Published : 25 Aug 2025, 06:05 PM
চাঁদের মাটিতে নভোচারীরা শেষবার পা রাখার পঞ্চাশ বছরেরও বেশি সময় পেরিয়ে গিয়েছে। তবু আজও নতুন নতুন বিস্ময়ের দুয়ার খুলে দিয়ে আমাদেরকে চমকপ্রদ তথ্য দিয়ে চলেছে অ্যাপোলো ১৭ মিশন থেকে পাওয়া চাঁদের বিভিন্ন নমুনা।
অ্যাপোলো ১৭ মিশনের সময় আনা চাঁদের পাথরের একটি নমুনা ৫০ বছর পর প্রথমবারের মতো খুলেছেন বিজ্ঞানীরা। তাদের দাবি, এর ভেতরেই লুকিয়ে ছিল চাঁদের অন্যতম রহস্যময় বৈশিষ্ট্য ‘লাইট ম্যান্টল’-এর গল্প।
‘লাইট ম্যান্টল’ হচ্ছে চাঁদের পৃষ্ঠে পাঁচ কিলোমিটার দীর্ঘ উজ্জ্বল এক দাগ, যা ১৯৭২ সালে প্রথম দেখা যাওয়ার পর থেকেই বিজ্ঞানীদের মুগ্ধ করে চলেছে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে বিজ্ঞানভিত্তিক সাইট নোরিজ।
চাঁদের দক্ষিণ ম্যাসিফ পর্বতের নিচে অবস্থিত এ লাইট ম্যান্টলকে বিশাল আকারের এক ভূমিধসের অবশিষ্টাংশ হিসেবেই মনে করেন বিজ্ঞানীরা। তবে কী কারণে এমনটি ঘটেছিল তা এখনও অজানায় রয়ে গিয়েছে তাদের কাছে।
এটি কি কোনো গ্রহাণুর আঘাত না কি পাহাড় থেকে ধসে পড়া ধ্বংসাবশেষ? বা চাঁদের গভীরে তৈরি ভূমিকম্পের কার্যকলাপ? দীর্ঘদিন ধরে এমন সব প্রশ্ন ঘুরপাক খেয়েছে বিজ্ঞানীদের মাথায়।
অ্যাপোলো মিশনে চাঁদের এ অদ্ভুত গঠন থেকে আনা পাথরের নমুনা এতদিন সিল করে রাখা হয়েছিল। তবে এখন আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে অবশেষে সেই পাথর খুলে এর ভেতরের তথ্য ও গঠন নিয়ে নতুন করে গবেষণা করেছেন বিজ্ঞানীরা।
নতুন করে খোলা নমুনাটি বিজ্ঞানীদেরকে অনেক কাছ থেকে দেখার সুযোগ দিচ্ছে, লাখ লাখ বছর আগে চাঁদে ভূমিধস কীভাবে ঘটেছিল। পৃথিবী, মঙ্গল ও এখন চাঁদের ভূমিধস নিয়ে কাজ করেন ভূতত্ত্ববিদ ড. জুলিয়া ম্যাগনারিনি। এ গবেষণায় তিনিই নেতৃত্ব দিয়েছেন।
গবেষণা দলের সহকর্মীরা বলছেন, এসব প্রাচীন ঘটনা কেবল চাঁদের বিজ্ঞানই নয়, বরং নাসার আর্টেমিস প্রোগ্রামের মাধ্যমে চাঁদে আবার নভোচারীদের ফিরিয়ে নেওয়ার জন্যও ভবিষ্যতে তাদের প্রস্তুত করতে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেবে।
ম্যাগনারিনি বলেছেন, “এ গবেষণাটি অ্যাপোলো মিশনের ঐতিহ্যকে ৫০ বছর পরও চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। ওই মিশন থেকে প্রাপ্ত বিভিন্ন নমুনা খুুব সাবধানে সংরক্ষণ করা হয়েছিল। যাতে আমরা এমন প্রযুক্তি ব্যবহার করে সেগুলো নিয়ে গবেষণা করতে পারি, যা ওই সময় আমাদের কাছে ছিল না। আমরা যা শিখেছি তা এরইমধ্যে আর্টেমিস মিশনে চাঁদের উপাদান সংগ্রহ ও ব্যবস্থাপনায় প্রভাব ফেলছে।”
অ্যাপোলো ১৭ মিশনটি চালু হয়েছিল ১৯৭২ সালে, যা ছিল অ্যাপোলো মিশনের শেষ অভিযান ও বৈজ্ঞানিক দিক থেকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মিশনগুলোর মধ্যে একটি। এ মিশনে কমান্ডার ইউজিন সার্নানের সঙ্গে অংশ নিয়েছিলেন চাঁদে হেঁটে যাওয়া প্রথম প্রশিক্ষিত ভূতাত্ত্বিক হ্যারিসন স্মিট।
