Published : 21 Jan 2026, 01:12 PM
মানুষের মন ও শরীরের প্রাকৃতিক সুরক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে গভীর এক সংযোগ খুঁজে পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা, যেখানে ইতিবাচক চিন্তা আমাদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়িয়ে দিতে পারে বলে দাবি তাদের।
গবেষকরা বলছেন, যারা ইতিবাচক চিন্তার মাধ্যমে মস্তিষ্কের ‘রিওয়ার্ড সিস্টেম’-এর এক বিশেষ অংশকে সক্রিয় রাখেন তাদের শরীরে টিকার কার্যকারিতা বেশি হয়। সাধারণ মানুষের তুলনায় তাদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি অ্যান্টিবডি তৈরি করতে পারে।
তবে এর মানে এই নয় যে, কেবল আশাবাদী হলেই সব রোগ সেরে যাবে। গবেষণা থেকে কেবল ইঙ্গিত মিলেছে, সঠিক মানসিক কৌশল ব্যবহার করে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাকে শক্তিশালী করা সম্ভব, যা শরীরের সংক্রমণ ঠেকানো, টিউমার বা ক্যান্সারের বিরুদ্ধে লড়াইয়েও সাহায্য করতে পারে।
‘তেল আবিব ইউনিভার্সিটি’র মনোরোগবিদ্যা ও নিউরোসায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক তালমা হেন্ডলার বলেছেন, “মানুষের ওপর এ গবেষণাটিই প্রথম প্রমাণ, যা সরাসরি কারণ হিসেবে কাজ করেছে। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, আপনি যদি আপনার মস্তিষ্কের রিওয়ার্ড সিস্টেম বা ভালো লাগার অংশটিকে ব্যবহার করতে শেখেন তবে আপনার রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতার ইমিউনাইজেশন কার্যকারিতা বেড়ে যাবে।”
ব্রিটিশ দৈনিক পত্রিকা গার্ডিয়ান লিখেছে, আগের বিভিন্ন গবেষণা থেকেও ইঙ্গিত মিলেছিল, ইতিবাচক প্রত্যাশা রোগীদের সুস্থ হতে সাহায্য করে, যা সাধারণত ‘প্লাসবো ইফেক্ট’ নামে পরিচিত। প্রাণীদের ওপর করা পরীক্ষায় দেখা গেছে, মস্তিষ্কের এ বিশেষ অংশটি সক্রিয় করলে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে। তবে মানুষের ক্ষেত্রে বিষয়টি এত দিন স্পষ্ট ছিল না।
এ গবেষণায় কিছু সুস্থ স্বেচ্ছাসেবক অংশ নিয়েছিলেন। তাদের মস্তিষ্ককে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শেখানো হয়েছে কীভাবে বিভিন্ন মানসিক কৌশল ব্যবহার করে মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট অংশকে সক্রিয় রাখা যায়। তাদের মস্তিষ্কের কার্যকলাপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নম্বর দেওয়া হত, যা দেখে অংশগ্রহণকারীরা বুঝতে পারতেন তাদের চেষ্টা কতটা সফল হচ্ছে।
চারটি প্রশিক্ষণ সেশনের পর স্বেচ্ছাসেবকদের হেপাটাইটিস-বি টিকা দেওয়া হয়। এর দুই ও চার সপ্তাহ পর তাদের রক্ত পরীক্ষা করে গবেষকরা দেখেছেন, তাদের শরীরে হেপাটাইটিসের বিরুদ্ধে কতটা অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছে।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, মস্তিষ্কের রিওয়ার্ড সিস্টেমের ‘ভেন্ট্রাল টেগমেন্টাল এরিয়া’কে যারা সক্রিয় করতে পেরেছেন তাদের শরীরে টিকার কার্যকারিতা বেশি হয়েছে। যারা ইতিবাচক প্রত্যাশা বা ভালো কিছু ঘটার কল্পনার মাধ্যমে নিজেদের মনকে চাঙ্গা রেখেছেন এক্ষেত্রে তারাই বেশি সফল হয়েছেন।
এ পদ্ধতিটি রোগীদের রোগপ্রতিরোধ সক্ষমতা বাড়াতে কার্যকর হতে পারে। তবে এর প্রকৃত চিকিৎসা সুবিধা প্রমাণের জন্য আরও বড় পরিসরে পরীক্ষার প্রয়োজন।
এ গবেষণার সহ-লেখক ড. তামার কোরেন বলেছেন, তাদের দল এখন পরীক্ষা করে দেখছে রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার অন্যান্য অংশেও এর প্রভাব পড়ে কি না।
গবেষণার অন্যতম প্রধান লেখক ড. নিৎজান লুবিয়ানিকার বলেছেন, “আমরা যে পদ্ধতিটি পরীক্ষা করেছি তা কেবল এক পরিপূরক উপায় হিসেবে ব্যবহারের জন্য, যা টিকার কার্যকারিতা বাড়াতে সাহায্য করতে পারে। আমাদের গবেষণা কোনোভাবেই মূল টিকা বা প্রচলিত চিকিৎসা ব্যবস্থার বিকল্প নয় ও সেভাবে তৈরিও হয়নি।”
‘ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি সেন্ট লুইস’-এর প্যাথলজি ও ইমিউনোলজি বিষয়ের অধ্যাপক জোনাথন কিপনিসও এ বিষয়ে একমত পোষণ করে বলেছেন, “আমাদের গবেষণার পদ্ধতিটি চিকিৎসার ক্ষেত্রে কতটা গুরুত্বপূর্ণ হবে সে সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এখনও আসেনি।
“বড় কোনো ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে যদি দেখা যায়, এর ইতিবাচক প্রভাব চিকিৎসায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে তবে তা সম্ভবত প্রচলিত বিভিন্ন চিকিৎসা পদ্ধতির সহায়ক হিসেবে ব্যবহৃত হবে।”
গবেষণাটি প্রকাশ পেয়েছে বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল ‘নেচার মেডিসিন’-এ।