১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

সন্তান প্রসবের সময় বন্ধুদের সাহায্য পায় মা তিমি: গবেষণা

জন্মদানের সময় মা তিমিটিকে অন্য স্ত্রী তিমিরা আশপাশ থেকে ঘিরে রেখেছিল। এরপর তিমিদের দল পর্যায়ক্রমে বাচ্চাটিকে পানির উপরে তুলে ধরছিল, যাতে সে শ্বাস নিতে পারে।

সন্তান প্রসবের সময় বন্ধুদের সাহায্য পায় মা তিমি: গবেষণা
তিমির লেজ দেখা দেওয়া থেকে শুরু করে বাচ্চাটির জন্ম হওয়া পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হতে সময় লেগেছিল প্রায় ৩৪ মিনিট। ছবি: এআই দিয়ে বানানো

প্রযুক্তি ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 06 Apr 2026, 01:10 PM

Updated : 26 Aug 2026, 03:18 PM

মা তিমির সন্তান জন্মদানের এক বিরল ও অসাধারণ দৃশ্য ক্যামেরাবন্দি করেছেন বিজ্ঞানীরা, যেখানে দেখা গেছে, কেবল পরিবার নয়, বরং অন্যান্য বন্ধু তিমি মিলে কীভাবে নবজাতক ও মায়ের সুরক্ষায় একজোট হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে।

সামুদ্রিক জীববিজ্ঞানীরা বলছেন, মা তিমিটি সন্তান জন্ম দেওয়ার সময় বেশ কয়েকটি পূর্ণবয়স্ক স্ত্রী তিমি একে আশপাশ থেকে ঘিরে রেখেছিল। এরপর এরা সবাই মিলে নবজাতক বাচ্চাটিকে পানির উপরে তুলে ধরে, যাতে সে প্রথমবারের মতো শ্বাস নিতে পারে।

রয়টার্স লিখেছে, ক্যারিবীয় সাগরের পূর্ব দিকে ডমিনিকা উপকূলের কাছে এমন দৃশ্যের দেখা মিলেছে।

গবেষকরা বলছেন, বন্য পরিবেশে ‘স্পার্ম হোয়েল’ বা অন্য কোনো সিটাসিয়ান, যেমন তিমি, ডলফিন ও পরপয়েস প্রাণী প্রজাতির জন্মদানের এটিই এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বিস্তারিত বর্ণনা।

স্পার্ম হোয়েল হচ্ছে দাঁতওয়ালা তিমিদের মধ্যে সবচেয়ে বড় এবং এদের মস্তিষ্ক পৃথিবীর যে কোনো প্রাণীর তুলনায় বড়, যার ওজন প্রায় ৮ কেজি।

গবেষকরা এখানে সুশৃঙ্খল এক সহযোগিতার দৃশ্য দেখতে পেয়েছেন। জন্মদানের সময় সেখানে মোট ১১টি তিমি উপস্থিত ছিল, যার মধ্যে ছিল মা তিমিটিসহ ১০টি স্ত্রী তিমি ও একটি কিশোর পুরুষ তিমি, যেটি তদারকির ভূমিকা নিয়েছে। এরা সবাই মিলে নবজাতক বাচ্চাটির নিরাপত্তা নিশ্চিতে সাহায্য করেছে।

‘প্রজেক্ট সিএটিআই’ নামের গবেষণা সংগঠনের বিজ্ঞানীরা ২০২৩ সালের ৮ জুলাই ড্রোন ভিডিও, পানির নিচের অডিও এবং জাহাজ থেকে তোলা ছবির মাধ্যমে এ পুরো ঘটনাটি রেকর্ড করেছেন।

তিমির লেজ দেখা দেওয়া থেকে শুরু করে বাচ্চাটির জন্ম হওয়া পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হতে সময় লেগেছিল প্রায় ৩৪ মিনিট।

