Published : 09 Feb 2026, 10:36 AM
এবার কোটিপতি নন, বরং ইতিহাসের প্রথম ট্রিলিয়নিয়ার বা এক লাখ কোটি ডলারের মালিক হওয়ার দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে রয়েছেন ইলন মাস্ক।
আমেরিকান সংবাদমাধ্যম সিএনবিসি প্রতিবেদনে লিখেছে, এ অভাবনীয় সম্পদের মালিক হওয়ার পথে এখন মাস্কের গাড়ির চেয়ে রকেটই বেশি ভূমিকা রাখছে। বর্তমানে টেসলা সিইওর মোট সম্পদের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই আসছে তার মহাকাশ অভিযান কোম্পানি থেকে।
ফোর্বসের তথ্য অনুসারে, এ সপ্তাহেই বিশ্বের প্রথম ব্যক্তি হিসেবে ৮০ হাজার কোটি ডলারের মাইলফলক স্পর্শ করেছেন মাস্ক। বর্তমানে তার নিট সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৮৪ হাজার ৫০০ কোটি ডলার।
এখন বিশ্বের পরবর্তী শীর্ষ তিন ধনীর চেয়েও বেশি মাস্কের একার সম্পদ।এই তিনজনের মধ্যে রয়েছেন গুগলের প্রতিষ্ঠাতাদ্বয় ল্যারি পেইজ, সার্গেই ব্রিন ও মেটা প্রধান মার্ক জাকারবার্গ।
গত বছর মাস্কের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স’কে অধিগ্রহণ করেছে তারই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই স্টার্টআপ এক্সএআই। এ সপ্তাহে এক্সএআইকে অধিগ্রহণ করেছে মহাকাশ কোম্পানি স্পেসএক্স। এরপরই মাস্কের সম্পদ অভাবনীয় হারে বেড়েছে। এ দুই কোম্পানির একত্রীকরণের ফলে নতুন এ সত্তার বাজারমূল্য দাঁড়িয়েছে প্রায় ১.২৫ ট্রিলিয়ন ডলার।
একীভূত এ কোম্পানিতে মাস্কের মালিকানা প্রায় ৪৩ শতাংশ ধরা হচ্ছে। ফলে তার অংশের মূল্য দাঁড়াবে ৫৩০ হাজার কোটি ডলারেরও বেশি, যা তার ভাগ্যের এক অভাবনীয় ও দ্রুত পরিবর্তন।
বর্তমানে মাস্কের অগ্রাধিকারও সম্ভবত টেসলার চেয়ে স্পেসএক্সের দিকেই বেশি ঝুঁকছে। নিজেদের সর্বশেষ নথিতে এ বাস্তবতাকে স্বীকার করে নিয়েছে মার্কিন বিদ্যুচ্চালিত গাড়ি বা ইভি নির্মাতা টেসলাও। সেখানে কোম্পানিটি উল্লেখ করেছে, “মাস্কের সম্পদের সিংহভাগই এখন তার অন্যান্য ব্যবসায়িক উদ্যোগ থেকে আসছে।”
গত বছর মাস্ক নিশ্চিত করেছিলেন, ২০২৬ সালে স্পেসএক্সকে শেয়ার বাজারে আনতে চান তিনি, যা কার্যকর হলে তার নগদ সম্পদের ক্ষেত্রে টেসলার গুরুত্ব আরও কমে যাবে। তবে এজন্য তাকে পাবলিক মার্কেটের বিনিয়োগকারীদের সমর্থন পেতে হবে। কারণ, তারা একইসঙ্গে প্রতিরক্ষা টুল ও স্যাটেলাইট ব্যবসার পাশাপাশি গুগল, ওপেনএআই ও অ্যানথ্রপিকের মতো প্রযুক্তি জায়ান্টদের সঙ্গে পাল্লা দেওয়া ব্যয়বহুল এআই মডেল ডেভেলপারের পেছনে অর্থ ঢালতে চাইবেন কি না তা নিয়ে সংশয় থাকতে পারে।
