Published : 30 Aug 2026, 07:30 PM
মহাবিশ্বের আদি রহস্য ও নতুন গ্রহের সন্ধানে ফ্লোরিডা থেকে মহাকাশে পাড়ি জমাল নাসার ৪০০ কোটি ডলারের সর্বাধুনিক টেলিস্কোপ ন্যান্সি গ্রেস রোমান।
শক্তিশালী ‘ওয়াইড-অ্যাঙ্গেল’ সক্ষমতাওয়ালা দুরবিনটি রহস্যময় ডার্ক ম্যাটার ও ডার্ক এনার্জির তথ্য উন্মোচনের মাধ্যমে মহাকাশ গবেষণায় নতুন যুগের সূচনা করতে যাচ্ছে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে রয়টার্স।
রোববার আমেরিকার ফ্লোরিডা থেকে মহাকাশের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছে আধুনিক মানমন্দিরটি। স্পেসএক্সের শক্তিশালী ‘ফ্যালকন হেভি’ রকেটে চড়ে নাসার ‘কেনেডি স্পেস সেন্টার’ থেকে মহাকাশে পাড়ি জমায় রোমান স্পেস টেলিস্কোপ।
এ মোটা অংকের প্রকল্পটির প্রধান লক্ষ্য মহাবিশ্বের জটিল রহস্য উন্মোচন করা। পাশাপাশি অসীম মহাজাগতিক স্কেলে মাধ্যাকর্ষণ বল পরীক্ষা ও সৌরজগতের বাইরের গ্রহ বা ‘এক্সোপ্ল্যানেট’ অনুসন্ধানে কাজ করবে।
উৎক্ষেপণের আগে আবহাওয়া নিয়ে কিছুটা শঙ্কা থাকলেও রকেটটি মেঘলা ও নীল আকাশের বুক চিরে সফলভাবে টেলিস্কোপটিকে মহাকাশে নিয়ে গেছে।
পৃথিবী থেকে প্রায় ১৬ লাখ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ‘ল্যাগ্রাঞ্জ পয়েন্ট ২’ নামের এক নির্দিষ্ট কক্ষপথের দিকে ছুটছে রোমান। প্রাথমিক লক্ষ্য হিসেবে পাঁচ বছরের মিশন নির্ধারণ হলেও নাসা বলেছে, টেলিস্কোপটিতে অতিরিক্ত আরও পাঁচ বছর সচল থাকার মতো পর্যাপ্ত জ্বালানি রয়েছে।
রোমান টেলিস্কোপটি ১৯৯০ সালে উৎক্ষেপণ করা ‘হাবল’ ও ২০২১ সালে পাঠানো ‘জেমস ওয়েব’-এর মতো সফল মহাকাশ দুরবিনগুলোর কাজের পরিধিকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যাবে।
শনিবার সংবাদ সম্মেলনে নাসার সায়েন্স মিশন ডিরেক্টরেটের প্রধান নিকোলা ফক্স বলেছেন, “বিষয়টি এমন যেন হাবল ও জেমস ওয়েব দরজার একটি চাবি দিয়ে মহাবিশ্বের দিকে তাকিয়ে ছিল, আর ন্যান্সী গ্রেস রোমান সোজাসুজি সেই দরজায় লাথি মেরে তা ভেঙে ফেলবে।”
গেল জুলাইয়ে এক ব্রিফিংয়ে নাসার ‘গডার্ড স্পেস ফ্লাইট সেন্টার’-এর জ্যেষ্ঠ প্রকল্প বিজ্ঞানী জুলি ম্যাকএনরি বলেছেন, “দৃশ্যমানতার স্পষ্টতা ও সংবেদনশীলতার দিক থেকে রোমান টেলিস্কোপটি হাবলের সমান হলেও তা দ্রুতগতিতে পুরো মহাকাশ জরিপ করতে পারবে।”
ম্যাকএনরি বলেছেন, রোমান কেবল এক মাসের পর্যবেক্ষণে আমাদের পুরো ‘মিল্কিওয়ে’ ছায়াপথ জরিপ করতে পারবে। অথচ একই কাজ হাবল টেলিস্কোপ দিয়ে করতে সময় লাগত প্রায় ১০০ বছর।
ওয়াইড-অ্যাঙ্গেল ও জুম লেন্স: টেলিস্কোপের কাজের ভিন্নতা
‘জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ’ মহাবিশ্বের প্রাথমিক ইতিহাসে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। এর গবেষণায় উঠে এসেছে, আদি বিভিন্ন ছায়াপথ ধারণার চেয়েও আগে ও বড় আকারে গঠিত হয়েছিল। আলো ভ্রমণের সময়ের ওপর নির্ভর করে মহাকাশের গভীর থেকে গভীরে ও অতীত দেখার বিশেষ সক্ষমতা রয়েছে জেমস ওয়েবের।
