Published : 20 Dec 2025, 01:09 PM
হার্লি-ডেভিডসনের মতো কোম্পানি কখনো ব্যর্থ হতে পারে তা কল্পনা করাও হয়ত কঠিন। তবে কোনো কোম্পানি যখন একশ ২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে ব্যবসায় টিকে থাকে তখন সেখানে উত্থান-পতন থাকাটাই স্বাভাবিক।
ব্যবসার জগতের নিয়মটাই এমন, বিশেষ করে হার্লি-ডেভিডসনের মতো গোটা বিশ্বে পরিচিতি থাকা এক নির্মাতার জন্য তো বটেই। ভারতের ক্ষেত্রেও ঠিক তেমনটাই ঘটেছিল।
ভারতে বড় ধরনের হোঁচট খেয়েছিল হার্লি-ডেভিডসন, যেখানে কোম্পানিটি কঠিন অভিজ্ঞতার মাধ্যমে বুঝতে পেরেছিল পৃথিবীর সব জায়গা তাদের জোর আওয়াজে চলা বড় আকারের ক্রুজার মোটরসাইকেল বা ‘হগ’ চালানোর জন্য উপযোগী নয় বলে প্রতিবেদনে লিখেছে প্রযুক্তি বিষয়ক সাইট স্ল্যাশগিয়ার।
২০১০ সালের জুলাইয়ে ভারতের হায়দ্রাবাদে নিজেদের প্রথম দোকান খোলে হার্লি-ডেভিডসন এবং হরিয়ানার বাওয়ালে ৭০ হাজার বর্গফুটের এক ভবনও তৈরি করে কোম্পানিটি। ভবনটি ছিল ‘কমপ্লিট নক-ডাউন অ্যাসেম্বলি প্ল্যান্ট’, যেখানে মূলত উইসকনসিন, পেনসিলভানিয়া ও মিসৌরির কারখানা থেকে আসা মোটরসাইকেলের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ জোড়া দিয়ে বাইক তৈরি হত। ফলে আমদানি শুল্ক কমে যায় এবং বাইকের সামগ্রিক দামও কিছুটা কমে আসে, যা বাজারে তাদের অবস্থান মজবুত করতে সাহায্য করেছে।
ওই সময়ে বিষয়টি ছিল আমেরিকার বাইরে হার্লি-ডেভিডসনের দ্বিতীয় কোনো বড় উদ্যোগ। প্রথমটি ছিল ব্রাজিলে। আর ভারত কেনই বা হবে না? ১০০ কোটির বেশি জনসংখ্যার একটি দেশে মোটরসাইকেল ছিল যাতায়াতের সবচেয়ে জনপ্রিয় মাধ্যম, যা ব্যবসার জন্য চমৎকার এক ক্ষেত্র তৈরি করেছিল।
এক দশক ধরে ব্যবসা করার পর ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে হার্লি-ডেভিডসন ভারত ছেড়ে চলে যায়। কারণ এই দীর্ঘ সময়ে কেবল ২৭ হাজারটি বাইক বিক্রি করতে পেরেছিল কোম্পানিটি। সেই তুলনায় এ অঞ্চলে হার্লির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ‘রয়াল এনফিল্ড’ প্রতি মাসেই এর দ্বিগুণ পরিমাণ বাইক বিক্রি করছে।
২০১৯ অর্থবছর চলাকালীন হার্লি-ডেভিডসন প্রায় দুই হাজার ৬৭৬টি বাইক বিক্রি করেছিল। ২০২০ সালের এপ্রিল থেকে জুনের মধ্যে সেই সংখ্যাটি ছিল কেবল একশ। এ কিংবদন্তি বাইক নির্মাতার ভারতীয় বাজার থেকে বিদায় নেওয়ার পেছনে বেশ কিছু কারণ থাকলেও মূল কারণ হচ্ছে ভারতের জন্য কোম্পানিটির এসব বাইক বড্ড বেশি ভারী ও অনুপযোগী ছিল।
হার্লি-ডেভিডসন ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়ার আগের অর্থবছর বা ২০১৯ সাল চলাকালীন ভারতে এক কোটি ৭০ লাখেরও বেশি বাইক ও স্কুটার বিক্রি হয়েছিল, যার ৯০ শতাংশেরই ইঞ্জিন ছিল ১৫০ সিসির নিচে। সেখানে ৫০০ সিসির বেশি ইঞ্জিনের বিভিন্ন বাইক বছরে কেবল ২৫ হাজারটি বিক্রি হত। অথচ ভারতে হার্লি-ডেভিডসনের সবচেয়ে ছোট বা কম সক্ষমতার বাইকটির ইঞ্জিনও ছিল ৭৫০ সিসির।