জন্মদানের সময় প্রায় ৩৩ ফুট লম্বা মা তিমিটিকে অন্য পূর্ণবয়স্ক স্ত্রী তিমিরা আশপাশ থেকে ঘিরে রেখেছিল। এরপর তিমিদের আলাদা আলাদা দল পর্যায়ক্রমে নবজাতকটিকে পানির উপরে তুলে ধরছিল যাতে সে শ্বাস নিতে পারে।

গবেষণার এসব ফলাফল বৃহস্পতিবার প্রকাশ পেয়েছে ‘সায়েন্স’ ও ‘সায়েন্টিফিক রিপোর্টস’ নামের দুটি বিজ্ঞান সাময়িকীতে।

জন্মদানের সময় প্রায় ৩৩ ফুট লম্বা মা তিমিটিকে অন্য পূর্ণবয়স্ক স্ত্রী তিমিরা আশপাশ থেকে ঘিরে রেখেছিল। ছবি: রয়টার্স

জন্মদানের সময় প্রায় ৩৩ ফুট লম্বা মা তিমিটিকে অন্য পূর্ণবয়স্ক স্ত্রী তিমিরা আশপাশ থেকে ঘিরে রেখেছিল

‘প্রজেক্ট সিএটিআই’র রোবটিক্স দলের সদস্য ও এ গবেষণার প্রধান লেখক আলা মাওলুফ বলেছেন, “বাচ্চাটি জন্ম নেওয়ার ঠিক পরেই আমরা সহযোগিতামূলক সেবার এক দৃশ্য দেখতে পাই। তিমিরা নবজাতকের আশপাশে খুব ঘন হয়ে এক জটলা তৈরি করেছিল এবং বারবার একে স্পর্শ করছিল। এরা নিজেদের শরীর দিয়ে বাচ্চাটিকে ধরে রাখছিল এবং পর্যায়ক্রমে ঠেলে পানির উপরিভাগের দিকে তুলে ধরছিল। এ প্রক্রিয়াটি বেশ কয়েক ঘণ্টা ধরে চলেছে।”

সামুদ্রিক স্তন্যপায়ী প্রাণী হওয়ায় তিমির পক্ষে বাতাস থেকে অক্সিজেন নেওয়া জরুরি। ফলে জন্মের পরপরই শ্বাস নেওয়ার জন্য নবজাতক বাচ্চাটির পানির উপরে আসা গুরুত্বপূর্ণ। এ বাচ্চাটিকে জন্মের এক মিনিটের মধ্যেই পানির উপরে তুলে আনা হয়েছিল।

সামুদ্রিক বিজ্ঞানী ও গবেষণার সহ লেখক ডেভিড গ্রুবার বলেছেন, “স্পার্ম হোয়েলদের জন্য জন্মমুহূর্তটি ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ মানুষের বাচ্চার মতোই এরা জন্মের সময় নড়াচড়া করতে পারে না ও একেবারেই অসহায় থাকে। পানিতে ডুবে যাওয়া ঠেকাতে এবং প্রথমবার শ্বাস নেওয়ার জন্য এদের অন্যদের তাৎক্ষণিক সাহায্যের প্রয়োজন হয়।”

বিজ্ঞানীরা বলছেন, এ সমন্বিতভাবে বাচ্চা উপরে তুলে ধরার আচরণটি এর আগে আরও তিন ধরনের দাঁতওয়ালা তিমির (কিলার হোয়েল, ফলস কিলার হোয়েল ও বেলুগা) মধ্যে দেখা গেছে।

গবেষকদের ধারণা, তিমিদের এমন প্রবৃত্তিটি হয়ত ৩ কোটি বছর আগে এসব প্রজাতির সাধারণ পূর্বপুরুষদের সময় থেকে চলে আসছে।

তিমিদের কণ্ঠস্বর বা শব্দের ধরনেও জন্মদানের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলোতে পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে, বিশেষ করে প্রসববেদনা শুরু হওয়ার সময় এবং যখন সেখানে ‘শর্ট-ফিন্ড পাইলট হোয়েল’-এর একটি দল উপস্থিত হয়েছিল তখন এদের ডাকের ধরন বদলে গিয়েছিল।