‘ফেডস্কাউট’-এর গবেষণা অনুসারে, এ পর্যন্ত মার্কিন সরকারের বিভিন্ন চুক্তি থেকে ২ হাজার কোটি ডলারেরও বেশি আয় করেছে স্পেসএক্স। সামনে আরও একাধিক বড় চুক্তির সম্ভাবনাও রয়েছে। এ অধিগ্রহণকে ‘অরবিটাল ডেটা সেন্টার’ তৈরির পরবর্তী ধাপ হিসেবে বর্ণনা করেছেন মাস্ক।
‘রেইনমেকার সিকিউরিটিজ’-এর ম্যানেজিং ডিরেক্টর গ্রেগ মার্টিন বলেছেন, “একজন সাধারণ স্পেসএক্স শেয়ারহোল্ডার হিসেবে এ বিষয়টি আপনার কাছে কিছুটা অস্পষ্ট মনে হতে পারে। তবে সুযোগের ক্ষেত্রটি এখন অনেক বড় হয়েছে। বড় পুঁজিবাজারে প্রবেশের সিদ্ধান্তটি যৌক্তিক, বিশেষ করে এক্সএআইয়ের জন্য, যার প্রচুর পরিমাণে পুঁজির প্রয়োজন।”
তবে, বর্তমানে বেশ চাপের মুখে রয়েছে এক্সএআই। ইউরোপ, এশিয়া, অস্ট্রেলিয়া ও ক্যালিফোর্নিয়ার কর্তৃপক্ষ কোম্পানিটির বিরুদ্ধে তদন্ত করছে। কোম্পানিটির এআই টুল গ্রক ব্যবহার করে শিশু ও নারীদের যেসব ছবি তৈরি হয়েছে, তাতে আপত্তিকর ডিপফেইক’ শ্রেণির ছবি রয়েছে।
মাস্কের স্পেসএক্স ও এক্সএআইয়ের এ একত্রীকরণ কোনো আইনি বা নিয়ন্ত্রক সংস্থার পর্যালোচনার মুখে পড়বে কি না তা এখনও নিশ্চিত নয়। তবে এ সপ্তাহে পেন্টাগনকে স্পেসএক্সের ওপর তদন্তের আহ্বান জানিয়েছেন ডেমোক্র্যাটিক সেনেটররা।
তাদের দুশ্চিন্তার বিষয় হচ্ছে, রকেট নির্মাতা এ কোম্পানিতে যদি চীনের অপ্রকাশিত বিনিয়োগ থাকে, তবে তা যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকির হবে।
এত কিছুর পরেও মাস্কের জন্য টেসলার দিকে মনোযোগ ধরে রাখার বড় কারণ রয়েছে। গত বছরের শেষদিকে মাস্কের জন্য ১ ট্রিলিয়ন ডলারের বেতন প্যাকেজ অনুমোদন করেছেন টেসলার বিরিয়োগকারীরা।
আগামী ১০ বছরে টেসলা যদি নির্দিষ্ট কিছু লক্ষ্যমাত্রা, যেমন বাজারমূল্য বৃদ্ধি ও উৎপাদন লক্ষ্য পূরণ করতে পারে তবে ১২টি ধাপে এ মোটা অংকের অর্থ পাবেন মাস্ক।
এসব প্যাকেজের প্রথম ধাপের শেয়ার পেতে হলে টেসলার বাজারমূল্যকে ২ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে হবে, যা বর্তমান বাজারমূল্যের চেয়ে প্রায় ৪৬ হাজার কোটি ডলার বেশি।
নথিতে টেসলা বলেছে, এ বেতন কাঠামোর মূল উদ্দেশ্য মাস্ককে টেসলাতেই ধরে রাখা, যাতে ‘তিনি তার অন্যান্য ব্যবসাকে টেসলার চেয়ে বেশি গুরুত্ব না দেন’।

‘কলম্বিয়া ল স্কুল’-এর অধ্যাপক এবং করপোরেট ও সিকিউরিটিজ আইন বিশেষজ্ঞ ডরোথি লুন্ড বলেছেন, এ ধরনের কৌশল কাজ নাও করতে পারে।
“মাস্ক এখন প্রতিটি কোম্পানির সঙ্গে আলাদাভাবে বেতন প্যাকেজ নিয়ে আলোচনা করছেন। প্রতিটি বোর্ডই তাকে বড় অংকের আর্থিক সুবিধার লোভ দেখিয়ে নিজেদের দিকে টেনে রাখতে চাইছে। স্পেসএক্স বা এক্সএআই যদি তাকে আরও বেশি অর্থ বা কোম্পানির বড় অংশের মালিকানা দেয় তবে টেসলার সেই ১ ট্রিলিয়ন ডলারের প্যাকেজটির আকর্ষণ তার কাছে কমে যেতে পারে।”
