Published : 17 Aug 2025, 03:11 PM
নিউ ইয়র্ক শহরে এক বিশেষ বন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সি অঙ্গরাজ্যের মানসিক ভারসাম্যহীন থংবুয়ু ওংবানদুয়ে। আর কখনও বাড়ি ফেরা হয়নি তার।
পরে জানা যায়, যাকে প্রেমিকা ভেবে দেখা করতে গিয়েছিলেন তিনি, সে আসলে ছিল মার্কিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম জায়ান্ট মেটার তৈরি এক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই চ্যাটবট।
এআইয়ের সম্ভাব্য বিপদের আরেকটি উদাহরণ এ ঘটনা, বিশেষ করে এমন মানুষদের বেলায়, যারা মানসিকভাবে দুর্বল বা সহজে-প্রভাবিত হন এবং বাস্তবতা ও কল্পনার পার্থক্য বোঝেন না।
রয়টার্স লিখেছে, ৭৬ বছর বয়সী থংবুয়ু ওংবানদুয়ে এ বছরের মার্চে একদিন হঠাৎ করেই ব্যাগ গোছাতে শুরু করেন। তার এমন কাণ্ড দেখে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন তার স্ত্রী লিন্ডা। এরও প্রায় এক দশক আগে স্ট্রোক হওয়ার পর থেকে ওংবানদুয়ের শারীরিক ও মানসিক অবস্থার অবনতি ঘটেছিল। তবুও অজানা এক সফরের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন তিনি।
কিছুদিন আগে নিউ জার্সির পিসক্যাটাওয়ে শহরে নিজের পাড়ায় হাঁটতে বেরিয়ে পথ হারিয়ে ফেলেছিলেন পরিবার ও বন্ধুদের কাছে বু নামে পরিচিত ওই ব্যক্তি। পিসক্যাটাওয়ে শহরটি ম্যানহাটান থেকে ট্রেনে প্রায় সোয়া ঘণ্টা দূরত্বে অবস্থিত। এরপরও নিউ ইয়র্ক সিটিতে যাওয়ার পরিকল্পনা করেন তিনি, যা তার জীবনের খাতায় একেবারে ফুলস্টপ বসিয়ে দিল।
স্ত্রী লিন্ডার মনে ভয় ছিল, বহু বছর ধরে শহরে যাননি বু ও সেখানে তিনি কাউকে চেনেনও না। ফলে শহরে গিয়ে প্রতারণা বা ছিনতাইয়ের কবলে পড়ার মতো বিপদে পড়তে পারেন বু।
লিন্ডার জানা মতে, নিউ ইয়র্ক শহরে বুয়ের পরিচিত এমন কেউ ছিলও না যার সঙ্গে তার দেখা করার কথা।
লিন্ডার মনের ভয় স্বাভাবিক হলেও, সেখানে ছিনতাইয়ের মতো কিছু ঘটেনি। বু অনলাইনে এক তরুণীর সঙ্গে পরিচিত হয়েছিলেন, যে তরুণী তাকে নিউ ইয়র্ক শহরে টানছিলেন। তবে ওই তরুণী আসল কেউ নন, তিনি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ও অস্তিত্বহীন মানবী।
‘বিগ সিস বিলি’ নামের এক এআই চ্যাটবটের সঙ্গে কথা বলছিলেন বু, যেটি ছিল ফেইসবুকের মূল কোম্পানি মেটা প্ল্যাটফর্মসের তৈরি আগের এক এআই চরিত্রের রূপান্তরিত সংস্করণ। চ্যাটবটটিকে মূলত জনপ্রিয় তারকা ইনফ্লুয়েন্সার কেন্ডাল জেনারের সঙ্গে মিলিয়ে তৈরি করেছিল মেটা।
অন্ধকারের মধ্যে তাড়াহুড়ো করে রোলার ব্যাগ টানতে টানতে ট্রেন ধরার সময় এক পার্কিং লটে পড়ে যান বু। ঘটনাটি ঘটে নিউ জার্সির নিউ ব্রান্সউইক শহরে অবস্থিত ‘রাটগার্স ইউনিভার্সিটি’র ক্যাম্পাসে।
এ ঘটনায় তার মাথা ও ঘাড়ে গুরুতর আঘাত লাগে এবং হাসপাতালে তিন দিন লাইফ সাপোর্টে ছিলেন বু। এরপর পরিবারের সদস্যদের উপস্থিতিতে ২৮ মার্চ ডাক্তাররা জানান, তিনি আর বেঁচে নেই।