অন্যদিকে, ‘ন্যান্সি গ্রেস রোমান’ টেলিস্কোপটির মূল শক্তি প্যানোরামিক বা বিস্তৃত দৃশ্য ধারণের সক্ষমতা। নাসা বলেছে, জেমস ওয়েব যদি কোনো ক্যামেরার ‘জুম লেন্স’ হয় তবে রোমান শক্তিশালী ‘ওয়াইড-অ্যাঙ্গেল লেন্স’।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, জেমস ওয়েব তৈরি হয়েছে মহাবিশ্বের সুদূর অতীতে গভীরভাবে নজর দিয়ে বিরল সব বিষয় খুঁজে বের করার জন্য।
অন্যদিকে, রোমান টেলিস্কোপটি ওয়েবের সেই গভীর পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি বড় ও বিস্তৃত ক্যানভাস তৈরি করবে।
রোমান টেলিস্কোপটি মহাবিশ্বের এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বিস্তৃত ও নিখুঁত থ্রিডি মানচিত্র তৈরির মাধ্যমে ‘ডার্ক এনার্জি’ ও ‘ডার্ক ম্যাটার’-এর মতো মহাজাগতিক রহস্য উন্মোচনে বড় ভূমিকা রাখবে। এক বছরেরও বেশি সময় ধরে পরিচালিত এর প্রধান জরিপে দুইশো কোটিরও বেশি ছায়াপথ পর্যবেক্ষণ করা হবে।
আজ থেকে প্রায় ১ হাজার ৩৮০ কোটি বছর আগে ‘বিগ ব্যাং’ বা মহাবিস্ফোরণের মাধ্যমে এ মহাবিশ্বের তৈরি এবং তখন থেকেই তা ক্রমাগত সম্প্রসারিত হয়ে চলেছে।
১৯৯৮ সালে বিজ্ঞানীরা বলেছিলেন, মহাবিশ্বের এ সম্প্রসারণের গতি ক্রমশ বাড়ছে, যার পেছনে অদৃশ্য বল বা ‘ডার্ক এনার্জি’ দায়ী। আমাদের জানা পৃথিবীর সব ধরনের বস্তু, যেমন তারা, গ্রহ, গ্যাস ও ধূলিকণা মহাবিশ্বের মোট উপাদানের কেবল পাঁচ শতাংশ গঠন করে।
অন্যদিকে, গ্রহ-তারার ওপর মহাকর্ষীয় প্রভাব থেকে চিহ্নিত ‘ডার্ক ম্যাটার’ রয়েছে প্রায় ২৭ শতাংশ ও বাকি ৬৮ শতাংশজুড়ে রয়েছে রহস্যময় ‘ডার্ক এনার্জি’।
নাসার ভাষ্য, মহাবিশ্বজুড়ে ডার্ক ম্যাটারের আকর্ষণ ও ডার্ক এনার্জির বিকর্ষণ সক্ষমতা পরিমাপ করতে রোমানকে ব্যবহার করা হলে এ দুই রহস্যের সমাধানে বিজ্ঞানীরা অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে এগিয়ে যাবেন।
এ ছাড়া, সৌরজগতের বাইরের গ্রহ বা ‘এক্সোপ্ল্যানেট’ অনুসন্ধানে এ যাবৎকালের সবচেয়ে বড় জরিপটি চালাবে রোমান, যা হাজার হাজার নতুন গ্রহ আবিষ্কার এবং আমাদের সৌরজগতের মতো অন্যান্য গ্রহ ব্যবস্থার প্রথম পরিসংখ্যানগত চিত্র তুলে ধরবে।
‘ইউনিভার্সিটি অফ টেক্সাস’-এর ডালাস শাখার বিশ্বতত্ত্ববিদ ও রোমানের বৈজ্ঞানিক দলের সদস্য মুস্তাফা ইশাক বলেছেন, “রোমানের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর দিক এর নতুন কিছু আবিষ্কারের অপার সম্ভাবনা। অতীতে বড় ধরনের টেলিস্কোপ প্রায়শই এমন সব গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার করেছে উৎক্ষেপণের আগে যার কথা বিজ্ঞানীরা কল্পনাও করতে পারেননি।”
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন তাদের প্রথম ও দ্বিতীয় মেয়াদে রোমান টেলিস্কোপের বাজেট কমানো বা পুরোপুরি বন্ধের চেষ্টা করলেও কংগ্রেস এর তহবিল বহাল রেখেছিল।
নাসা বলেছে, নির্দিষ্ট সময়সূচির প্রায় ৯ মাস আগেই রোমান টেলিস্কোপটিকে সফলভাবে মহাকাশে উৎক্ষেপণ করা সম্ভব হল।
আরও পড়ুন…
ডার্ক এনার্জি, ভিনগ্রহের রহস্য খুঁজতে রওনা হচ্ছে নাসার নতুন টেলিস্কোপ