Published : 05 Jan 2026, 10:36 AM
২০২৫ সালে একজন প্রযুক্তি লেখক দীর্ঘ বিরতির পর আবারও সামাজিক মাধ্যমে ফিরে আসেন। তবে তার এই অভিজ্ঞতা ছিল চরম হতাশাজনক ও বেশ চিন্তাশীল। তার পর্যবেক্ষণে সামাজিক মাধ্যম এখন আর মানুষের মধ্যে যোগাযোগের মাধ্যম নেই, বরং বিজ্ঞাপনের বাজারে পরিণত হয়েছে।
২০২৫ সালে বিশ্বের সবচেয়ে পরিচিত ও প্রভাবশালী প্রযুক্তি, অর্থাৎ সামাজিক মাধ্যম থেকে বছরের পর বছর ধরে সচেতনভাবে দূরে থাকার অভ্যাসটি পাল্টে ফেলার চেষ্টা করেছিলেন এনগ্যাজেটের একজন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক অ্যামি স্করহেইম। তবে আবারও সামাজিক মাধ্যমে ফেরেন তিনি।
তবে, তার এই ফেরা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি।
নিজের লেখনিতে সামাজিক মাধ্যমের বাণিজ্যিকীকরণ ও মানুষের মধ্যকার আসল বন্ধন হারিয়ে যাওয়ার বিষয়টি তুলে ধরেছেন স্করহেইম। তার লেখাটি নিচে হুবহু তুলে ধরা হল–
প্রথমবার সামাজিক মাধ্যম থেকে নিজেকে সরিয়ে নিতে বেশ বেগ পেতে হয়েছিল আমার, যেমন নোটিফিকেশন বন্ধ করা, হোমস্ক্রিন থেকে অ্যাপ মুছে ফেলা ও শেষমেশ বিভিন্ন অ্যাকাউন্ট ডিলিট করে দেওয়া। তবে এবার ফোনটা যেন নিজে থেকেই আমার হাত থেকে নেমে গেল। পুরো বিষয়টিই ঘটেছে আসলে সামাজিক ম্যধমে আকর্ষণ হারিয়ে ফেলার কারণে।
ইনস্টাগ্রাম দিয়ে শুরু হয়েছিল আমার সামাজিক মাধ্যমের যাত্রা। প্রতিবার আমার অভিজ্ঞতা হত ঠিক এমন, প্রথমে পরিবারের কোনো সদস্য বা বাস্তব জীবনের কোনো বন্ধুর পোস্ট দেখতাম। এর ঠিক পরেই সামনে আসত এক স্পন্সরড পোস্ট বা বিজ্ঞাপন, তারপর আসত অপরিচিত সব মানুষকে ফলো করার পরামর্শ। এরপর আসত সারিবদ্ধভাবে কিছু ইনফ্লুয়েন্সার ভিডিও, যা সত্যি বলতে আমার রুচির সঙ্গে একেবারে মিলে যায়।
এরপর আরও কিছু স্পন্সর্ড পোস্ট আসতে থাকে, যার বেশিরভাগই ছিল এমন সব ব্র্যান্ডের যাদের নিয়ে কাজের প্রয়োজনে ইন্টারনেটে আগে সার্চ করেছিলাম আমি। এরপর আবার সেই ইনফ্লুয়েন্সারদের ভিডিওতে ফিরে যেত। আমার চোখ ধাঁধিয়ে যেত এবং ফোনটা একপাশে ছুড়ে ফেলে দিতাম।
কয়েক বছর আগেও প্ল্যাটফর্মগুলোতে কৃত্রিম সামাজিক বন্ধনের উত্তেজনা ছিল, যা আমি ঘণ্টার পর ঘণ্টা উপভোগ করতাম। এক সময়ের সহকর্মীর অর্থহীন চিন্তাভাবনা, কলেজের রুমমেটের ছুটির দিনের ভিডিও বা পুরানো বন্ধুর মেঝেতে পড়ে যাওয়া আধসেঁদ্ধ রুটি, যা সে ফেলে না দিয়ে ছবি তুলে পোস্ট করেছিল– এসব আমি গোগ্রাসে গিলতাম।
তবে এখন সেই সব সত্যিকারের মুহূর্ত একদমই কমে গেছে, বরং বিজ্ঞাপন ও যারা ইনস্টাগ্রামকে আয়ের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেন তাদের পোস্টের ভিড়ে আসল সব জিনিস হারিয়ে গেছে। সত্যিকারের মানুষগুলো চলে গেছে। সেই আত্মিক টানও আর নেই। ফলে কিছু একটা মিস করে ফেলার ভয়ও আমার এখন আর কাজ করে না।
আমি যেসব প্ল্যাটফর্মে ফিরেছিলাম প্রতিটিতেই এই একই হতাশার অভিজ্ঞতা, যার রূপ কিছুটা ভিন্ন। নিষেধাজ্ঞার কয়েক মাস পর আবার যখন আমি টিকটকে ঢুকলাম তখন মনে হলো যেন এক উন্মাদ শপিং মলে ঢুকেছি। সেখানে প্রতিটি ভিডিও কেবল চার সেকেন্ডের মতো ছোট, যার বেশিরভাগই হয় প্রচারণামূলক নয়তো কেনাকাটার জন্য।
