Published : 29 Nov 2025, 11:50 AM
অপরাধীরা মাসের পর মাস ধরে ষড়যন্ত্র করছে। ফাঁদ সাজানো হয়ে গেছে, জালও প্রস্তুত। এখন তাদের কেবল একটি ক্লিকের জন্য ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করতে হবে।
এ শুক্রবার বছরের সবচেয়ে ব্যস্ত শপিং ডে হিসেবে বিবেচিত হলেও তা একইসঙ্গে অনলাইন ক্রেতাদের জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক দিনও হতে পারে। এরইমধ্যে সবখানে অনলাইন প্রতারণা, ফিশিং হামলা ও ভুয়া ওয়েবসাইট ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়েছে। কারণ প্রতারকরা ‘ব্ল্যাক ফ্রাইডে’কে সামনে রেখে মানুষের কেনাকাটার সুযোগকে কাজে লাগিয়ে প্রতারণার চেষ্টা করছে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে ব্রিটিশ পত্রিকা ইন্ডিপেনডেন্ট।
এদিকে, এ দিনটিকে ‘ব্ল্যাক ফ্রড ডে’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা। কারণ প্রতারণার শিকার হওয়া মানুষের সংখ্যা দিনদিন বাড়ছে। এবারের ব্ল্যাক ফ্রাইডেতে এ সমস্যা সবচেয়ে ভয়ংকর রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা তাদের।
সাইবার হামলা বিভিন্ন আকারে আসতে পারে, যেমন– সন্দেহজনক লিংকওয়ালা ভুয়া ডেলিভারি মেসেজ, খুব ভালো মনে হলেও ভুয়া অফার দেওয়া অননুমোদিত শ্রেণির ইমেইল এবং জনপ্রিয় বিভিন্ন ব্রান্ডের নকল বিজ্ঞাপন।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহার করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে এ ধরনের হামলা চালাচ্ছে হ্যাকারররাও, যাতে তাদের প্রতারণা শনাক্ত করা আরও কঠিন হয়ে যায়।
ডেটা প্রোটেকশন কোম্পানি ‘সাইএক্সসেল’-এর প্রধান পণ্য কর্মকর্তা ড. মেঘা কুমার বলেছেন, “ক্রেতাদের টার্গেট করতে আরও জটিল প্রতারণার উপায় ব্যবহার করছে প্রতারকরা, যা কখনও কখনও এআইয়ের মাধ্যমে তৈরি। ফলে এগুলো শনাক্ত করা আরও কঠিন হয়ে যাচ্ছে।
“অনলাইনে লেনদেন বেড়ে যাওয়ার সুযোগ নিয়ে ভুয়া অফার তৈরি করছে প্রতারকরা এবং অনেক সময় নির্দোষ ক্রেতাদের এমন ভুয়া ই-কমার্স সাইটে আকৃষ্ট করছে, যেখানে গ্রাহকদের পেমেন্টের তথ্য চুরি হয়ে যায়।”
এসব ভুয়া ওয়েবসাইট আসল ব্রান্ডের অনলাইন স্টোরের মতো দেখানোর জন্যই তৈরি করে হ্যাকাররা। সামাজিক মাধ্যমে আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপন বা পেইড পোস্ট দেখিয়ে ক্রেতাদের সেগুলোতে ঢুকতে প্রলুব্ধ করে তারা।