বাচ্চা জন্মের কয়েক ঘণ্টা পর তিমিগুলো ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে এদের স্বাভাবিক খাবার খোঁজার কাজে ফিরে যায়।

জন্মদানের সময় যেসব তিমি একে অপরকে সহযোগিতা করছিল এরা আসলে দুটি ভিন্ন পরিবারের সদস্য ছিল, যারা সাধারণত আলাদা থাকতেই পছন্দ করে।

গবেষক আলা মাওলুফ বলেছেন, “এ ঘটনার সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক হচ্ছে, এখানে আত্মীয়তার গণ্ডি পেরিয়ে একে অপরকে সাহায্য করতে দেখা গেছে। সাধারণত খাবার খোঁজার সময় যেসব দল আলাদা থাকে, জন্মের সময় এরা এক হয়ে গিয়েছিল।

“এর থেকে ইঙ্গিত মেলে, স্পার্ম হোয়েলেদের সমাজ কেবল ঘনিষ্ঠ পরিবারের সম্পর্কের ওপর ভিত্তি করেই টিকে নেই। এ সহযোগিতার ধরন ও পরিধি তাদের উচ্চমানের সামাজিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতার পরিচয় দিয়েছে।”

অন্যান্য সামুদ্রিক স্তন্যপায়ী প্রাণীর মতো স্পার্ম হোয়েলরাও সামাজিক। এ প্রজাতির বড় পুরুষ তিমিরা লম্বায় প্রায় ৬০ ফুট পর্যন্ত হতে পারে। এরা সমুদ্রের অনেক গভীরে ডুব দিতে ও বিশালাকার স্কুইডসহ অন্যান্য সামুদ্রিক প্রাণী শিকার করে জীবনধারণ করে।

এর আগে, ১৯৮৬ সালে শেষবার স্পার্ম হোয়েলের জন্মদানের বৈজ্ঞানিক তথ্য রেকর্ড হয়েছিল। তবে তা ছিল কেবল লিখিত বর্ণনা।

স্পার্ম হোয়েলরা এক জটিল সামাজিক কাঠামো মেনে চলে। সাধারণত ১০ থেকে ১২ সদস্যের এক স্থিতিশীল মাতৃতান্ত্রিক পরিবার মিলেমিশে খাবার সংগ্রহ ও একে অপরের সন্তানদের দেখাশোনা করে এরা।

এ গবেষণার সহ-লেখক ও ‘প্রজেক্ট সিএটিআই’র প্রধান জীববিজ্ঞানী শেন গেরো বলেছেন, “পুরুষ স্পার্ম হোয়েলরা সাধারণত এদের কিশোর বয়সের শুরুর দিকেই পরিবার ছেড়ে চলে যায়। অন্যদিকে দাদি/নানি, মা ও কন্যা তিমিরা গোটা জীবনই একসঙ্গে বসবাস করে।

“স্ত্রী তিমিরা একজোট হয়ে বাচ্চাদের রক্ষা ও লালন-পালন করার জন্য এ পারিবারিক বন্ধনে থাকে। বিপরীতে, পূর্ণবয়স্ক পুরুষরা একা জীবনযাপন করে ও সঙ্গী খোঁজার জন্য এক মহাসাগর থেকে অন্য মহাসাগরে ঘুরে বেড়ায়।”

তিমির জন্মদানের এ বিশেষ মুহূর্তে সেই কিশোর পুরুষ তিমির উপস্থিতি শেন গেরোর কাছে এক ‘দারুণ বিস্ময়’।

এদিকে, গবেষক ডেভিড গ্রুবার বলেছেন, “স্পার্ম হোয়েলদের মধ্যে এমন কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যা মানুষের সঙ্গে মিলে যায়। এদের মস্তিষ্ক যে কোনো প্রজাতির তুলনায় বড় এবং এদের মধ্যে সচেতন চিন্তা, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, ভাষা, সহানুভূতি, ভালোবাসা, কষ্ট ও অন্তর্দৃষ্টির মতো উচ্চস্তরের মানসিক সক্ষমতা রয়েছে।”