ইউটিউব শর্টস এখন এআই দিয়ে তৈরি ভিডিওতে ডুবে আছে। আমি তো আর সাহায্যকারী মানুষের নৌকায় অসহায় বন্য প্রাণীর বাচ্চাদের উঠে আসার মতো সব ভুয়া দৃশ্য দেখার জন্য সামাজিক মাধ্যমে আসিনি। আমার জীবনে পোষা প্রাণীদের ধমক দিচ্ছে এমন কৃত্রিম শিশুদের দেখার কোনো প্রয়োজন নেই।
তবে মাঝেমধ্যে বেশ চমৎকার কিছুও চোখে পড়ত। যেমন গভীর রাতের কোনো টিভি শো-র ক্লিপ, খুব লোভনীয় কোনো মিষ্টির রেসিপি বা ভিনদেশের মানুষের কাছ থেকে তাদের সংস্কৃতির সূক্ষ্ম নানা বিষয় জানা।
তবে, আমার কাছে এসব সামাজিক মাধ্যম এখন আর চোখের জন্য ‘ভেলক্রো’, অর্থাৎ আঠার মতো আটকে থাকার মতো কিছু নয়। আগে আমি ইউটিউব শর্টস বা ইনস্টাগ্রামে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বুঁদ হয়ে থাকতাম। টিকটকের ‘ফর ইউ পেইজ’ স্ক্রল করতে করতে যখন হুঁশ ফিরত তখন চোখ দুটি লাল হয়ে থাকত এবং নিজের ওপর এক ধরনের লজ্জাও কাজ করত আমার।
এখন কেবল কয়েক মিনিট ব্যবহারের পরই একঘেয়েমি আর বিরক্তি কাজ করে। মনে হয় যেন আমি রোবটদের এমন এক মেলায় আটকে পড়েছি, যারা সারাক্ষণ আমার কাছে শ্যাম্পু বিক্রির চেষ্টা করছে। আর আমি কেবল সেখান থেকে বাড়ি ফিরে যাওয়ার তাড়না অনুভব করছি।
পরিস্থিতি কেন বা কীভাবে বদলে গেল তা কোনো রহস্যময় বিষয় নয়। এর উত্তর সবসময় একটিই, অর্থ। শত শত কোটি ও ট্রিলিয়ন ডলারের বিভিন্ন কোম্পানির বিনিয়োগকারীরা অন্য সবকিছুর চেয়ে বছর শেষে মুনাফার পরিমাণ বাড়াকেই বেশি গুরুত্ব দেন। ফলে আমরা ইনস্টাগ্রামে আগের চেয়ে অনেক বেশি বিজ্ঞাপন বা স্পন্সর্ড পোস্ট দেখি।
এদিকে, টিকটক খুব উদ্দেশ্যমূলক ও উৎসাহের সঙ্গে কেনাকাটার কনটেন্টে নিজেদেরকে ঠাসিয়ে ফেলেছে, যা এর মালিকানা বদলালেও পরিবর্তন হবে না। ইউটিউব এখন মানুষের ব্যস্ততা বা ‘এনগেজমেন্ট’ বাড়ানোর জন্য এতটাই মরিয়া যে, তারা এমন সব মানুষদের পুরস্কৃত করছে যারা প্ল্যাটফর্মটিকে এআই দিয়ে তৈরি আজেবাজে কনটেন্ট দিয়ে ভাসিয়ে দিচ্ছে।
এসব প্ল্যাটফর্ম এখন আর মানুষের মধ্যকার যোগাযোগ বা সৃজনশীলতা ছড়িয়ে দেওয়ার জায়গায় নেই, বরং এগুলো এখন এক ধরনের চাকচিক্যময় ই-কমার্স সাইট হয়ে দাঁড়িয়েছে, যেখানে জোর করে এআই দিয়ে তৈরি অদ্ভুত সব জিনিস ঢুকিয়ে দিয়েছে এসব কোম্পানি।
পুরো বিষয়টি নিয়ে আমি আরও বেশি দুঃখ পেতাম যদি আমি মনে করতাম, সামাজিক মাধ্যমের অন্যরকম হওয়ার কোনো সুযোগ ছিল। এসব কোম্পানি বিশ্বের সবচেয়ে মূল্যবান প্রতিষ্ঠানের তালিকায় রয়েছে। তাদের পরিষেবা ব্যবহার করে আমি যে আমার মতো সাধারণ মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছি না, তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই।
এ পরিবর্তন যে সবাইকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে, তা-ও কিন্তু নয়। ইনস্টাগ্রাম এ বছর আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি ব্যবহারকারীর কথা জানিয়েছে, যা পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩৫ শতাংশ! শতকোটি মানুষ এখনও টিকটক স্ক্রল করছে ও ইউটিউব শর্টস দেখছে। ফলে, হতে পারে সমস্যা কেবল আমারই।