চাঁদের দক্ষিণ ম্যাসিফ ও এর লাইট ম্যান্টল অংশকে টার্গেট করে চাঁদের মাটিতে গর্ত করে নমুনা সংগ্রহ করেছিলেন তারা এবং ভবিষ্যতের গবেষণার জন্য সেগুলো সিল করে রাখা হয়েছিল। মোটামুটি ১১০.৫ কিলোগ্রাম চাঁদের পাথর নিয়ে অ্যাপোলো ১৭ মিশনটি ফিরে আসে, যা অন্য যে কোনও মিশনের চেয়ে বেশি।
সেই সময়ে বিজ্ঞানীদের কাছে আজকের মতো উন্নত প্রযুক্তি ছিল না। বিভিন্ন স্ক্যানার ছিল অপ্রস্তুত ও এগুলোতে অনেক প্রশ্নের উত্তরও মিলত না। তবে বর্তমানে মেডিক্যাল গ্রেডের উন্নত ইমেজিং প্রযুক্তি যেমন মাইক্রো-সিটি স্ক্যান ব্যবহার করে পাথরের ভেতর একেবারে সূক্ষ্মভাবে দেখতে পারছেন গবেষকরা।
নতুনভাবে পরীক্ষা করা নমুনায় ‘ক্লাস্টস’ বা সেই পাথরের বিভিন্ন টুকরার ওপর মনোযোগ দিয়েছেন বিজ্ঞানীরা, যা ভূমিধসের সময় ঢাল থেকে ছিটকে পড়েছিল। এসব ছোট টুকরার ওপর সূক্ষ্ম এক ধূলার আবরণ ছিল।
গবেষকরা বলছেন, এসব ক্লাস্টকে ঢেকে থাকা সূক্ষ্ম ধূলা আসলে আশপাশের ধ্বংসাবশেষ থেকে নয়, বরং সেইসব ক্লাস্টস থেকেই এসেছে। এর মানে হচ্ছে, ভূমিধসের সময় এসব ক্লাস্টস ভেঙে গিয়েছিল। ফলে পুরো ভূমিধস যেন কঠোর মাটি বা পাথরের ভেঙে পড়ার বদলে তরলের মতো মসৃণভাবে প্রবাহিত হয়েছিল, যা গবেষকদের বুঝতে সাহায্য করছে, ভূমিধসের গতিবিধি কেমন ছিল।
তবে এখনও নিশ্চিত নয় এ ভূমিধসের শুরু কী কারণে হয়েছিল। গবেষকরা বলছেন, এর প্রধান কারণ হতে পারে চাঁদে ‘টাইচো’ নামের গর্তের তৈরি, যা তৈরি হওয়ার সময় শক্তি ও ধাক্কার প্রভাব হয়ত ওই ভূমিধসের কারণ হয়ে থাকতে পারে।
টাইচো ক্রেটার তৈরির সময় তা চাঁদের আশপাশে প্রচুর পরিমাণে ধ্বংসাবশেষ ছড়িয়ে দিয়েছিল। বিজ্ঞানীদের ধারণা, ওই ছিটকে যাওয়া কিছু বস্তু চাঁদের দক্ষিণ ম্যাসিফে গিয়ে আঘাত করে ফলে সেখান থেকেই ভূমিধস শুরু হয়, যেটিকে আজ আমরা ‘লাইট ম্যান্টল’ হিসেবেই দেখি।
টাইচো ক্রেটার থেকে দক্ষিণ মাসিফের দিকে ছড়িয়ে থাকা ছোট ছোট গর্ত বা সেকেন্ডারি ক্রেটার এই ধারণাকে সমর্থন করে। তবে বিষয়টি নিশ্চিতভাবে জানতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
এ গবেষণার ফলাফল প্রকাশ পেয়েছে বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল ‘জার্নাল অফ জিওফিজিক্যাল রিসার্চ: প্ল্যানেটস’-এ, যা অ্যাপোলো যুগের পরিকল্পনাকারীদের দূরদর্শিতাকেই তুলে ধরেছে।
ম্যাগনারিনি বলেছেন, “আমরা প্রায়ই অ্যাপোলো মিশনকে কেবল অতীতের এক অধ্যায় বা ইতিহাস হিসেবেই দেখি। তবে সেখান থেকে আনা বৈজ্ঞানিক বিভিন্ন নমুনা এখনও নতুন নতুন তথ্য দিচ্ছে, যেন এর বিজ্ঞান এখন জীবন্ত। এসব নমুনা একেকটা সময়ের ক্যাপসুল, আর প্রতিবার যখন আমরা একটি খুলি চাঁদের ইতিহাসের আরেকটি অজানা গল্প আমাদের সামনে উন্মোচিত হয়।”
এখনও পর্যন্ত চাঁদে শনাক্ত হওয়া একমাত্র দীর্ঘপথে বিস্তৃত ভূমিধস ‘লাইট ম্যান্টল’, যা এখনও বিজ্ঞানীদের জন্য বড় রহস্য। কারণ এমন গঠন কীভাবে তৈরি হয় তা বোঝা এখনো চ্যালেঞ্জ হিসেবেই রয়ে গিয়েছে তাদের কাছে।