Published : 06 Feb 2026, 02:15 PM
গর্ভপাত কোনো আনন্দের অভিজ্ঞতা নয়। বরং কখনও তা হয়ে ওঠে চরম বেদনাদায়ক। এতদিন পর্যন্ত ধারণা ছিল, গর্ভপাত কেবল বয়স বা আকস্মিক শারীরিক কোনো ত্রুটির ফলে ঘটে। তবে সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, অনেক ক্ষেত্রে গর্ভপাতের উৎস মায়ের নিজের জন্মের আগেই থাকতে পারে।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সাইট সায়েন্স অ্যালার্ট লিখেছে, গোটা বিশ্বেই গর্ভপাতের ঘটনা বেশ সাধারণ। পরিচিত বা শনাক্ত হওয়া গর্ভাবস্থাগুলোর মধ্যে প্রায় ১৫ শতাংশই গর্ভপাতের মাধ্যমে শেষ হয়। তবে প্রকৃত সংখ্যাটি সম্ভবত আরও বেশি। কারণ অনেক ক্ষেত্রে গর্ভধারণের বিষয়টি বোঝার আগেই গর্ভপাত ঘটে।
নতুন গবেষণায় ‘অ্যানিউপ্লয়ডি’ সংক্রান্ত বিভিন্ন জেনেটিক কারণ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য খুঁজে পেয়েছেন গবেষকরা। কোষে ক্রোমোজোমের সংখ্যার অস্বাভাবিকতাকে ‘অ্যানিউপ্লয়ডি’ বলে, যা গর্ভপাতের অন্যতম প্রধান কারণ।
গর্ভপাত বিভিন্ন কারণে হতে পারে। তবে ক্রোমোজোমের অস্বাভাবিকতা এর মধ্যে অন্যতম প্রধান কারণ। গর্ভাবস্থার প্রথম বা দ্বিতীয় ধাপে যতগুলো গর্ভপাতের ঘটনা ঘটে তার প্রায় অর্ধেকই ঘটে ভ্রূণে ক্রোমোজোমের সংখ্যা স্বাভাবিকের চেয়ে কম বা বেশি হওয়ার কারণে।
এ ‘অ্যানিউপ্লয়ডি’ বা ক্রোমোজোমের অস্বাভাবিকতার মূল কারণ খতিয়ে দেখতে প্রায় এক লাখ ৪০ হাজার আইভিএফ ভ্রূণের জেনেটিক তথ্য বিশ্লেষণ করেছেন গবেষকরা।
গবেষণায় উঠে এসেছে, কীভাবে সাধারণ কিছু জেনেটিক পরিবর্তন নির্দিষ্ট কিছু মা-বাবার ক্ষেত্রে গর্ভপাতের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে।
এ গবেষণার প্রধান লেখক ও ‘জনস হপকিন্স ইউনিভার্সিটি’র কম্পিউটেশনাল বায়োলজিস্ট রাজীব ম্যাককয় বলেছেন, “মানুষের মধ্যে ক্রোমোজোম ত্রুটির ঝুঁকি কেন তৈরি হয় তার আণবিক প্রক্রিয়া সম্পর্কে এ গবেষণাটি এখন পর্যন্ত সবচেয়ে স্পষ্ট প্রমাণ দিয়েছে।
“এসব তথ্য মানুষের বিকাশের একদম প্রাথমিক পর্যায় সম্পর্কে আমাদের ধারণাকে আরও গভীর করবে এবং ভবিষ্যতে প্রজনন জেনেটিক্স ও ফার্টিলিটি চিকিৎসার উন্নতির পথ খুলে দেবে।”
ক্রোমোজোমের অস্বাভাবিকতা সাধারণত ডিম্বাণু থেকেই তৈরি হয় ও মায়ের বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এর হারও বাড়তে থাকে। গবেষকরা বলেছেন, বয়স একটি জানা ঝুঁকির কারণ হওয়ার পরও অপর্যাপ্ত তথ্যের কারণে এর পেছনে থাকা আরও বিভিন্ন জেনেটিক কারণ বোঝার ক্ষেত্রে বাধা তৈরি হয়েছে।
এ সমস্যা সমাধানের জন্য বিজ্ঞানীদের গর্ভপাত হওয়ার আগের হাজার হাজার ভ্রূণের বিশাল পরিমাণ জেনেটিক তথ্যের পাশাপাশি তাদের জন্মদাতা মা-বাবার তথ্যও বিশ্লেষণ করেছেন গবেষকরা।
ম্যাককয় বলেছেন, “এ বৈশিষ্ট্যটি বা ক্রোমোজোম ত্রুটি সরাসরি বেঁচে থাকা ও বংশবৃদ্ধির সফলতার সঙ্গে জড়িত। ফলে বিবর্তন প্রক্রিয়ায় কেবলমাত্র সামান্য প্রভাব ফেলে এমন জেনেটিক পার্থক্যকেই মানুষের মধ্যে টিকে থাকার সুযোগ দেয়। আর এসব সামান্য প্রভাব শনাক্তের জন্য বড় পরিসরের নমুনা প্রয়োজন।”
