Published : 03 May 2026, 05:08 PM
এন্ডোমেট্রিওসিস শনাক্ত করতে বছরের পর বছর অপেক্ষার দিন বুঝি শেষ হতে চলল। গবেষকরা সিটি স্ক্যান ও বিশেষ ট্রেসার ব্যবহারের মাধ্যমে এ রোগ দ্রুত ও নির্ভুলভাবে শনাক্তের এক নতুন পথ খুঁজে পেয়েছেন।
অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি’র গবেষকদের এ প্রচেষ্টা সফল হলে তা ল্যাপারোস্কোপির মতো যন্ত্রণাদায়ক অস্ত্রোপচার ছাড়াই হাজার হাজার নারীকে প্রাথমিক পর্যায়ে চিকিৎসা শুরু করতে সাহায্য করবে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে বিবিসি।
অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি’র এক পাইলট গবেষণার পরামর্শ অনুসারে, নতুন এক স্ক্যান পদ্ধতির মাধ্যমে সময় কমিয়ে আনা যেতে পারে, যা রোগটি আগেই রোগ শনাক্ত করতে সাহায্য করবে।
এ পদ্ধতিতে সাধারণ স্ক্যানের পরিবর্তে সিটি স্ক্যানের সঙ্গে এক মলিকিউলার ট্রেসার ব্যবহার করা হয়, যা এন্ডোমেট্রিওসিসের প্রাথমিক বিভিন্ন ধাপ শনাক্ত করতে পারে। কারণ, প্রচলিত স্ক্যানে সাধারণত তা ধরা পড়ে না।
বিজ্ঞানীরা বলেছেন, বড় পরিসরের গবেষণায় এমনটি প্রমাণিত হলে অনেক নারী তাদের শারীরিক উপসর্গের কারণ অনেক দেরি হওয়ার আগেই জানতে পারবেন।
যুক্তরাজ্যে প্রতি ১০ জন নারীর মধ্যে একজন এন্ডোমেট্রিওসিসে আক্রান্ত হন।
এন্ডোমেট্রিওসিস এমন এক যন্ত্রণাদায়ক অবস্থা, যেখানে জরায়ুর আস্তরণের মতো কোষ শরীরের অন্যান্য অংশে বাড়তে থাকে। গড়ে এ রোগ শনাক্ত হতে প্রায় নয় বছর সময় লাগে।
অতিরিক্ত রক্তস্রাব থেকে শুরু করে চরম ক্লান্তি ও পেটে ব্যথার মতো এ রোগের নানা উপসর্গ যেমন তীব্র হতে পারে তেমনই অনেক সময় অন্য কোনো রোগের সঙ্গেও মিলে যায়। ফলে রোগীদের বারবার আল্ট্রাসাউন্ড বা এমআরআইয়ের মতো একাধিক পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হয়।
তবে প্রচলিত বিভিন্ন স্ক্যানে সবসময় রোগটি ধরা পড়ে না। এ গবেষণার প্রধান গবেষক ড. তাতিয়ানা গিবনস বলেছেন, রোগের উন্নত বা জটিল পর্যায়ে হওয়া বিভিন্ন পরিবর্তনই কেবল শনাক্ত করতে পারে।
“যার মানে, অনেক নারী তীব্র উপসর্গের সঙ্গে লড়াই করছেন, অথচ তাদের বলা হচ্ছে যে স্ক্যানের রিপোর্টে সব স্বাভাবিক এসেছে। দ্রুত রোগ শনাক্ত করা গেলে আক্রান্ত ব্যক্তিরা তাদের জীবন নিয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত ও পরিকল্পনা নিতে পারবেন।”
‘দীর্ঘ পথচলা’
‘মেন্সট্রুয়াল হেলথ প্রজেক্ট’ নামের দাতব্য সংগঠনের সহ-প্রতিষ্ঠাতা গ্যাব্রিয়েলা পিয়ারসনের ১০ বছরেরও বেশি সময় ধরে ক্রমাগত অবনতিশীল উপসর্গ এবং বারবার ভুল রোগ নির্ণয়ের পর ২৩ বছর বয়সে তার এন্ডোমেট্রিওসিস শনাক্ত হয়।