এসব সাইটের মূল লক্ষ্য মানুষের ক্রেডিট কার্ডের তথ্য চুরি ও পুরো অনলাইন পরিচয়ও হাতিয়ে নেওয়া। নতুন ধরনের এআই টুল ব্যবহার করে এগুলো বানানো হয়। ফলে আসল আর নকলের মধ্যে পার্থক্য বোঝা অনেক সময়ই কঠিন হয়ে পড়ে।
সিকিউরিটি প্ল্যাটফর্ম ‘নর্ডভিপিএন’-এর তথ্য অনুসারে, সম্প্রতি কয়েক দিনে ভুয়া অ্যামাজন স্টোরের সংখ্যা দ্বিগুণের বেশি বেড়েছে এবং প্রতারণামূলক ‘ইবে’ সাইটের সংখ্যা হয়েছে পাঁচ গুণের বেশি।
নর্ডভিপিএনের একজন মুখপাত্র বলেছেন, “এসব সাইটের অনেকগুলোই আসল সাইটের সঙ্গে আলাদা করে চেনা যায় না। দেখতে বিশ্বাসযোগ্য এমন বিভিন্ন পেইজের পুরো উদ্দেশ্যই হল মানুষের ব্যক্তিগত তথ্য ও পেমেন্ট তথ্য হাতিয়ে নেওয়া।”
একশ ৮৫টি দেশের ৩০ হাজারেও বেশি লোকের উপর করা সাম্প্রতিক এক জরিপে উঠে এসেছে, বেশিরভাগ ভুয়া ওয়েবসাইটই চিনতে পারেন না তারা। জরিপে অংশ নেওয়া এমন মানুষ ৬৮ শতাংশ।
ইমেইলে থাকা ক্ষতিকর লিংকও বাড়ছে, যা ক্রেতাদের এসব প্রতারণায় ভরা সাইটে নিয়ে যাচ্ছে। সাইবার সিকিউরিটি কোম্পানি ‘ডার্কট্রেস’-এর তথ্য বলছে, ব্ল্যাক ফ্রাইডে ক্রেতাদের টার্গেট করে পাঠানো ফিশিং ইমেইলের সংখ্যা বেড়েছে ছয়শ ২০ শতাংশের বেশি।
‘ইউকে ফাইন্যান্স’-এর ২০২৫ সালের বার্ষিক প্রতারণা প্রতিবেদনে প্রকাশ পেয়েছে, এ ধরনের প্রতারণা ক্রমেই আরও কার্যকর হচ্ছে এবং গত বছর মোট জালিয়াতির ক্ষতির পরিমাণ ছাড়িয়েছে ১১০ কোটি পাউন্ড।
আরেকটি কৌশল খুচরা বিক্রেতাদের কাছ থেকেও আসতে পারে। ব্ল্যাক ফ্রাইডের আগে কিছু সপ্তাহে পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেন তারা, যাতে দিনটি এলে কৃত্রিম ছাড় দেওয়া যায়। এ ধরনের অফার যাচাইয়ের একটি উপায় হচ্ছে ‘প্রাইসলাসো’ বা ‘ক্যামেলক্যামেলক্যামেল’-এর মতো ‘প্রাইস ট্র্যাকার’ সাইটের ব্যবহার, যা কোনো পণ্যের দামের ইতিহাস দেখিয়ে ও অফারটি সত্যিই ভালো কিনা তা বোঝাতে সাহায্য করে।
নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ও ভোক্তা অধিকার নিয়ে নজর রাখেন এমন পেশাদার কর্মীরা পরামর্শ দিয়েছেন, ব্ল্যাক ফ্রাইডে ও সাইবার মানডে বিক্রির সময় বিশেষভাবে সতর্ক থাকা জরুরি। সন্দেহজনক সাইটের ইউআরএল দুবার যাচাই করুন, বিক্রেতা বা ডেলিভারি পরিষেবার নাম ব্যবহার করা ইমেইল বা মেসেজে নজর রাখুন, পাবলিক ওয়াইফাই দিয়ে কেনাকাটা এড়িয়ে চলুন এবং ব্যাংক লেনদেন পর্যবেক্ষণ করুন।
শিল্প বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রতারণামূলক বিজ্ঞাপন ও ইমেইল শনাক্তকরণ সিস্টেমকে ফাঁকি দেওয়ার জন্য ক্রমেই জটিল কৌশল ব্যবহৃত হচ্ছে। ফলে অনলাইনে নিরাপদ থাকার মূল চাবিকাঠি সতর্কতা।