Published : 21 Aug 2026, 02:20 PM
মিল্কি ওয়ের দ্রুততম তারার সন্ধান পেয়েছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা, যা ছায়াপথের কেন্দ্রে অবস্থিত দানবাকৃতির এক ব্ল্যাক হোলের খুব কাছ দিয়ে বিস্ময়কর গতিতে ঘুরছে বলে দাবি তাদের।
নতুন সন্ধান পাওয়া এ তারাটি মিল্কি ওয়ের কেন্দ্রে অবস্থিত দানবাকৃতির ব্ল্যাক হোল ‘স্যাজিটেরিয়াস এ*’কে কেন্দ্র করে তীব্র গতিতে ছুটে চলছে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ইন্ডিপেনডেন্ট।
‘এস৩০১’ নামের তারাটি প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ২৫ হাজার কিলোমিটার গতিতে ব্ল্যাক হোলটিকে প্রদক্ষিণ করছে।
এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত অন্য যে কোনো তারার চেয়ে নতুন তারাটি ব্ল্যাক হোলের সবচেয়ে কাছ দিয়ে প্রদক্ষিণ করছে।
জার্মানির ‘ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইনস্টিটিউট ফর এক্সট্রাটেরেস্ট্রিয়াল ফিজিক্স’ বা এমপিই’র নোবেলজয়ী পরিচালক রাইনহার্ড গেনজেল বলেছেন, “অবিষ্কারটি ব্ল্যাক হোলের চরম প্রতিকূল পরিবেশ ও স্থান-কালের মৌলিক বৈশিষ্ট্যগুলো বোঝার ক্ষেত্রে গবেষণার একটি নতুন দুয়ার খুলে দিয়েছে।”
তারাটির এ অদ্ভুত আচরণ নিয়ে এ গবেষণার অন্যতম লেখক ও এমপিই’র গবেষক ফেলিক্স ম্যাং বলেছেন, “এ তারার বিশেষত্ব হচ্ছে, এটা স্যাজিটেরিয়াস এ*-এর খুব কাছাকাছি সংকীর্ণ এক কক্ষপথে ঘুরছে।
“কেবল ৮ দশমিক ৭ বছরে ব্ল্যাক হোলটিকে একবার পূর্ণ প্রদক্ষিণ করে। ব্ল্যাক হোলের সবচেয়ে কাছে যাওয়ার মুহূর্তে তারাটি সূর্য থেকে পৃথিবীর দূরত্বের কেবল ১২ গুণ দূরত্বে নেমে আসে, যা জ্যোতির্বিজ্ঞানের ইতিহাসে নজিরবিহীন।”
ব্ল্যাক হোলের সবচেয়ে নিকটবর্তী হওয়ার সময় তারাটির গতিবেগ সাধারণ যাত্রীবাহী প্রেনের তুলনায় প্রায় ১ লাখ গুণ হয়ে যায়, যা আলোর গতির প্রায় ৮ শতাংশের সমান। এই গতিই তারাটিকে মিল্কি ওয়ের দ্রুততম তারার খেতাব এনে দিয়েছে।
কেবল গতিই নয়, তারাটি ব্ল্যাক হোলের এত কাছে অবস্থান করছে, যা সূর্য থেকে শনি গ্রহের দূরত্বের সমান।
এত কাছে অবস্থানের কারণে গবেষকরা বলছেন, তারাটিকে ব্যবহার করে ভবিষ্যতে ব্ল্যাক হোলের নিজস্ব ঘূর্ণন গতিও পরিমাপ করা সম্ভব হবে।
মহাবিশ্বের প্রায় সবকিছুর মতোই আমাদের ছায়াপথের কেন্দ্রের ব্ল্যাক হোলটিও নিজের অক্ষের ওপর ঘুরছে।
আলবার্ট আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব অনুসারে, একটি ঘূর্ণায়মান ব্ল্যাক হোল এর আশপাশের স্থান-কালকে নিজের দিকে টেনে নেয়, যার ফলে এর কাছাকাছি থাকা বিভিন্ন তারার কক্ষপথের ওপর প্রভাব ফেলে।
এর মানে তারাটিকে পর্যবেক্ষণ করে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা ব্ল্যাক হোলের ঘূর্ণন গতি মেপে দেখতে পারবেন, যা মহাবিশ্ব তৈরির অন্যতম মৌলিক তত্ত্বকে আরও গভীরভাবে বুঝতে সাহায্য করবে।
গবেষক স্টেফান গিলেসেন বলেছেন, “ইতিহাসে প্রথমবারের মতো আমরা দানবাকৃতির এক ব্ল্যাক হোলের ঘূর্ণন সরাসরি পরিমাপের সুযোগ পাব, যা আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতা তত্ত্বের বড় পরীক্ষা হতে যাচ্ছে।”
ইউরোপীয় সাউদার্ন অবজারভেটরির ‘ভেরি লার্জ টেলিস্কোপ ইন্টারফেরোমিটার’ ব্যবহার করে বিজ্ঞানীরা এ তারার সন্ধান পেয়েছেন।
চারটি আলাদা টেলিস্কোপের আলোক রশ্মিকে একত্র করে শক্তিশালী এক ‘ভার্চুয়াল’ টেলিস্কোপ তৈরির মাধ্যমে ২০২৩ সালে তারাটির প্রথম ঝলক দেখতে পান গবেষকরা।
পরবর্তীতে তারা ২০১৭ সাল পর্যন্ত তারার গতিপথের হিসাব বের করে নিশ্চিত হয়েছেন, এটাই ২০২৩ সালের শুরুতে ব্ল্যাক হোলের সবচেয়ে কাছ দিয়ে পেরিয়েছিল।
ব্ল্যাক হোলের এত কাছাকাছি কোনো তারা নতুন করে তৈরি হওয়া প্রায় অসম্ভব। ফলে গবেষকদের ধারণা, ‘এস৩০১’ আগে দুই তারার একটি জোড়া হিসেবে ছিল।
পরে স্যাজিটেরিয়াস এ*-এর প্রচন্ড মহাকর্ষ বলের টানে জোড়াটি ভেঙে যায়। ফলে এস৩০১ তারাটি ব্ল্যাক হোলের মাধ্যাকর্ষণে আটকে পড়ে এবং অন্য তারাটি এত প্রচণ্ড শক্তিতে ছিটকে যায় যে তা সম্ভবত আমাদের ছায়াপথ থেকেই চিরতরে বেরিয়ে গেছে।
গবেষকরা আগামী দিনে নতুন প্রযুক্তির উন্নত টেলিস্কোপ দিয়ে তারাটি পর্যবেক্ষণ করা চালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন। ২০৩১ সালে তারাটি আবারও ব্ল্যাক হোলের সবচেয়ে নিকটবর্তী অবস্থানে পৌঁছাবে।
বিজ্ঞানীদের অনুমান, ওই সময়ই এ তারা, এর গতিপথ ও ব্ল্যাক হোলের রহস্যময় ঘূর্ণন গতি নিখুঁতভাবে বুঝে নেওয়ার সবচেয়ে উপযোগী মুহূর্ত মিলবে।
‘ডিসকভারি অফ এ স্টার সেনসিটিভ টু দ্য স্পিন অফ এসজিআর এ*’ শিরোনামে গবেষণাটি প্রকাশ পেয়েছে বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল ‘নেচার’-এ।