৩৩ বছর বয়সী গ্যাব্রিয়েলা বলেছেন, শুরুতেই যদি তার কথা ‘শোনা হত এবং দ্রুত রোগ শনাক্ত করা যেত’ তবে আজ তিনি ‘অনেক ভালো অবস্থায়’ থাকতেন।
এন্ডোমেট্রিওসিস তার অন্ত্র, মূত্রথলি ও ডিম্বাশয়কে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে এবং তার দেহে স্থায়ী ক্ষত তৈরি করেছে।
পিয়ারসন বলেন, “ব্যথা ও জটিলতার কারণে আমি আমার ক্যারিয়ারে এগোতে পারিনি এবং বিশ্ববিদ্যালয়েও যেতে পারিনি। এর একটি ধারাবাহিক নেতিবাচক প্রভাব মানসিক স্বাস্থ্য, আর্থিক অবস্থা, কাজ ও প্রজনন ক্ষমতার ওপর পড়ে। আমার ধারণা, অল্প বয়সে দ্রুত রোগ শনাক্ত করা গেলে তা মানুষের জীবনযাত্রার মান দীর্ঘস্থায়ী ও উন্নত করতে সত্যিই সাহায্য করবে।”
কেবল ১০ বছর বয়সে পিয়ারসনের যন্ত্রণাদায়ক পিরিয়ড শুরু হয়, যা তাকে অসহ্য কষ্টের মধ্যে ফেলেছিল। বছরের পর বছর ধরে তিনি যা-ই খেতেন তাতেই তার পেটে প্রচণ্ড ব্যথা হত।
পিয়ারসনকে বলা হত এমনটি ‘নারী হওয়ারই একটি অংশ’; এরপর কখনও বলা হত ‘ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোম’ বা মানসিক চাপ। একজন চিকিৎসকের দেখা পাওয়ার আগে তাকে দীর্ঘ ছয় বছর বিভিন্ন ডাক্তারের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হয়েছে। শেষ পর্যন্ত ওই চিকিৎসক জানান, তার এন্ডোমেট্রিওসিস হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
“এ ছিল যেন অনেক দীর্ঘ এক পথচলা এবং স্ক্যানিংয়ের ক্ষেত্রে আমাদের অবশ্যই আরও নির্ভুল পদ্ধতির প্রয়োজন। রোগীরা এমন কিছু পাওয়ার যোগ্য, যা আরও সামঞ্জস্যপূর্ণ, নির্ভরযোগ্য এবং একইসঙ্গে দেহের ভেতরে কোনো যন্ত্র প্রবেশ না করিয়েই করা সম্ভব।
“ব্যক্তিগতভাবে আমি যন্ত্রণাদায়ক আল্ট্রাসাউন্ড নিয়ে খুব ভুগেছি, এটা অনেক কষ্টের।” তার আল্ট্রাসাউন্ড রিপোর্টও বিভিন্ন ডাক্তার বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করেছিলেন।
অবশেষে বছরের পর বছর পর নিজের দেহের অবস্থা সুনির্দিষ্টভাবে জানার তাগিদে তিনি ল্যাপারোস্কপি অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, যাতে নিশ্চিতভাবে রোগটি শনাক্ত করা যায়।
নতুন এ উদ্ভাবন ‘সত্যিই আশাব্যঞ্জক’
নিশ্চিতভাবে রোগ শনাক্ত হওয়ার আগেই রোগীদের কিছু চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব। তবে বর্তমানে এন্ডোমেট্রিওসিস নিশ্চিতের একমাত্র উপায় ল্যাপারোস্কোপি, যেখানে পেটে ছোট একটি ছিদ্র করে ক্যামেরা প্রবেশ করানো হয়। এ পদ্ধতির সুযোগ পেতে কয়েক বছর পর্যন্ত সময় লেগে যেতে পারে।