১৯৪৯ সাল থেকে ভারতে দীর্ঘ ইতিহাসের অধিকারী খ্যাতিমান বাইক নির্মাতা ‘রয়াল এনফিল্ড’ এই আইকনিক আমেরিকান কোম্পানির জন্য বড় এক সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। রয়াল এনফিল্ড এমন সব মোটরসাইকেল তৈরিতে অভ্যস্ত যেগুলো ছিল অনেক জ্বালানি সাশ্রয়ী বা মাইলেজ বেশি, ওজনে হালকা ও রক্ষণাবেক্ষণ করা সহজ।
প্রতি মাসে বাইক বিক্রিতে হার্লিকে বিশাল ব্যবধানে ছাড়িয়ে যেত রয়াল এনফিল্ড। তবে রয়াল এনফিল্ডই একমাত্র বাইক নির্মাতা ছিল না যাদের নিয়ে হার্লি চিন্তিত ছিল। ‘ট্রায়াম্ফ’, ‘জাওয়া’ ও ‘নর্টন’ কোম্পানির তৈরি বাইকও সরাসরি হার্লির সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করত। তার ওপর অন্যান্য ভারতীয় কোম্পানির সঙ্গে অংশীদারিত্বের মাধ্যমে ভারতেই বাইক তৈরি করছিল জাওয়া ও নর্টন, যা এসব কোম্পানির বিভিন্ন বাইককে আরও সাশ্রয়ী ও ব্যবহারিক করে তুলেছিল।
কোভিড ছিল হার্লি-ডেভিডসনের জন্য শেষ ধাক্কা
কোভিডের সময় আর্থিক মন্দার চরম পর্যায়ে ছিল হার্লি-ডেভিডসন। ২০১৯ সালে কোম্পানিটি ডিলারদের কাছে কেবল দুই লাখ ১৩ হাজার ৯৩৯টি মোটরসাইকেল পাঠিয়েছিল, যা শুনতে অনেক মনে হলেও আসলে গত ৯ বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম। ফলে তাদের নিট আয় হয়েছিল ৪২ কোটি ৩০ লাখ ডলার, যা গত নয় বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে ঠেকেছিল।
এরপর ২০২০ সালের শুরুতে বিশ্বজুড়ে মহামারি ছড়িয়ে পড়লে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে এবং টানা ৩৭টি প্রান্তিকের মধ্যে প্রথমবারের মতো লোকসানের মুখ দেখে কোম্পানিটি। উৎপাদন কমে যাওয়া ও আগে থেকেই বিভিন্ন ডিলারশিপ বন্ধ হতে থাকায় গত ছয় বছরের মধ্যে তাদের বিক্রি সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসে।
সেই সময় ধারণা করা হয়েছিল, মহামারির প্রভাবে ভারতে মোটরসাইকেলের চাহিদা অন্তত তিন বছরের জন্য থমকে যাবে। কোভিড ছিল হার্লি-ডেভিডসনের জন্য সেই ‘শেষ ধাক্কা’, যা তাদের মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়েছিল। ফলে নিজেদের ‘গ্লোবাল রিস্ট্রাকচারিং প্ল্যান’ বা পুনর্গঠন পরিকল্পনা ‘রিওয়্যার’-এর অংশ হিসেবে বাওয়াল প্ল্যান্টটি স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দেয় হার্লি-ডেভিডসন।
ভারতে থাকাকালীন হার্লি-ডেভিডসন কেবল ৩৫টি দোকান খুলতে পেরেছিল, যেগুলোর প্রতিটি বছরে গড়ে ৭০টিরও কম বাইক বিক্রি করত। শেষ পর্যন্ত দেখা গেল, হার্লির বাইক আসলে ভারতীয়দের জন্য উপযোগী ছিল না। কারণ ভারত যানজটহীন প্রশস্ত পাকা রাস্তায় আরামদায়ক ভ্রমণের জন্য তৈরি এমন বড়, দামি ও বিলাসবহুল মোটরসাইকেলের বাজার ছিল না।