বিবিসিকে হোয়াটসঅ্যাপ জানিয়েছে, তাদের নীতিমালায় কোন আচরণ অনুমোদিত আর কোনটি নয়, তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে।
চেইনের আরেকটি উদ্বেগ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা।
হেরা হুসেইনের মতে, অধিকাংশ প্রযুক্তি কোম্পানি এমন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করছে, যেগুলো মূলত নগ্নতা শনাক্ত করার জন্য প্রশিক্ষিত।
কিন্তু সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে ক্ষতিকর হতে পারে এমন ছবি শনাক্ত করা অনেক বেশি জটিল কাজ।
তিনি মনে করেন, ব্যবহারকারীদের প্রায়ই অনেক চেষ্টা করতে হয়, যাতে এআই নয় বরং কোনো মানুষ তার অভিযোগটি পর্যালোচনা করেন।

মানবিক তদারকিও কমে যাচ্ছে বলে আশঙ্কা রয়েছে।
খরচ কমাতে অনেক কোম্পানি স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার ওপর নির্ভরতা বাড়াচ্ছে এবং আঞ্চলিক বিশেষজ্ঞ দলগুলোকে ছোট করে ফেলছে।
চেইনের দাবি, বর্তমান ব্যবস্থায় প্ল্যাটফর্মগুলো আগে তদন্ত করে তারপর সিদ্ধন্ত নেয় ছবি তারা সরাবে কি না। তার মতে, বরং উল্টোটা হওয়া উচিত। অর্থাৎ, আগে সাময়িকভাবে কনটেন্ট সরিয়ে পরে তদন্ত করা উচিত।
হেরা হুসেইন বলেন, “প্রশ্ন হলো, আপনার ক্ষতি কতটা হবে?” জবাবে তিনি ২০১৭ সালের একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করেন।
সেখানে পাকিস্তানে বিয়ের অনুষ্ঠানে গান গাওয়া ও হাততালি দেওয়ার একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর তিন বোনকে হত্যা করা হয়। পরে তাদের তিনজন পুরুষ আত্মীয়কে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
আরেকটি বড় সমস্যা হলো, পুরো অভিযোগ প্রক্রিয়ার ভারও ভুক্তভোগীকেই বহন করতে হয়।
তাদের একের পর এক ছবি খুঁজে বের করতে হয়, বারবার দেখতে হয় এবং প্রতিটি আলাদাভাবে জমা দিতে হয়।
তিনি বলেন, “আপনাকে বারবার সেই মানসিক আঘাতের মধ্য দিয়ে যেতে হয়, তারপরও হয়তো কোনো উত্তরই পাবেন না।”
প্রতিবেদনটির উপসংহারও বেশ স্পষ্ট।
এই ক্ষতি শুধু ছবিতে থাকা নারীকে প্রভাবিত করে না। এর প্রভাব পড়ে পুরো পরিবারের ওপর।
বাবারা কর্মস্থলে যেতে সংকোচ বোধ করেন, বোনদের বিয়ে ভেঙে যায়, পুরো পরিবার সামাজিকভাবে নজরদারির মধ্যে পড়ে।
মাহনুরের ক্ষেত্রেও সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হয়েছে সম্পর্ক হারিয়ে।
এখন তার সাড়ে তিন বছরের মেয়ে খেয়াল করতে শুরু করেছে, ওপরতলায় থাকা আত্মীয়রা তার মার সঙ্গে আর আন্তরিকভাবে কথা বলেন না।
হেরা হুসেইনের ভাষায়, “ছবিভিত্তিক নির্যাতন নগ্ন ছবির চেয়ে অনেক বড় ও বিস্তৃত একটি বিষয়।”
তার মতে, এখানে একটি পদ্ধতিগত ব্যর্থতা রয়েছে।
তিনি বলছেন, পুলিশ, আদালত এবং প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মগুলো পক্ষ থেকে ভুক্তভোগীদের সহায়তায় আরও অনেক ভালো কাজ করার সুযোগ আছে।