Published : 08 Mar 2026, 12:08 PM
ওজন কমানোর ওষুধগুলো কেবল ওজন কমায় না, বরং মানুষের মদ, তামাক ও অন্যান্য মারাত্মক ড্রাগের প্রতি আসক্তি কমাতেও কার্যকরী হতে পারে বলে উঠে এসেছে সাম্প্রতিক এক গবেষণায়।
ব্রিটিশ মেডিকেল জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণা অনুসারে, ওজন কমানোর ওষুধগুলো মানুষের অ্যালকোহল, তামাক, গাঁজা ও কোকেনের মতো মাদকের প্রতি আসক্তি কমাতে সাহায্য করতে পারে।
ব্রিটিশ দৈনিক গার্ডিয়ান লিখেছে, যারা এরইমধ্যে বিভিন্ন নেশাজাতীয় দ্রব্যে আসক্ত, গবেষণা বলছে, তাদের বেলায় এসব ওষুধ তাদের অতিরিক্ত মাত্রায় মাদক গ্রহণ, হাসপাতালে ভর্তি হওয়া বা মৃত্যুর ঝুঁকি কমাতে পারে।
‘মাউঞ্জারো’ বা ‘ওজেম্পিক’-এর মতো ওষুধগুলো টাইপ-২ ডায়াবেটিস ও স্থূলতার চিকিৎসার জন্য ব্যবহৃত হয়। এগুলো মস্তিষ্কের সেই অংশকে প্রভাবিত করে, যা দেহের আনন্দ বা পুরস্কারের অনুভূতি দেয়, ফলে নেশার প্রতি তীব্র আকাঙ্ক্ষা কমে যায়। খাওয়ার পর শরীরে প্রাকৃতিকভাবে যে হরমোন তৈরি হয়, এসব ওষুধ ঠিক সেভাবেই কাজ করে মানুষকে পেট ভরা থাকার অনুভূতি দেয়।
যুক্তরাষ্ট্রের এ গবেষণায় ছয় লাখের বেশি টাইপ-২ ডায়াবেটিস আক্রান্ত সাবেক সেনাসদস্যের ওপর তিন বছর ধরে নজর রাখা হয়, যেখানে উঠে এসেছে, ‘জিএলপি-১’ ডায়াবেটিসের চিকিৎসায় ব্যবহৃত অন্যান্য ‘সোডিয়াম-গ্লুকোজ কোট্রান্সপোর্টার-২’ ওষুধ গ্রহণকারীদের তুলনায় মাদকদ্রব্য ব্যবহারের ইতিহাস নেই এমন ব্যক্তিদের এবং গাঁজা ১৪ শতাংশ, কোকেন ২০ শতাংশ, নিকোটিন ২০ শতাংশ ও ‘ওপিওয়েড’ বা ব্যথানাশক মাদকের নেশা ২৫ শতাংশ কমিয়ে দিতে পারে।
যারা এরইমধ্যে মাদকাসক্ত তাদের ক্ষেত্রেও দারুণ কার্যকরী ওজন কমানোর এসব ওষুধ, যা তাদের অতিরিক্ত মাত্রায় মাদক সেবনের ঝুঁকি ৩৯ শতাংশ, জরুরি বিভাগে ভর্তি হওয়ার প্রয়োজন ৩১ শতাংশ ও মৃত্যুর ঝুঁকি ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে দেয়।
‘রয়াল ফার্মাসিউটিক্যাল সোসাইটি’র প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক ক্লেয়ার অ্যান্ডারসন বলেছেন, “গবেষণাটি সেই নতুন গবেষণার তালিকায় যোগ হল, যা খতিয়ে দেখছে ‘জিপিএল-১’ ওষুধগুলো মস্তিষ্কের আনন্দ ও আসক্তি নিয়ন্ত্রণকারী অংশকে প্রভাবিত করতে পারে কি না।
“এ পর্যবেক্ষণমূলক গবেষণায় এ বিষয়টি স্পষ্ট করা জরুরি যে, এসব ওষুধ সরাসরি নেশা প্রতিরোধ বা চিকিৎসা করে এমনটি এখনও প্রমাণিত নয়। জিপিএল-১ ওষুধের সরাসরি কোনো প্রভাব আছে কি না তা নিশ্চিত হতে ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালসহ আরও গবেষণার প্রয়োজন।”
‘ন্যাশনাল ফার্মেসি অ্যাসোসিয়েশন’-এর কর্পোরেট অ্যাফেয়ার্স ডিরেক্টর গ্যারেথ জোনস বলেছেন, “গুরুত্বপূর্ণ এ গবেষণা থেকে ইঙ্গিত মেলে, ওজন কমানোর এ চিকিৎসার মাধ্যমে হয়ত আরও অন্যান্য বড় ধরনের স্বাস্থ্যগত সুবিধাও পাওয়া সম্ভব।
“এসব ওষুধের দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব সম্পর্কে আমরা প্রতিনিয়ত নতুন নতুন তথ্য জানতে পারছি। তবে যারা এই ওষুধের জন্য উপযোগী এবং যাদের সত্যিই ওষুধটি প্রয়োজন তাদের স্বাস্থ্যের বিভিন্ন ক্ষেত্রে তা ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে এ বিষয়টি স্পষ্ট।”
তিনি আরও বলেছেন, স্থূলতা বা অতিরিক্ত ওজন বড় ধরনের সমস্যা তৈরি করলেও এনএইচএস বা যুক্তরাজ্যের জাতীয় স্বাস্থ্যসেবার মাধ্যমে এসব ওষুধ মানুষের কাছে পৌঁছানোর গতি এখনও ‘খুব ধীর’।
এ দিকে, ভিন্ন এক গবেষণায় দেখা গেছে, যারা জিপিএল-১ ওষুধ নেওয়া বন্ধ করে দেন এক বছরের মধ্যে তাদের হারানো ওজনের ৬০ শতাংশ আবার ফিরে আসে। দীর্ঘমেয়াদে এই হার বেড়ে দাঁড়ায় ৭৫ শতাংশে, অর্থাৎ শেষ পর্যন্ত কেবল ২৫ শতাংশ ওজন কমানো সম্ভব হয়।
‘ইউনিভার্সিটি অফ কেমব্রিজ’-এর বিশেষজ্ঞদের করা আগের ৪৮টি গবেষণার সম্মিলিত এক বিশ্লেষণের মাধ্যমে এই তথ্য মিলেছে, যা প্রকাশ পেয়েছে ‘ই ক্লিনিক্যাল মেডিসিন’ জার্নালে।
গবেষকরা বলেছেন, ওজন ধীরে ধীরে আবার বেড়ে যাওয়ার মানে, শুরুতে যতটুকু ওজন কমেছিল, দীর্ঘমেয়াদে তার কেবল ২৫ শতাংশ ধরে রাখা সম্ভব হতে পারে।
যেমন, “কেউ যদি এ ওষুধের মাধ্যমে তার শরীরের মোট ওজনের পাঁচ ভাগের এক ভাগ বা ২০ শতাংশ কমিয়ে ফেলেন তবে দীর্ঘমেয়াদে তার ওজন আসলে কেবল পাঁচ শতাংশের মতো কমবে।”