কোনো নির্দিষ্ট ধরন বা প্যাটার্ন খুঁজে পাওয়ার ক্ষেত্রে আইভিএফ ভ্রূণের প্রি-ইমপ্লান্টেশন জেনেটিক টেস্টিং থেকে পাওয়া ক্লিনিক্যাল তথ্য ব্যবহার করেছেন গবেষকরা। ২২ হাজার ৮৫০ জন মা-বাবার সেট থেকে পাওয়া মোট এক লাখ ৩৯ হাজার ৪১৬টি ভ্রূণ বিশ্লেষণ করেছেন তারা।
৪১ হাজার ৪৮০টি বিভিন্ন ভ্রূণের মধ্যে ৯২ হাজার ৪৮৫টি অস্বাভাবিক ক্রোমোজোম শনাক্ত করতে পেরেছেন গবেষকরা।
ম্যাককয় বলেছেন, “গবেষণার মূল শক্তি হচ্ছে বড় আকারের নমুনা। এসব নমুনার মাধ্যমে মায়ের ডিএনএ-এর সঙ্গে এমন ভ্রূণ তৈরির ঝুঁকির মধ্যকার প্রথম ও সুস্পষ্ট বিভিন্ন সম্পর্কের খোঁজ পেয়েছি আমরা, যেসব ভ্রূণ বেঁচে থাকতে পারে না।”
এসব সম্পর্কের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী প্রভাব মিলেছে সেইসব জিনের ক্ষেত্রে যেগুলো ডিম্বাণু কোষের ‘মায়োসিস’ প্রক্রিয়ার সময় ক্রোমোজোমগুলোর জোড় গঠন, পুনর্গঠন ও একত্র হওয়ার পদ্ধতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে সাহায্য করে।
গবেষণায় উঠে এসেছে, ‘এসএমসি১বি’ জিনের বিশেষ একটি ধরন এমন এক প্রোটিন তৈরি করে, যা মায়োসিস বিভাজনের সময় বিভিন্ন ক্রোমোজোমকে একত্রে ধরে রাখতে সাহায্য করে। এ জিনের সঙ্গে ক্রোমোজোমের ‘ক্রসিং ওভার’ বা আদান-প্রদান কমে যাওয়ার এবং মায়ের মায়োসিস প্রক্রিয়ায় ক্রোমোজোমের অস্বাভাবিকতা বেড়ে যাওয়ার সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
এ বিশ্লেষণটি ‘ক্রসিং ওভার রিকম্বিনেশন’ বা ডিএনএ-এর পুনর্গঠনের সঙ্গে জড়িত আরও বেশ কিছু জিনের মধ্যকার সম্পর্কও তুলে ধরেছে, যার মধ্যে রয়েছে ‘সি১৪অরফ৩৯’, ‘সিসিএনবি১আইপি১’ ও ‘আরএনএফ২১২’।
ম্যাককয় বলেছেন, “আমাদের গবেষণায় মানুষের মধ্যে যেসব জিন উঠে এসেছে, ঠিক সেইসব জিনকেই জীববিজ্ঞানীরা গত কয়েক দশক ধরে ইঁদুর ও কৃমির মতো প্রাণীর ওপর গবেষণা করে ক্রোমোজোমের পুনর্গঠন ও জোড়া লেগে থাকার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।”
নারীদের দেহে ‘মায়োসিস’ প্রক্রিয়াটি মূলত ভ্রূণ অবস্থাতেই শুরু হয়। এ সময় ক্রোমোজোমগুলো জোড় বাঁধে ও ডিএনএ আদান-প্রদান করে। এরপর এ প্রক্রিয়াটি বছরের পর বছর বন্ধ থাকে ও জীবনের পরবর্তী সময়ে ওভুলেশন বা ডিম্বস্ফোটন ও নিষেকের সময় পুনরায় সক্রিয় হয়।
এ মধ্যবর্তী সময়ে জেনেটিক পরিবর্তনের কারণে সমস্যা দেখা দিতে পারে। যার ফলে ক্রোমোজোম খুব সহজেই একে অপরের থেকে আলাদা হয়ে যায়। ফলে যখন মায়োসিস প্রক্রিয়াটি আবার শুরু হয় তখন ক্রোমোজোমের সংখ্যাগত অস্বাভাবিকতা বা ‘অ্যানিউপ্লয়ডি’ হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
ম্যাককয় বলেছেন, “আমাদের গবেষণার এসব ফলাফল প্রমাণ করে, মায়োসিস প্রক্রিয়ার এসব বংশগত পার্থক্যই মূলত বিভিন্ন ব্যক্তির মধ্যে ক্রোমোজোমের অস্বাভাবিকতা ও গর্ভপাতের ঝুঁকির তারতম্য তৈরি করে।”
তবে গবেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, এরপরও কারো ব্যক্তিগত গর্ভপাতের ঝুঁকি আগে থেকে বলা বা অনুমান করা কঠিন। কারণ জিনের বাইরেও মায়ের বয়স ও পরিবেশগত প্রভাবের মতো আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এখানে জড়িয়ে থাকে।
গবেষণাটি প্রকাশ পেয়েছে বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল ‘নেচার’-এ।