Published : 29 Jun 2026, 11:29 AM
ইসরায়েলি এক প্রযুক্তি কোম্পানি রুশ গ্রাহকদের সঙ্গে তাদের চুক্তি বাতিলের পরও রাশিয়ান সরকার নিজের দেশের এক রাজনৈতিক কর্মীর ফোন হ্যাকিংয়ে এ ডিজিটাল ফরেনসিক প্ল্যাটফর্মটি ব্যবহার করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
‘ইউনিভার্সিটি অফ টরন্টো’র ‘সিটিজেন ল্যাব’-এর এক তদন্তে উঠে এসেছে, চুক্তি বাতিলের তিন মাস পরও রুশ মানবাধিকার কর্মী ও অলাভজনক সংগঠন ‘ওপেন রাশিয়া’র সাবেক পরিচালক আন্দ্রেই পিভোভারভের সম্মতি ছাড়াই তার ব্যক্তিগত ডিভাইস থেকে গোপন তথ্য হাতিয়ে নিতে ‘সেলিব্রাইট’ নামের ইসরায়েলি কোম্পানির প্রযুক্তি ব্যবহার করেছে রাশিয়া।
পিভোভারভ বলেছেন, তার কাছ থেকে জব্দ করা আইফোন ১২ ও ম্যাকবুক কোনোটিরই পাসওয়ার্ড তিনি রাশিয়া কর্তৃপক্ষকে দেননি।
প্রযুক্তি সংবাদের সাইট এনগ্যাজেট প্রতিবেদনে লিখেছে, ২০২১ সালে পিভোভারভের এসব ডিভাইস জব্দ করার দীর্ঘ দুই বছর পর ২০২৩ সালে কারাগারে সাজা ভোগের সময় তিনি তার আইনজীবীদের কাছে এগুলো হস্তান্তর করেছিলেন।
পরবর্তীতে তিনি মুক্তি পাওয়ার পর এসব ডিভাইস ফেরত পান এবং গত বছর প্রথম সিটিজেন ল্যাবের সঙ্গে যোগাযোগ করেন।
গবেষকরা বলেছেন, তাদের বিশ্লেষণে পিভোভারভের আইফোন ১২-এ ‘সেলিব্রাইটের ফরেনসিক টুলস ব্যবহারের স্পষ্ট চিহ্ন’ মিলেছে। এ হ্যাকিংয়ের ঘটনাটি ২০২১ সালের ১৭ জুনের কাছাকাছি সময়ে ঘটেছিল। এ সময় ফোনটি রাশিয়ান সরকারের হেফাজতে ছিল।
সিটিজেন ল্যাব বলেছে, তাদের অনুসন্ধানের এসব তথ্য রাশিয়ান কর্তৃপক্ষের প্রকাশিত এক সরকারি নথির মাধ্যমেও প্রমাণিত হয়েছে।
‘ফরেনসিক এক্সপার্ট রিপোর্ট নাম্বার ১২৬৯-১৭’ শিরোনামে রাশিয়ার এক সরকারি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সেলিব্রাইটের ‘ইউএফইডি ফিজিক্যাল অ্যানালাইজার’ ও ‘ইউএফইডি ফোরপিসি’ টুলকিট ব্যবহৃত হয়েছিল। এসব টুলের মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের ডিভাইস থেকে ডেটা বের করে বিশ্লেষণ করা যায়।
অভিযোগ রয়েছে, পিভোভারভের বিরুদ্ধে আইনি মামলায় প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করার মতো তথ্য হাতিয়ে নিতে তার হোয়াটসঅ্যাপ, টেলিগ্রাম ও ভাইবার সবকটি অ্যাপেই প্রবেশ করেছিল রাশিয়া কর্তৃপক্ষ।
‘সিটিজেন ল্যাব’-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব ডিভাইসে তল্লাশি চালানোর সময় রুশ কর্তৃপক্ষ ‘ওপেন রাশিয়া সিভিক মুভমেন্ট’ ও অন্যান্য রাজনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত বিভিন্ন শব্দ ব্যবহার করেছিল।
এ ছাড়া তারা মিখাইল খোদোরকোভস্কির মতো বিরোধী দলীয় নেতাদের নামও অনুসন্ধান করেছিল, যিনি পিভোভারভের কাজ করা সেই গণতন্ত্রপন্থী সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা।