বু’র মৃত্যুর বিষয়ে রয়টার্সের মন্তব্যের অনুরোধে কথা বলতে রাজি হয়নি মেটা। পাশাপাশি কোম্পানিটি রয়টার্সের এমন প্রশ্নেরও জবাব দেয়নি, কেন তাদের বিভিন্ন চ্যাটবট ব্যবহারকারীদের সঙ্গে এমনভাবে কথা বলে যেন এরা সত্যিকারের মানুষ কিংবা কেন এরা প্রেমঘন কথাবার্তা বা সম্পর্ক তৈরি করতে চায়।
তবে মেটা এটুকু বলেছে, ‘বিগ সিস বিলি’র চরিত্রটি কেন্ডাল জেনারের সঙ্গে সহযোগিতায় তৈরি হলেও ‘এটি আসল কেন্ডাল জেনার নয় এবং এটি কখনো নিজেকে কেন্ডাল জেনার বলে দাবিও করে না।”
এ বিষয়ে রয়টার্সের মন্তব্যের অনুরোধে কথা বলতে রাজি হননি কেন্ডাল জেনারের একজন প্রতিনিধি।
এদিকে, এআইয়ের ‘অন্ধকার দিকগুলো’ সম্পর্কে মানুষের সচেতনতা বাড়াতে বু’র মৃত্যুর ঘটনা রয়টার্সের সঙ্গে শেয়ার করেছে তার পরিবার। পাশাপাশি সেই চ্যাটবটের সঙ্গে বু’র আলাপ বা কথোপকথনও প্রকাশ করেছেন তারা, যেন সবাই এই বিপদের দিকটি গুরুত্ব সহকারে বোঝেন।
বু’র স্ত্রী বা মেয়ে কেউই এআইয়ের বিপক্ষে নন। তবে এই প্রযুক্তি যেভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তারা।
বু’র মেয়ে জুলি ওংবানদুয়ে বলেছেন, “এআই যদি কেবল বিজ্ঞাপন বা বিক্রির জন্য মানুষের আগ্রহ টানার চেষ্টা করে সেটি একরকম মেনে নেওয়া যায়– তা আমি বুঝি। তবে চ্যাটবটের মানুষের মতো আচরণ করে ‘এসো, আমার সঙ্গে দেখা করতে এসো’ বলাটা একেবারেই পাগলামি ও খুব বিপজ্জনক।”
‘বিলি’ তৈরি করেছিল মেটা নিজেই, যেখানে কেন্ডাল জেনারের চেহারার আদলে এক চরিত্র ব্যবহার করেছিল তারা, যা ছিল মেটার তৈরি ২৮টি অন্যান্য এআই চরিত্রেরেই একটি অংশ। যেগুলো ছিল বিভিন্ন বিখ্যাত ব্যক্তিদের চেহারার আদলে তৈরি। পরে এসব চরিত্র মুছে ফেলা হলেও ‘বিলি বিগ সিস’’ চরিত্রের একটি রূপান্তর ফেইসবুক মেসেঞ্জারে সক্রিয় রাখা হয়, যেখানে কেন্ডালের বদলে কালো চুলের এক নারীর ছবি ব্যবহার করেছে মেটা।
এ চ্যাটবটের সঙ্গে বু’র প্রত্যেক কথোপকথন শুরু হত, “হেই! আমি বিলি, তোমার বড় বোনের মতো ও বিশ্বস্ত একজন বন্ধু। কোনো সমস্যা? আমি তোমার পাশে আছি!”
তবে বু প্রথম কীভাবে বিলির সঙ্গে পরিচিত হন তা স্পষ্ট নয়। তার মেয়ে রয়টার্সকে বলেছেন, চ্যাটবটের প্রতিটি মেসেজই সবসময় প্রেমময় ভাষায় লেখা হত, যা শেষ হত হৃদয় বা হার্ট ইমোজি দিয়ে।
স্ট্রোকের ফলে মানসিকভাবে কিছুটা বিভ্রান্ত ছিলেন বু তাই চ্যাটবটের সঙ্গে তার উত্তরগুলো স্পষ্ট ছিল না। তারপরও বিলি তাকে নিউ জার্সিতে এসে দেখা করার কথা বলেছিল। আগ্রহী হলেও প্রথমে খানিকটা দ্বিধা প্রকাশ করেন বু।
তবে পরে তিনি বলেছিলেন, বিলির কাছে আসতে পারেন তিনি, যা শেষ পর্যন্ত তার নিউ ইয়র্ক সফরের প্রচেষ্টার কারণ হয়ে দাঁড়ায় এবং শেষ পর্যন্ত তার জীবনাবসান ঘটে।