মার্কিন ‘ফেডারেল কমিউনিকেশনস কমিশন’ বা এফসিসি’র তথ্য অনুসারে, এক্সএআই অধিগ্রহণের আগে স্পেসএক্সে মাস্কের মালিকানা ছিল প্রায় ৪২ শতাংশ এবং তার হাতে ছিল ৮০ শতাংশ ভোটিং পাওয়ার বা সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা। অন্যদিকে, পাবলিক ফাইলিং অনুসারে, টেসলায় তার শেয়ারের পরিমাণ কেবল ১১ থেকে ১৫ শতাংশের মধ্যে।
টেসলার বাজারমূল্য ও মূল গাড়ি বিক্রি উভয়ই এখন নীচের দিকে। কোম্পানিটির দীর্ঘদিনের প্রতিশ্রুত ‘রোবোট্যাক্সি’ ও ‘হিউম্যানয়েড রোবট’ এখনও তৈরির পর্যায়েই রয়েছে। এসবের প্রভাবে এ বছর টেসলার শেয়ারের দাম প্রায় ৯ শতাংশ কমেছে।
স্পেসএক্সে মাস্কের মালিকানার হিসাব অনুসারে, টেসলার শেয়ারের দাম যদি একই জায়গায় থাকে তবে মাস্ককে বিশ্বের প্রথম ‘ট্রিলিয়নিয়ার’ হতে হলে তার রকেট ও এআই কোম্পানির বাজারমূল্য অন্তত ১.৬ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে হবে।
বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান ‘গার্বার কাওয়াসাকি’র সিইও রস গার্বার বাজি ধরে বলছেন, মাস্ক কখনোই স্পেসএক্সকে একটি আলাদা কোম্পানি হিসেবে শেয়ার বাজারে আনবেন না, বরং ভবিষ্যতে স্পেসএক্স ও টেসলাকে একীভূত করে দিতে পারেন মাস্ক।
গার্বার ধারণা করছেন, বড় আকারের এ নতুন কোম্পানিটি নিউইয়র্ক স্টক এক্সচেঞ্জে ‘এক্স’ প্রতীকে তালিকাভুক্ত হবে, যা একসময় ‘ইউ.এস. স্টিল’ কোম্পানির ছিল।
দীর্ঘদিন ধরে টেসলার একজন বিনিয়োগকারী ও বর্তমানে স্পেসএক্সেরও শেয়ারহোল্ডার গার্বার। ২০২২ সালে টুইটার কেনার সময় গার্বারের প্রতিষ্ঠান মাস্ককে অর্থায়ন করেছিল। মাস্ক পরবর্তীতে টুইটারের নাম বদলে ‘এক্স’ রাখেন। গত বছর এ প্ল্যাটফর্মটিকে এক্সএআইয়ের সঙ্গে একীভূত করেন মাস্ক।
গার্বার বলেছেন, নিজের পুরো ব্যবসায়িক সাম্রাজ্যকে এক ছাতার নিচে নিয়ে আসা মাস্কের জন্য বুদ্ধিমানের কাজ হবে। এতে মাস্কের সেই পুরানো স্বপ্ন, অর্থাৎ ‘এক্স’ ব্র্যান্ডের অধীনে বড় কোম্পানি চালানোর স্বপ্ন পূরণ হবে।
এ সপ্তাহেই গুগলের মূল কোম্পানি অ্যালফাবেট ঘোষণা করেছে, এ বছর প্রযুক্তির উন্নয়নে ১৮ হাজার ৫০০ কোটি ডলার খরচ করবে তারা। গার্বার মনে করেন, এত বড় প্রতিদ্বন্দ্বীদের সঙ্গে পাল্লা দিতে হলে মাস্কের হাতেও প্রচুর নগদ অর্থ থাকতে হবে।
“এ একীভূত প্রতিষ্ঠানটির জন্য বাজার থেকে অর্থ তোলা বা ঋণ নেওয়া অনেক সহজ হবে। এর বাইরে মাস্ক কীভাবেই বা এআই দুনিয়ায় একজন বড় খেলোয়াড় হিসেবে টিকে থাকার লড়াই করবেন?”
এসব বিষয়ে সিএনবিসির মন্তব্যের অনুরোধ সাড়া দেননি মাস্ক।