সিটিজেন ল্যাবের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, পিভোভারভের ম্যাকবুকটি এনক্রিপ্ট করা থাকায় সেটিতে প্রবেশের ক্ষেত্রে রাশিয়ান সরকার তেমন একটা সফল হতে পারেনি।
গবেষকদের দাবি, যে দিনটিতে তারা আইফোনটি হ্যাকিংয়ে সফল হয়েছিল ঠিক সেই একই দিনে ম্যাকবুকটিতে লগইনের বেশ কিছু ব্যর্থ চেষ্টার প্রমাণ তাদের হাতে রয়েছে।
অন্যদিকে, সেলিব্রাইটের ভাষ্য, তারা বিশ্বের ১৫০টি দেশের ৬০ হাজারেরও বেশি সংগঠনকে ‘এন্ড-টু-এন্ড ডিজিটাল ফরেনসিক, তদন্ত ও ইন্টেলিজেন্স সলিউশন’ সরবরাহ করে থাকে। ইসরায়েলের পেতাহ তিকভায় কোম্পানিটির প্রধান কার্যালয় অবস্থিত। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রেও তাদের আরেকটি বড় অফিস রয়েছে।
এদিকে, সিটিজেন ল্যাব বলেছে, সেলিব্রাইটের বিরুদ্ধে ‘অ্যাক্টিভিস্ট, সাংবাদিক ও ভিন্নমতালম্বীদের ওপর নির্যাতন চালানো সরকারের কাছে প্রযুক্তি বিক্রির সুদীর্ঘ ও প্রমাণিত ইতিহাস’ রয়েছে।
নিজেদের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে সেলিব্রাইট দাবি করেছে, তারা ‘আইনগতভাবে অনুমোদিত ডিজিটাল তদন্তের বিভিন্ন জটিলতা সমাধান’ করতে পারদর্শী এবং ‘অপরাধীদের দোষী সাব্যস্ত করতে’ সাহায্য করে।
বিরোধীদের দমনে এ প্রযুক্তির অপব্যবহারের অভিযোগ ওঠার পর ২০২১ সালের মার্চে রাশিয়ান তদন্ত কমিটির সঙ্গে নিজেদের চুক্তি বাতিল করে সেলিব্রাইট।
কোম্পানিটির দাবি ছিল, সম্পর্ক ছিন্ন করার পরপরই রাশিয়ান কর্তৃপক্ষ তাদের কাছ থেকে সব ধরনের আপডেট প্রাপ্তি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছে। তবে এ চুক্তি বাতিলের ঠিক তিন মাস পরও তারা পিভোভারভের ডিভাইসে সফলভাবে প্রবেশ করতে পেরেছিল।
সিটিজেন ল্যাব সেলিব্রাইটের বিরুদ্ধে ‘মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকার করপোরেট দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার’ অভিযোগ এনেছে।
তারা বলেছে, এমন অনেক প্রমাণ রয়েছে, যার থেকে ইঙ্গিত মেলে, মানবাধিকার লঙ্ঘনে এ প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারে, এমন সব সরকারের কাছে পণ্য বিক্রি করতে কোম্পানিটি বেশ ‘স্বাচ্ছন্দ্য বোধ’ করে।
পরবর্তীতে ফোর্বসের সঙ্গে শেয়ার করা ও সিটিজেন ল্যাবকে পাঠানো এক ইমেইলে সেলিব্রাইটের চিফ মার্কেটিং অফিসার ডেভিড গি বলেছেন, ২০২১ সালের মার্চের পর রাশিয়ায় সেলিব্রাইটের প্ল্যাটফর্মের যে কোনো ব্যবহার ছিল ‘সম্পূর্ণ অননুমোদিত’।
“২০২১ সালের মার্চের আগে বিক্রি হওয়া সেলিব্রাইটের বিভিন্ন হার্ডওয়্যার এখনকার আধুনিক ডিভাইসগুলোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এবং এগুলো আমাদের কারিগরি সহায়তা, সম্মতি বা সেলিব্রাইটের কোনো আইনি অনুমোদন ছাড়াই সচল রয়েছে।”