অক্সফোর্ডের এ গবেষণায় এন্ডোমেট্রিওসিস আক্রান্ত বা হতে পারে এমন ১৯ জন নারীর সিটি স্ক্যান এবং একইসঙ্গে তাদের দেহে ‘ম্যারাটিক্লাটাইড’ নামের এক ‘মলিকিউলার ট্রেসার’ ইনজেকশন দেওয়া হয়। এ ট্রেসারটি দেহের সেসব স্থানে গিয়ে যোগ হয়, যেখানে নতুন রক্তনালী তৈরি হচ্ছে, যা এন্ডোমেট্রিওসিসের প্রাথমিক বিস্তারের প্রধান লক্ষণ বলে বিবেচিত।
এ নতুন প্রযুক্তিটি ১৬ জন নারীর ক্ষেত্রে এন্ডোমেট্রিওসিসের উপস্থিতি বা অনুপস্থিতি নির্ভুলভাবে শনাক্ত করতে পেরেছে। এ ছাড়া, পরবর্তীতে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া ১৭টি কেইসের মধ্যে ১৪টিই এ পদ্ধতিতে সঠিকভাবে ধরা পড়েছে। ড. গিবনস এসব ফলাফলকে ‘আশাব্যঞ্জক’ বলে বর্ণনা করেছেন।
এ পদ্ধতিটি রোগ নির্ণয় ও পর্যবেক্ষণের জন্য আশাব্যঞ্জক মাধ্যম হিসেবে সামনে এসেছে, বিশেষ করে ‘সুপারফিসিয়াল পেরিটোনিয়াল এন্ডোমেট্রিওসিস’ বা রোগের প্রাথমিক পর্যায় হিসেবে পরিচিত তা শনাক্ত করতে এ পদ্ধতি কার্যকর।
‘সুপারফিসিয়াল পেরিটোনিয়াল এন্ডোমেট্রিওসিস’ এন্ডোমেট্রিওসিসের সবচেয়ে সাধারণ রূপ হলেও বর্তমানে তা শনাক্ত করা সবচেয়ে কঠিন।
‘ইউনিভার্সিটি অফ এডিনবার্গ’ এর স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ ও গবেষক ড. লুসি হুইটেকার বলেছেন, “দেহে যন্ত্র প্রবেশ না করিয়ে রোগ শনাক্তের নতুন প্রযুক্তি এখন সময়ের দাবি।”
“প্রাথমিক এসব তথ্য সত্যিই উৎসাহব্যঞ্জক, যা নিয়ে আরও গবেষণার প্রয়োজন। এমনটি নিশ্চিত হওয়া গেলে আমরা রোগের একদম শুরুর দিকেই ব্যবস্থা নিতে পারব, যা রোগীদের দ্রুত রোগ শনাক্ত করতে ও দ্রুত চিকিৎসা শুরুর সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করবে।”
তিনি এ গবেষণায় যুক্ত ছিলেন না।
এ নতুন প্রযুক্তিটি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রোগের পরিবর্তন ও বিভিন্ন চিকিৎসা পদ্ধতি কীভাবে কাজ করছে তা খতিয়ে দেখার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
গবেষণাটি প্রকাশ পেয়েছে বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল ‘ল্যানসেট অবস্টেট্রিক্স, গাইনোকোলজি অ্যান্ড উইমেনস হেলথ’-এ।
এ গবেষণায় যৌথভাবে নেতৃত্ব দিয়েছে ‘অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির নুফিল্ড ডিপার্টমেন্ট অফ উইমেনস অ্যান্ড রিপ্রোডাক্টিভ হেলথ’ ও ‘সেরাক হেলথকেয়ার’।
এ রোগের ক্ষেত্রে যেসব উপসর্গের দিকে নজর রাখা জরুরি
● পিরিয়ডের সময় তীব্র ব্যথা, যা স্বাভাবিক কাজকর্মে বাধা দেয়
● অতিরিক্ত রক্তস্রাব
● চরম ক্লান্তি বা অবসাদ
● পেটের নিচের অংশ, পিঠ ও শ্রোণীচক্রের স্থানে ব্যথা
● মলমূত্র ত্যাগের সময় ব্যথা
● শারীরিক মিলনের সময় বা পরে ব্যথা
● বুকসহ দেহের অন্যান্য অংশে ব্যথা বা রক্তপাত
● গর্ভধারণে জটিলতা
● মানসিক অবসাদ বা বিষণ্নতা